ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা

অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২১ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট- আইইডিসিআরের এক জরিপ বলছে, আইসিইউতে থাকা ৪১ শতাংশ রোগীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। মঙ্গলবার সমকালে এ উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে।

রোগাক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা যখন সাধারণ ওষুধে সারানো কঠিন হয়ে পড়ে, তখন ডাক্তাররা অ্যান্টিবায়োটিক দেন। এতে রোগীর শরীরে ব্যাকটেরিয়া কিংবা অন্য কোনো জীবাণু সংক্রমণ বন্ধ হয়; রোগী সুস্থ হয়। এ কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার ছিল যুগান্তকারী এক ঘটনা। কিন্তু আইইডিসিআরের জরিপের ফল বিশেষ করে জীবাণু সংক্রমণের কারণে মৃত্যুপথযাত্রীদের শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে।

দেশে যেসব ক্ষেত্রে সমস্যা অত্যন্ত প্রকট রূপ লাভ করেছে, তার মধ্যে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংকট অন্যতম। বর্তমানে দেশে খুব কমই মানুষ পাওয়া যাবে, যারা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সন্তুষ্ট। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, আমরা এখন দেশের ডাক্তার, হাসপাতাল, ওষুধ উৎপাদক বা কোম্পানি কোনোটার ওপরেই আস্থা রাখতে পারছি না। অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার খবর সেই অনাস্থাকে আরও জোরালো করল। 

প্রতিবেদনমতে, জরিপে জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত ৯৬ হাজারের বেশি রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তা ছাড়া পাঁচটি আইসিইউ থেকে সংগৃহীত নমুনায় ৭১ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক পরীক্ষা করা হয়েছে, যেখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগীর দেহে কোনো ওষুধই কাজ করছে না বলে জানা গেছে।
আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন হাবিবের মতে, ‘যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াই জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এই এএমআর(অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স) এখন জনস্বাস্থ্যের 
জন্য বড় সংকট।’ 

অ্যান্টিবায়োটিক স্বীকৃত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সেবন নিষিদ্ধ হলেও এখানে ওষুধের দোকানিরা মুড়িমুড়কির মতো তা বিক্রি করে। ফলে অপ্রয়োজনীয় সেবন ছাড়াও উপযুক্ত মাত্রায় এ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সেবন অনেকাংশেই হয় না। এ ক্ষেত্রে ডাক্তাররাও অনেকাংশে দায়ী। ওষুধ কোম্পানির চাপে তারা দরকার না থাকলেও তা সেবনের পরামর্শ দেন। এসব নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। 

স্বাস্থ্য খাত মানে শুধু রোগব্যাধির বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আমাদের পরিবেশ-প্রকৃতি। ফলে চারপাশের নদীনালা, গাছপালাসহ সামগ্রিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে আমাদের স্বাস্থ্য কেমন। কিন্তু বিশেষত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের মধ্য দিয়ে আমরা যেমন একদিকে আরামদায়ক জীবন নিশ্চিত করেছি, তেমনি তা বিভিন্ন নেতিবাচক দিক বাড়িয়ে তুলেছে। বিশ্বব্যাপী এখন জলবায়ু উষ্ণায়ন বেড়ে গেছে। রোগব্যাধির বৈচিত্র্যও বাড়ছে। কভিড-১৯ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, কভিড ভ্যাকসিন দেওয়ার পর থেকে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার কারণ শুধু চিকিৎসাসেবার দুর্বলতা নয়; এর সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন যুক্ত।

আজকাল আমাদের খাবারদাবারেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত খাবার এখন প্রতি মুহূর্তের ঘটনা। বালক-বালিকার পাশাপাশি এখন সর্বস্তরের মানুষ ফাস্টফুড খেতে অভ্যস্ত। আবার বাজারে কেমিক্যালমুক্ত সবজি কিংবা তরকারি পাওয়া দুর্লভ। 
অ্যান্টিবায়োটিকের যাচ্ছেতাই ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। তবে জীবনযাপনের সার্বিক পরিবেশে অগ্রগতি ঘটাতে না পারলে আমাদের স্বাস্থ্য সংকট নিরসন সম্ভব নয়। পরিবেশ উন্নয়ন, নদীনালা সংরক্ষণ, খেলার মাঠ থাকা, কেমিক্যালমুক্ত তরকারি ও সবজি উৎপাদন, কৃত্রিম পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাবার এড়িয়ে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, সামাজিক সম্পর্কগুলো নিবিড় করে মানসিক প্রশান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন আরও সহানুভূতিশীল করে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে সুন্দর ও প্রশান্তিময় জীবনযাপন সম্ভব। তার জন্য চিকিৎসাসেবাকে আরও বেশি উন্নত ও যুগোপযোগী করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে আরও আন্তরিক হতে হবে। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 

আরও পড়ুন

×