ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অধিকার

কৃষকের আত্মহত্যা এবং কৃষিতে বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসন

কৃষকের আত্মহত্যা এবং কৃষিতে বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসন
×

মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৮ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা ভাষায় ‘সর্বংসহা’ শব্দটি মনে হয় দেশের একটি পেশার মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সে হলো কৃষক। অন্য সবাই কষ্ট পেলে প্রতিবাদ করে, প্রয়োজনে বিদ্রোহ করে। নিদেনপক্ষে মিছিল, না হয় মানববন্ধন হলেও করে। কিন্তু কৃষক সব অবস্থায় সব মেনে নেন; সব সয়ে যান। সয়ে যেতে যেতে যখন আর পারেন না, তখন গলায় দড়ি দেন, কখনওবা গলাটাকেই পেতে দেন ট্রেনের নিচে কিংবা প্রাণনাশক বিষ ঢেলে দেন গলার ভেতর।

এই তো সাড়ে সাত মাস আগে, মার্চের ২৬ তারিখে মেহেরপুরের মুজিবনগরের কৃষক সাইফুল হক পেঁয়াজ চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ক্ষেতের মাঝেই বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন। এর ঠিক ১৮ দিন পর রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পেঁয়াজ চাষি মীর রুহুল আমিন ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছেন। কারণ সেই একই– পেঁয়াজ চাষে লোকসান। সঙ্গে ঋণের ভার। ১৮ আগস্ট একই জেলার মোহনপুরে পানচাষি আকবর হোসেন নিজের পানের বরজেই গলায় দড়ি দিয়েছেন। জানা যায়, আকবর হোসেন ১১টি এনজিও এবং স্থানীয় সুদের কারবারিদের কাছ থেকে ৬-৭ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরিশোধ করতে পারছিলেন না। ঋণের কিস্তি ছিল প্রতি সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা। কিন্তু পানের দাম না পাওয়ায় ঋণ পরিশোধ করতে কষ্ট হচ্ছিল। এদিকে প্রতিদিন কিস্তির জন্য এনজিওর লোকেরা চাপ দিতেন। সে চাপ সহ্য করতে না পেরে অবশেষে গলায় দড়ি দিলেন। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছে একই জেলার পবা উপজেলায়। কৃষক মিনারুল ১৪ আগস্ট স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার আগে রেখে গেলেন একটি চিরকুট। তাতে লেখা– ‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না।’

২. প্রায়ই কোথাও না কোথাও এরূপ ঘটনা ঘটছে এবং সব ঘটনারই ঘটনচক্র প্রায় একই– ফসলের যথাযথ দাম না পাওয়া, ঋণের বোঝা, পরিশোধের তাগিদ এবং গলায় দড়ি। সব তো আর খবরে আসে না। আমাদের এই সমাজে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের কথাই কেবল খবরে আসে। তারা কোথায় নাশতা করেন, কোন হোটেলে ঘুমান। কিন্তু কৃষক মরে গেলেই কেবল খবর হয়। তাও সবসময় নয়।

৩. কৃষকের আত্মহত্যায় এই সমাজের কারও কিছু যদি যেত বা আসত, এত মৃত্যুর কোথাও না কোথাও প্রতিক্রিয়া হতো। নিদেনপক্ষে একটা মিছিল বা মানববন্ধন। তেমন কিছুই হলো না। খবরের কাগজে সংবাদেই সব শেষ। কারণ কৃষকরা সমাজে এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নন। গুরুত্বপূর্ণ হতে হলে দুটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। এক. ব্যক্তিগত বিপুল অর্থসম্পদের মালিক এবং দুই. শ্রেণিগতভাবে সংগঠিত। আমাদের কৃষকদের এ দুটির কোনোটাই নেই।

কিছুদিন আগে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা তাদের তিন দফা দাবিতে রাজধানী কাঁপিয়ে গেছেন। সব না হলেও কিছু দাবি অন্তত মেনে নিতে সরকার বাধ্য হয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিকরাও মাঝেমধ্যে নানা দাবিতে আন্দোলনে নামেন এবং তা আদায়ও করে নেন। শিক্ষকরা পারেন, শ্রমিকরা পারেন, রিকশাচালকরা পারেন; কিন্তু কৃষকরা পারেন না। কারণ তারা সংগঠিত নন।

কৃষকদেরও সংগঠন আছে। তবে তা অন্য রাজনৈতিক দলের লেজুড় বৈ কিছু নয়। যেমন কৃষক দল, কৃষক লীগ ইত্যাদি। কিন্তু এসব সংগঠনের নেতা তারাই হন, যাদের সঙ্গে কৃষি ও কৃষকের কোনো সম্পর্ক নেই। দেখা যায়, একজন নেতা যিনি কোনোদিন ফসলের মাঠে নামেননি; কোনোদিন দেখেননি কীভাবে মাঘের শীতকে দূরে ঠেলে একজন চাষি হাঁটুপানিতে নেমে বোরো ক্ষেতে কাজ করেন। দেখেননি কীভাবে জোঁক আর ‘পাট্টুয়া’ চুষে নেয় কৃষকের শরীরের রক্ত; তারাই হয়ে যান কৃষক নেতা। পাজেরো গাড়িতে জেলার সার্কিট হাউসে রাতযাপন করে কৃষক সভায় তারা বক্তৃতা করেন।

৪. কৃষক যে সব সময় আত্মহননের পথই বেছে নিয়েছেন, সংগঠিত হয়ে আন্দোলন করেননি, এমনও নয়। এই দেশে কৃষক আন্দোলনের রয়েছে সমৃদ্ধ ও গৌরবদীপ্ত ইতিহাস।

পাবনার কৃষক আন্দোলন (১৮৭৩-১৮৭৬), বরিশালের তুষখালী আন্দোলনসহ (১৮৭২-১৮৭৫) ব্রিটিশ ভারতে ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে যে কৃষক আন্দোলনের ঢেউ জেগেছিল, তার অভিঘাতেই ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিল। টঙ্ক আন্দোলন,  নানকার বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন– বর্তমানে এর সবই বইয়ের পাতা আর সুসজ্জিত মিলনায়তনে আলোচনা সভার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা আলোচনা করেন আর যারা শোনেন, তাদের কেউই কৃষক নন। কৃষকদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে সংগঠিত করার কাজটাও কেউ করেন না বা করতে পারেন না। ফলে কৃষকদেরও গলায় দড়ি হয়ে ওঠে একমাত্র নিয়তি।

৫. এ কথাও ঠিক, বইপুস্তক বা আলোচনা সভায় আমরা যেসব কৃষক আন্দোলনের কথা পড়ি বা শুনি, তার সবই পরাধীন সময়ের কথা। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও এ দেশে শক্তিশালী কোনো কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তার মানে কি এই, বর্তমানে কৃষকদের কোনো সমস্যা নেই? তারা খুব সুখে আছেন? তাহলে কিছুদিন পরপর দেশের নানা জায়গায় কৃষকদের গলায় দড়ি পরতে হয় কেন? আসলে দেশ যখন পরাধীন ছিল; শত্রু ছিল ঘরের পাশেই; তাদের দেখা যেত, চেনা যেত– জোতদার, জমিদাররা। তারা ছিল সবারই প্রতিবেশী। দৃশ্যমান, চিহ্নিত ও প্রত্যক্ষ। অত্যাচার, শোষণটাও ছিল প্রত্যক্ষ। জমিদার-জোতদার তাদের পাওনা না পেলে জোর করে ধান নিয়ে যেত। তাদের ছিল লাঠিয়াল বাহিনী। এখন স্বাধীন দেশে শোষণটা পরোক্ষ। নেত্রকোনা কিংবা সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের জোঁক বা পাট্টুয়ার মতো। তাই কৃষক টের পান না। এখন ওরা ধান নেয় না। নেয় রক্ত, জীবনীশক্তি। এখন লাঠিয়াল নেই। আছে পুলিশ। এখন প্রতিপক্ষ খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র। সরকারকে দেখা যায় না, ব্যবস্থাকেও দেখা যায় না– ঠিক সেই হাওরের জোঁকের মতো। তবে অনুভব করা যায়। কিন্তু সেই অনুভবের জায়গাকেই যদি অবশ করে দেওয়া হয়, তাহলে তো জেগে ওঠার কোনো কারণই থাকে না। আরও আছে সরকারদলীয় সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা কৃষকের নেই, সরকারের নিজেরও নেই। তাদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণই কৃষকের ভাগ্য। আগে কৃষক না খেয়ে মরত। এখন কেউ না খেয়ে মরে না। ঋণের বোঝা বইতে না পেরে গলায় দড়ি দিয়ে মরে।

৬. কৃষিকাজ করতে এক সময় বলদ লাগত। এখনও কোনো কোনো জায়গায় বলদ আছে। ঘানি টানতেও অতীতে বলদ ব্যবহার করা হতো। সেসব বলদের চোখে ঠুলি বেঁধে দেওয়া হতো। চোখ ঢাকা বলদেরা ভাবত, সে সোজা পথেই হাঁটছে। চোখে ঠুলি থাকায় বুঝতে পারত না, তারা এক জায়গাতেই ঘুরছে। হালে কৃষকের অবস্থা হয়েছে সেই ঠুলি দেওয়া বলদের মতো। তারা বুঝতে পারছেন না– কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। একই বৃত্তে তারা ঘুরছেন। কিন্তু ভাবছেন, সোজা পথেই এগোচ্ছেন।

৭. কেউ কেউ বলেন, এখন আসলে দেশে কোনো কৃষকই নেই। থাকলে তো আন্দোলন হতো। কথাটা এক অর্থে সঠিক। এখন কোনো কৃষক নেই। রাজনীতির পুঁজিবাদী ধারা কৃষকদের বিভক্ত করে রেখেছে। সেই সঙ্গে ভুলিয়ে রেখেছে তাদের পেশাভিত্তিক পরিচয়। গ্রাম-গঞ্জে যারা কৃষিকাজ করেন, তারা এখন আর কৃষক নন; বিএনপি বা আওয়ামী লীগ। হালে অবশ্য জামায়াতও যোগ হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক দিক থেকে এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তারা ভুলেই গেছেন– তারা কৃষক। তারা শুধু তাদের রাজনৈতিক পরিচয়টুকুই মনে রাখেন; শ্রেণি পরিচয় নিয়ে ভাবেন না। ভাবার শক্তি তাদের নেই। পুঁজিবাদ এমনই শক্তিশালী; প্রয়োজনে সবাইকে তার পরিচয়ও ভুলিয়ে দিতে পারে।

৮. জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। দেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকার ক্ষমতায় এসেই নানামুখী সংস্কার নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। ১১টি বিষয়ে সংস্কার সাধনের জন্য তারা কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু কৃষি বা কৃষক বিষয়ে কোনো কমিশন হয়নি। হয়নি হয়তো দুটো কারণে। এক. এটি সরকারের প্রায়োরিটি বিষয় নয় এবং দুই. কৃষি বা কৃষকের কোনো সমস্যা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, কৃষিপ্রধান দেশ হলেও বাংলাদেশে কৃষি কোনো সরকারের আমলেই প্রাধান্য পায়নি। 

দেশে কত ধরনেরই জাতীয় নীতির কথা শোনা যায়! কিন্তু এটা কি ভাবা যায়, যে দেশে ৪১% মানুষ সরাসরি কৃষিকাজে নিয়োজিত এবং ৮০%-এর বেশি মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল, সেই দেশে একটা জাতীয় কৃষিনীতি প্রণয়ন করতে সময় লেগেছে ২৮ বছর। এ থেকেই বোঝা যায়, এদেশে কৃষি বা কৃষককে কতটুকু গুরুত্ব দেয় রাষ্ট্র। বলাবাহুল্য, ১৯৯৯ সালে প্রথম জাতীয় কৃষিনীতি প্রণীত হয়। ২০১৩ সালে একবার তা পরিমার্জন করা হয়। ২০১৮ সালে আরেকবার। প্রশ্ন হলো– আমাদের কৃষিনীতিতে কী আছে, তা কি কৃষক জানেন? এ ধরনের যে একটা আইন আছে, সেটাই বা কেউ জানেন? শুধু কৃষক নন; এই যারা কৃষকদের নিয়ে রাজনীতি করেন, এমপি হন, মন্ত্রী  হন, তারা কি জানেন? আমি অন্তত গত ৩০ বছরে সংসদে বা অন্য কোথাও আমাদের কৃষিনীতি নিয়ে কোনো বিতর্ক শুনিনি। আজকাল তো কত তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে টকশোর আয়োজন করা হয়। কোনোদিন কি তারা দেশের কৃষি বা কৃষক নিয়ে কোনো আয়োজন করেছেন? কারণ, আমাদের যে কৃষিনীতি, তা কেবলই উৎপাদনমুখী। উৎপাদন বৃদ্ধিই এর প্রধান লক্ষ্য। উৎপাদনের পেছনে যেসব মানুষ রয়েছেন, তাদের নিয়ে কোনো ভাবনা এই নীতিতে নেই। ভাবনা শুধুই করপোরেট মুনাফার দিকে। মানুষ সেখানে নিতান্তই গৌণ।

৯. প্রতিবেশী ভারতে ২০২০ সালে তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে সারাদেশ। কৃষকরা উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন দীর্ঘদিন। অবশেষে মোদি সরকার কৃষকদের দাবি মেনে নিয়ে বিল তিনটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। অথচ আমাদের দেশে কৃষি আইন নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা আছে? না থাকারই কথা। কারণ আমাদের কৃষকরা রাজনীতিবিদদের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি ছাড়া আর কিছু নন। প্রসঙ্গত, আমাদের দেশে শিক্ষাহীন জনসংখ্যার সংখ্যাটা কিন্তু কৃষকদের মাঝেই বেশি। ফলে তারা নীতি 
বা আইনের মারপ্যাঁচ বোঝেন না। এরই সুযোগ নেয় মুনাফালোভী পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

১০. পৃথিবীর উন্নত কৃষিপ্রধান দেশগুলোতে কৃষকের জন্য বিভিন্ন সুরক্ষা কর্মসূচি থাকে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তেমন কর্মসূচি নেই। চাষাবাদের প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চমূল্যে বীজ, সার, শ্রমিকের মজুরি, সেচ, কীটনাশক, ফসল তোলা, বিক্রি পর্যন্ত
প্রতিটি পর্যায়ে ফড়িয়াবাজি আর সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ভুগতে হয় কৃষকদের। এই যে আমাদের কৃষক– প্রায় প্রতিবছর উৎপাদনে লোকসান দিচ্ছেন; কখনও পেঁয়াজ চাষে, কখনও ধান চাষে, কখনওবা পান চাষে। তাদের বেলায় কোনো প্রণোদনা নেই। প্রণোদনা সব করপোরেট মালিকদের জন্য। কৃষকের জন্য শুধুই অস্বাভাবিক মৃত্যুর স্বাভাবিকতা।

১১. আসলে কৃষি এখন আর কৃষকের নিয়ন্ত্রণে নেই; পুঁজির নিয়ন্ত্রণে। আর পুঁজিকে নিয়ন্ত্রণ করছে ছোট মালিক, বড় মালিক, বহুজাতিক পুঁজি। কৃষিতেও এখন করপোরেটাইজেশনের আগ্রাসী ছায়া। সার, বীজ, কীটনাশক থেকে শুরু করে সব ধরনের কৃষি উপকরণ এখন করপোরেট তথা বহুজাতিক পুঁজির নিয়ন্ত্রণে। বিদ্যমান কাঠামোতে এর বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা সরকারের নেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে সরকারকেই বিদায় নিতে হবে। তাই তো সারের দাম বাড়লেও ধানের দাম বাড়ে না। অন্যদিকে উৎপাদন মৌসুমে কৃষকের জন্য বাজার থাকে পুরোপুরি মুক্ত। পণ্য বিক্রির সময় তিনি দাম নির্ধারণে কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। কিন্তু ফড়িয়া, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের হাতে সেই একই পণ্য পৌঁছানোর পর বাজারের খোলামেলা চরিত্র বদলে যায়; তখন সেটি হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রিত ও সীমাবদ্ধ, যেখানে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা তাদের হাতে। এভাবেই করপোরেট সংস্কৃতি চুষে নেয় কৃষকের রক্ত।

১২. এক সময় এই উপমহাদেশে বামধারার রাজনীতিকরা কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দোলন গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ কৃষকের সঙ্গে থেকে কৃষকদের সংগঠিত করেছেন। আজকের বামদের অনেকেই কৃষকদের কাছে না গিয়ে শুধু তত্ত্বকথা দিয়ে কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলতে চান। আধুনিক এই বিপ্লবীরা কৃষকের ভাষা বোঝেন না; উল্টো চেষ্টা করেন তাদের ভাষা কৃষকদের বোঝাতে । ফলে কৃষকদের সঙ্গে তাদের আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠছে না। গড়ে উঠছে না কৃষকদের নিজস্ব সংগঠন। এই সুযোগই নিচ্ছে পুঁজির মালিক তথা করপোরেট ম্যাগনেটরা। সময় এসেছে কৃষক জীবনের এই দুষ্টচক্র ভেঙে ফেলার। কিন্তু শুরুটা করবে কে?

মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক, জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা

আরও পড়ুন

×