ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজউকের চেয়ারম্যান বাংলো

সংস্কারের যুগে সংস্কারের যুত

সংস্কারের যুগে সংস্কারের যুত
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২০ | আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন সংস্কারে প্রয়োজন অপেক্ষা প্রায় সাত গুণ অর্থ ব্যয় করা হইয়াছে বলিয়া গত সপ্তাহে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যেই চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে, উহা পুকুরচুরির নামান্তর। রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত গৃহটি সংস্কারে, সংস্থাটির প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী যেইখানে ৩০ লক্ষ টাকা প্রয়োজন ছিল, সেইখানে ব্যয় হইয়াছে দুই কোটিরও অধিক অর্থ। উপরন্তু গত বৎসরের মার্চ মাসে উক্ত সংস্কারকার্য শুরু হইলেও গত জানুয়ারিতে নামকাওয়াস্তে দরপত্র আহ্বান করিয়া সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই দায়িত্ব প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় বিগত সরকারের আমলে উক্ত বাংলোর সংস্কারকার্য শুরু হইলেও উহার আইনগত বৈধতা প্রদান করা হয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। 

বিস্ময়কর ব্যাপার বটে, যেই সরকার ক্ষমতায় আসিয়াছে পূর্ববর্তী সরকারের দুর্নীতি-অনিয়মের সুলুক সন্ধান করিয়া চিরতরে উহা বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার লইয়া, সেই সরকারই পূর্বসূরির দুর্নীতি-অনিয়মকে বৈধতা দিয়াছে! বিশেষত জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবিতে যাহারা দীর্ঘদিন ধরিয়া আন্দোলন করিতেছেন, এই ঘটনা তাহাদের জন্য নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। আরও বিস্ময়কর, আলোচ্য  অনিয়মের অভিযোগ উঠিবার পর রাজউক গঠিত তদন্ত দলও ইতোমধ্যে জানাইয়া দিয়াছে, তথায় অনিয়ম হয় নাই। আরও হতাশাজনক, রাজউকের ন্যায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও দায়ীদের বাঁচাইবার চেষ্টা করিয়াছে। তাহাদের গঠিত তদন্ত কমিটি দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না লইয়া কাজের গুণগত মান নিরীক্ষার মাধ্যমে ঠিকাদারকে চূড়ান্ত পাওনা নিষ্পত্তির ব্যাপারে রাজউককে গত মাসে চিঠি দিয়াছে। দৃশ্যত, রাজউকের চেয়ারম্যান বাংলো নির্মাণে মিলিয়া মিশিয়াই অনিয়ম করা হইয়াছে। সংস্কারের যুগে আসিয়া বাংলো সংস্কার যুতমতোই হইয়াছে, বলা চলে।

এই প্রসঙ্গে ২০১৮ সালের একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। উক্ত বৎসর রাজধানীর ফরাশগঞ্জের অন্যতম পুরাকীর্তিরূপে খ্যাত রূপলাল হাউসের সীমানার মধ্যে প্রথমে আটতলা ভবন, পরে সংশোধনপূর্বক ছয়তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় রাজউক। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসিলে স্বাভাবিকভাবেই সচেতন নাগরিকদের মধ্য হইতে প্রতিবাদ উঠে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমে রাজউকের জরিপকারী আশুতোষ চাকমা, পরে ইমারত পরিদর্শক মো. সাদ্দাম হোসেন ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউস পরিদর্শন করেন। তাঁহারা তিন দফা পরিদর্শন করিয়া সেখানে রূপলাল হাউসের কোনো ‘অস্তিত্ব’ খুঁজিয়া পান নাই। উহাতে স্পষ্ট হয়, রাজউকের কর্মকর্তাদের একটি দুর্নীতিবাজ চক্র সরাসরি জড়িত। কারণ ভবন নির্মাণের জন্য ভূমি ব্যবহারের অনুমতি লইতে রাজউকের কয়েকটি শাখার ছাড়পত্র লাগে। তখন জোরদার নাগরিক প্রতিবাদের মুখে উক্ত ভবন নির্মাণ স্থগিত করা হয়। মোদ্দা কথা, দলবদ্ধ দুর্নীতি রাজউকে নূতন নহে। একাদিক্রমে সরকারের আগমন-নির্গমন ঘটিলেও উক্ত ব্যবস্থা থাকিয়া যায় বহাল তবিয়তে। সম্ভবত সেই কারণেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২০ সালে উহার নিজস্ব অনুসন্ধানলব্ধ প্রতিবেদনে রাজউক ও দুর্নীতি ‘সমার্থক’ আখ্যা দিয়াছিল। ভবনের নকশা অনুমোদনের নামে সংস্থাটি অদ্যাবধি হয়রানির মাধ্যমে কত নাগরিককে অশ্রুজলে ভাসাইয়াছে, উহার ইয়ত্তা নাই। তাই টিআইবির মন্তব্য, রাজউক হইতে বিনা ঘুষে সাধারণ মানুষ সেবা পাইয়াছেন– এমন ঘটনা বিরল।

আমরা মনে করি, আদ্যোপান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত রাজউক সম্পর্কে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের ধারণা কম নহে। তাহারা দাযিত্ব গ্রহণকালীন প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণে অন্তত একটা ঘটনা হইলেও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সুরাহা করিতে পারে। তদনুযায়ী আমাদের প্রত্যাশা, আলোচ্য অভিযোগের আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানে সরকার একটা শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করিয়া সংশ্লিষ্ট সকলকে জবাবদিহির আওতায় আনিয়া দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করিবে। 

 

আরও পড়ুন

×