নির্বাচন
ভোট গ্রহণ হোক ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাচীনকালে রাজদরবারে থাকতেন জ্যোতিষী। তারা রাজা ও রাজ্যের কল্যাণে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নিরূপণ করতেন। তাদের গণনার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হতো উৎসব, পালা-পার্বণ, মৃগয়া গমন, যুদ্ধ প্রস্তুতির দিন। এখন রাজা নেই, দরবারে জ্যোতিষীও থাকে না। আধুনিক রাষ্ট্রে তিথি-নক্ষত্র গণনার বালাই নেই। দেয়াল ক্যালেন্ডারও ব্যাক ডেটেট হয়ে গেছে। এখন নির্বাচনের তারিখও হয়তো নির্ধারিত হয় মোবাইল ফোনে ক্যালেন্ডার দেখে।
ফোনের, দেয়ালের আর পঞ্জিকার তারিখ সব একই থাকে; কিন্তু একটু ফারাকও থাকে। ফারাক আছে বলেই ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পড়েছিল ২৫ রমজানে। দেশের সংক্ষিপ্ততম সংসদের জন্ম হয়েছিল ওই নির্বাচনের মাধ্যমে। দেশের সর্বশেষ তিন নির্বাচনেরও পথিকৃৎ মনে করা হয় ওই নির্বাচনকে। পূর্ববর্তী সংসদ ভেঙেছিল ২৪ নভেম্বর। সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচন করতে হতো ২২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর ত্রিদলীয় আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এরই মাঝে নির্বাচনের দিন ঠিক হলো ফেব্রুয়ারির ১৫ বা রমজানের ২৫ তারিখ। তখন চলছিল কৃষ্ণপক্ষ; সব কিছু ঢেকেও গিয়েছিল গভীর অন্ধকারে।
আমাদের নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণের তারিখ ঠিক করতে গিয়ে সম্ভবত চাঁদের হিসাব রাখে না। যেন চাঁদের তারিখ শুধু উৎসব, আবহাওয়া অধিদপ্তর, সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে আর বাতের রোগীদের জন্য। পূর্ণিমায় যে মুফতে উজাড় করা আলো পাওয়া যায়, যে আলোয় দূর হয়ে যায় পথ চলার ভয়, অনেকটা দূর পর্যন্ত হয়ে যায় নিকট, ঘরের বাইরে থাকলে সে আলোয় বাড়ে আত্মবিশ্বাস। মরমি কবি হাসন রাজার প্রপৌত্র আরেক কবি মমিনুল মউজদীন সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালে পূর্ণিমা রাতে পথ-আলো নিভিয়ে রেখে শহরবাসীকে উপভোগ করাতেন চাঁদনি রাতের পরশ। আমাদের বেশির ভাগ নির্বাচন কমিশন সে পরশ নিতে দৃশ্যত অনাগ্রহী।
বাস্তবতা হচ্ছে, ভোটের দিন ভোট গ্রহণই শেষ কথা নয়; নির্ধারিত সময়ের পর ভোট গণনা, ফলাফল তৈরি করতে করতে কোনো কোনো কেন্দ্রে রাতের বয়স বাড়ে। সব কেন্দ্রই শহরে বা শহরের নিকটবর্তী নয়। কোনো কোনো কেন্দ্র সহকারী রিটার্নিং অফিসারের অফিস থেকে ২০-৩০ কিলোমিটার বা আরও দূরে অবস্থিত। সেইসব কেন্দ্র থেকে কমপক্ষে জনাদশেক ভোট গ্রহণকারী কর্মচারী, জনাপনেরো নিরাপত্তারক্ষী সাকল্যে, কমপক্ষে পঁচিশজনের বহরকে নির্বাচনের ফলাফল, ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত নির্বাচনী মালসামানা নিয়ে রাতের মধ্যেই পৌঁছাতে হয় সহকারী রিটার্নিং অফিসারের অফিসে। ঢাকায় বসে যতই ভাবি সারাদেশ এখন বিদ্যুতের আলোয় ভাসে কিন্তু ওই নির্বাচনী কাজে কেন্দ্র পর্যায়ে সম্পৃক্ত কর্মী মাত্রই জানেন প্রাকৃতিক চাঁদের আলো তাদের কতটা ভরসা জোগায়।
দেশে ভরা পূর্ণিমা বা শুক্লপক্ষে পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়ে নির্বাচন হয়েছে মাত্র চারটি। শুক্লপক্ষে প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৮-তে আর শেষটি ২০১৮-তে, যে দুটি নির্বাচনের একটিও সর্বজনীন ছিল না। সর্বজনীন দুটো নির্বাচন ১৯৯১ ও ২০০১-এর নির্বাচন হয়েছিল ভরা পূর্ণিমায় বা আগের দিন। কাকতালীয়ভাবে এই দুই নির্বাচনে একটি দলই নির্বাচিত হয়েছিল। চান্দ্রমাসের ১, ২ বা ৪ তারিখেও তিনটি নির্বাচন হয়েছে। শুক্লপক্ষ হলেও এই তিন দিনের আলো প্রভাব ফেলে না প্রকৃতিতে। বাকি পাঁচটি নির্বাচন হয়েছে ঘোর কৃষ্ণপক্ষে। এই আটটি নির্বাচনে প্রচারণা চালাতে হয়েছে কৃষ্ণপক্ষের নিকষ কালো অন্ধকারে। কৃষ্ণপক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা কত কষ্টের, তা জানেন প্রার্থী ও কর্মীরা। কৃষ্ণপক্ষে সন্ধ্যার পরে গ্রামাঞ্চলে ভোটের প্রচারণা যতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সে তুলনায় শুক্লপক্ষে প্রচারণা চালানো প্রার্থী ও কর্মীদের জন্য কম ঝুঁকির।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠানে সরকারপ্রধান ও নির্বাচন কমিশন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে লক্ষ্যেই সকল আয়োজন চলছে। যতদূর বোঝা যাচ্ছে, ১৯ ফেব্রুয়ারি রোজা শুরু হবে। ওদিকে ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে পূর্ণিমা ও ১৭ তারিখে অমাবস্যা। পূর্ণিমার পর প্রতিদিন প্রায় ৪৫ মিনিট দেরি করে চাঁদ উঠবে অর্থাৎ কৃষ্ণপক্ষ শুরু। যত দিন যাবে তত সন্ধ্যার পর আঁধার ঘন হবে।
আসন্ন নির্বাচনে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের দুই লাখ ৪৪ হাজার ৪৬৯টি বুথে মোট সাত লাখ ৭৬ হাজার ১৬৮ জন ভোট গ্রহণকারী থাকবেন। সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ আনসার, পুলিশসহ মোট কর্মী থাকবেন প্রায় ১৪ লাখ। পোলিং এজেন্ট হিসেবে প্রতি বুথে সর্বনিম্ন পাঁচজন করে হলেও মোট এজেন্ট থাকবেন ১২ লাখের ওপরে। কমপক্ষে এক লাখ ভোট পর্যবেক্ষক, সাংবাদিকসহ কেন্দ্র পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট লোকবল হবে ২৭ লাখ।
এর মধ্যে ৫ শতাংশ কেন্দ্র দুর্গম স্থানে বিবেচনা করলেও ভোটের দিন অন্তত এক লাখ ৩৫ হাজার মানুষ সহকারী রিটার্নিং অফিসারের অফিস থেকে দূরবর্তী কেন্দ্রে অবস্থান করবেন। সংখ্যাটি নেহাত কম না। এটি ঠিক, তাদের সবাইকে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের অফিসে আসতে হবে না কিন্তু প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পুলিশ, পর্যবেক্ষক, সাংবাদিকসহ কমপক্ষে হাজার কুড়ি মানুষকে নির্বাচনের রাতে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে। তাদের নিরাপত্তার স্বাভাবিক রক্ষাকবচ নির্বাচন কমিশনকে ভাবতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি হয় ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে, তাহলে পূর্ণিমায় সেদিন চাঁদের আলোয় ভাসবে গোটা দেশ। দূর হয়ে যাবে আঁধারের ভয়। আঁধারের ভয় যদি মনে বাসা না বাঁধে তাহলে ভোট গ্রহণকারী কর্মচারীরা ভোট নেবেন নির্বিঘ্নে। ভোটের পরেও চাঁদনি পশর আলোয় ভোটকেন্দ্রের চত্বর থাকবে উৎসবমুখর। এতে আশা জাগে ভোট-পরবর্তী হাঙ্গামার আশঙ্কাও যাবে অনেকটা কমে।
টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর মানুষ চায় এবারের ভোট হবে উৎসবের মতো। তাই পূর্ণিমা তিথিই হতে পারে মোক্ষম দিন। তা ছাড়া ১ ফেব্রুয়ারি দিনটিও পড়েছে রোববারে, দুদিনের সাপ্তাহিক ছুটির পরে। ফলে নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর কাজ বণ্টন সহজতর হবে। সকল দিক বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনটি ভোটের জন্য বেছে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী অনায়াসে তপশিল প্রকাশ করলে ভোটের দিনের অন্তত ৫০ দিনেরও বেশি ব্যবধান থাকবে।
এখন দেখা যাক আসন্ন নির্বাচনকে উৎসবে পরিণত করতে নির্বাচন কমিশন প্রাকৃতিক আলোর সুবিধা নিয়ে পূর্ণিমা তিথিতে ভোটের দিন ঠিক করে কিনা!
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত
অতিরিক্ত সচিব
