জাতীয় কৃষি দিবস
টেকসই কৃষি যেভাবে সম্ভব
গোলাম মর্তুজা সেলিম
প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৩ | আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক ও উর্বর মাটির দেশ, যেখানে কৃষিই জাতীয় জীবনের মূল চালিকাশক্তি। হাজার বছরের এই কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে পহেলা অগ্রহায়ণ-নবান্ন উৎসবের দিনটিকে ‘জাতীয় কৃষি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বাংলার হেমন্তকাল মানেই ধান কাটা, নতুন চালের পিঠা-পায়েস আর কৃষকের মুখে হাসি। এই দিনটি কৃষির অগ্রযাত্রা পর্যালোচনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণের এটি এক জাতীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
কৃষি এখন ‘প্রডাকশন’ থেকে ‘সাসটেইনেবল প্রডাকশন’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হচ্ছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হলো ধান। বিআরআরআই ১২০টিরও বেশি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে লবণাক্ততা, খরা ও বন্যা সহনশীল জাতগুলো উপকূলীয় অঞ্চলে ধানচাষের মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। সবজি ও ফলের উন্নত জাতের জনপ্রিয়তা বাড়ায় সেগুলো এখন রপ্তানিযোগ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষিতে এখন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। কৃষকরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফসলের রোগ নির্ণয়, বাজারদর, আবহাওয়া তথ্য ও সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন। ড্রোন ইমেজিং, স্যাটেলাইট মনিটরিং ও রিমোট সেন্সিং ডেটা ব্যবহার করে জমির স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। স্মার্ট কৃষি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ কৃষি ৪.০ বা ‘স্মার্ট এগ্রিকালচার’-এর যুগে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের এই জলবায়ু সহনশীল কৃষি মডেল আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। জমি ক্রমশ কমছে, উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষিজমির প্রায় ৩০% জলবায়ু ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তাই টেকসই কৃষি কৌশলই একমাত্র সমাধান।
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি হলেও এর প্রাণপুরুষ সেই কৃষক আজও সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০% কৃষির সঙ্গে যুক্ত, অথচ কৃষির মোট জিডিপি অবদান মাত্র ১৩-১৪%। এর মানে দাঁড়ায়, কৃষকের পরিশ্রমের প্রকৃত আর্থিক মূল্য সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এই বৈষম্যই কৃষকজীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থা এখনও মধ্যস্বত্বভোগীনির্ভর। কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে একাধিক ধাপ পার হয়, যেখানে কৃষক সর্বনিম্ন অংশ পান। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ঘাটতি থাকায় প্রতি বছর প্রায় ২৫-৩০% কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। যদি কার্যকর কৃষি বীমা ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে কৃষকরা উৎপাদনে ঝুঁকি নিতে সাহস করবেন। নারী কৃষকের অবদানও প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়। এখন সময় এসেছে নারী কৃষকদের স্বীকৃতি ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার।
বাংলাদেশের কৃষি এখন অতীতের পরিশ্রমনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। ‘আগে কৃষি ছিল বেঁচে থাকার উপায়, এখন কৃষি উন্নয়নের হাতিয়ার।’ কৃষির ভবিষ্যৎ এখন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। প্রিসিশন ফার্মিং, স্মার্ট গ্রিনহাউস, ড্রোন ডেলিভারি সিস্টেম, বায়োইনফরমেটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কৃষি নীতিনির্ধারণ–এই ধারণাগুলো আগামী দিনের কৃষিকে পুনর্গঠন করবে। বিশ্ব কৃষিবাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হলে এই প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি বিপ্লবকে আরও বিস্তৃত করতে হবে। পাশাপাশি, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক-থেকে-ভোক্তা’ সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কৃষিই কৃষ্টি, কৃষিই সমৃদ্ধি। বাংলাদেশের কৃষি আজ ঐতিহ্য, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনের সম্মিলন। কৃষকদের পরিশ্রমেই দেশ এগিয়েছে খাদ্যে স্বনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক উন্নতির পথে। তাদের সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষাই হতে হবে আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। একটি টেকসই, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষকবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হোক ২০২৫ সালের জাতীয় কৃষি দিবসের মূল অঙ্গীকার।
গোলাম মর্তুজা সেলিম: যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি চেয়ারম্যান-হামার ঠাকুরগাঁও
[email protected]
