বাউলশিল্পীদের উপর হামলা
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার হেতু কী?
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩২ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রবিবার মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পীদের উপর হামলার ঘটনায় সোমবার মামলা হইবার পরও অদ্যাবধি কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হইবার বিষয়টি উদ্বেগজনক। হামলাও হইয়াছে পুলিশের উপস্থিতিতে। ঘটনার ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র ও প্রতক্ষ্যদর্শীর অভাব নাই; আসামি চিহ্নিত। তথাপি আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের গড়িমসির হেতু কী? বস্তুত আসামি ও অভিযুক্ত অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্পষ্ট হইয়াছে। তথাপি পুলিশ হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হইয়াছে কী কারণে? এই ক্ষেত্রে পুলিশের আন্তরিকতার ঘাটতি লইয়া সন্দেহ করা কঠিন। আমরা দেখিয়াছি, ইতোপূর্বে বিশেষত বাউলশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপর একাধিক হামলা হইয়াছে; কোনো ক্ষেত্রেই পুলিশকে প্রত্যাশিত মাত্রায় সক্রিয় দেখা যায় নাই। কোনো কোনো এলাকায় বাউলদের আখড়ায় হামলা করিয়া বাদ্যযন্ত্রসহ ঘরবাড়ি পোড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। অনেক বাউলের চুল-দাড়ি জোরপূর্বক কর্তনের ন্যায় মানবাধিকারবিরোধী ঘটনাও ঘটিয়াছে। এই সকল ঘটনায়ও পুলিশ প্রতিকার বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। এই সন্দেহ অমূলক হইতে পারে না, সরকারের সবুজ সংকেতের অভাবেই মানিকগঞ্জসহ অন্যান্য এলাকায় পুলিশ সক্রিয় হইতেছে না।
আমরা জানি, বাউলশিল্পীদের সহিত পীর-ফকিরের খানকা ও মাজারের সংযোগ নিবিড়। প্রথমোক্তরা এই সকল স্থাপনায় রাতের পর রাত পালাগানসহ নানা ভক্তিমূলক সংগীত পরিবেশন করিয়া থাকেন। গত বৎসর ৫ আগস্টের পর হইতে বহু খানকা ও মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছে। গত ১৮ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং পূর্ববর্তী সাড়ে পাঁচ মাসে মাজার-দরগায় ৪৪টি হামলার কথা স্বীকার করিয়াছিল। অন্যদিকে ২৩ জানুয়ারি বিশ্ব সুফি সংস্থা নামে একটি সংগঠন দাবি করিয়াছিল, পূর্ববর্তী ছয় মাসে ৮০টি মাজার ও দরবারে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার মাজারে কেবল হামলা নহে, তাঁহার মরদেহ তুলিয়া পোড়াইয়া দেওয়া হয়। ঐ ঘটনার পরও সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়াই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করিয়াছিল।
সন্দেহ নাই, যেই অভিযোগে বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে, তাহা ধর্মীয়ভাবে স্পর্শকাতর। প্রতিবেদনমতে, গত ৪ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওরে খালা পাগলির ওরসে ‘জীব ও পরম’ পালাগানের একটি বক্তব্য লইয়া তাঁহার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মামলা হয়। কিন্তু মামলা যত স্পর্শকাতরই হউক, রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন অভিযুক্তের মুক্তি দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির অধিকার দিয়াছে। সেই কর্মসূচিতে হামলা স্পষ্টতই ফৌজদারি অপরাধ। ফলে আইনের শাসনে বিশ্বাসী হইলে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব উক্ত অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় লইয়া আসা।
বস্তুত গত সাড়ে ১৪ মাসে বিশেষত রাজনীতি ও ধর্মকে ব্যবহার করিয়া সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করিতে একটি বিশেষ মহল দেশে মব সহিংসতার যেই বিস্তার ঘটাইয়াছে, তাহা হইতে মানিকগঞ্জ বাউলশিল্পীদের উপর হামলাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখিবার কোনো সুযোগ নাই। উপরন্তু সরকার যেইভাবে কখনো মৌন থাকিয়া এবং কখনো সক্রিয়তার ভান করিয়া অদ্যাবধি সংঘটিত প্রায় সকল মব সহিংসতায় ইন্ধন দিয়াছে, তাহাতে পুলিশ ও অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট ভিন্ন কিছু আশা করা বৃথা, যদিও উহা জননিরাপত্তা লইয়া নাগরিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহাও স্বীকার্য, যেই সহনশীলতা ও সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি দীর্ঘদিন আমাদের সমাজকে একসূত্রে বাঁধিয়া রাখিয়াছিল; শাসকদের ধারাবাহিক বৈরী আচরণসহ নানা কারণে তাহা দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে, যাহার মূল আঘাত সহ্য করিতে হইতেছে নাজুক সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীগুলিকে।
আমাদের বিশ্বাস, অন্তত বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পূরণের স্বার্থেও সরকার বাউলসহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য ও অন্যান্য অধিকার সুরক্ষায় আগাইয়া আসিবে। মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
- বাউলশিল্পী
- হামলা
