ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্যোগ

ভূমিকম্পে ভূমির সঙ্গে কেঁপেছে আমাদের মনোজগৎ

ভূমিকম্পে ভূমির সঙ্গে কেঁপেছে আমাদের মনোজগৎ
×

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৪ | আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি একটি ভূমিকম্প ঢাকাকে কাঁপিয়ে গেল। কম্পনটি স্থায়ী ছিল কয়েক সেকেন্ড। এর মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত ছিল আরও অনেক দীর্ঘ। বাংলাদেশে যেন ভূমিকম্প নয়; হয়েছিল ভীতিকম্প। 

বিষয়টি বোঝার জন্য ভূমিকম্প বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি জরুরি মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে অনিশ্চয়তায় প্রতিক্রিয়া জানায়; আবেগ কীভাবে সমাজে সংক্রমিত হয় এবং আধুনিক মিডিয়া কীভাবে আমাদের সহজাত দুর্বলতাকে কাজে লাগায়– এ সবকিছু বোঝা। সে ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে ফ্রাঙ্ক ফারান্ডারের ‘দ্য ফিয়ার প্যারাডক্স: হাউ আওয়ার অবসেশন উইথ ফিলিং সিকিউর ইমপ্রিজনস আওয়ার মাইন্ডস অ্যান্ড শেপস আওয়ার লাইভস’ শীর্ষক বই। অনুবাদ করলে বইটির শিরোনাম দাঁড়ায় ‘ভয়ের গোলকধাঁধা: নিরাপত্তার মোহ কীভাবে আমাদের মন ও জীবনকে বন্দি করে’। 

লেখকের মতে, আধুনিক সমাজ নিরাপদ ‘মনে হওয়া’র আকাঙ্ক্ষায় এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, এই নিরাপত্তা-লোভই মানুষকে আরও উদ্বিগ্ন ও কম সহনশীল (রেজিলিয়েন্ট) করে তুলেছে; সহজে প্রভাবিত হওয়ার অবস্থায় নিয়ে গেছে। ঢাকার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া যেন এই ‘ভয়ের প্যারাডক্স’-এর সরাসরি উদাহরণ।

যুগে যুগে মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। আমরা মহামারি দূর করেছি। আমরা বিদ্যুৎ ও উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করেছি। আমাদের পূর্বপুরুষরা যেসব বিপদে মারা যেত, সেসব থেকে আমরা আজ নিরাপদ। সব দিক দিয়েই আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে নিরাপদ সময়ে বাস করছি। অদ্ভুত বিষয় হলো, আমরা যত নিরাপদ হচ্ছি, আমাদের ভয় তত বাড়ছে। আমরা আগের চেয়ে নিরাপদ, কিন্তু অনেক বেশি আতঙ্কিত। একেই বলে ‘ফিয়ার প্যারাডক্স’ বা ভয়ের গোলকধাঁধা। অতিরিক্ত নিরাপত্তা খুঁজতে গিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় ডুবে যাচ্ছি। এই ভয়ের কারণেই আমরা জীবনটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারছি না।

কেন আমরা এত সহজে ভড়কে যাই
মানব মস্তিষ্কের ভয়-প্রক্রিয়া বিবর্তনের পথে বেঁচে থাকার জন্য তৈরি হয়েছে। মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ আমাদের দ্রুত সতর্ক সংকেতযন্ত্র। হঠাৎ বিপদ শনাক্ত করে শরীরকে প্রস্তুত করে। এতে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়; শ্বাস দ্রুত হয়। মনোযোগ সংকুচিত হয়। বিপদের মুহূর্তে এই প্রতিক্রিয়া জীবন রক্ষা করে। কিন্তু আধুনিক পরিবেশে অ্যামিগডালা শুধু বাস্তব বিপদেই নয়, তথ্যের মাধ্যমেও সক্রিয় হয়। সংবাদের শিরোনাম, ভিডিও, অনলাইন গুজব, ভয়েস নোট সবকিছুই আমাদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালাকে সক্রিয় করে। এটি সত্যিকারের বিপদ ও একটি উত্তেজক পোস্টের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিপদের অনুভূতি।
স্বাভাবিক অবস্থায় মস্তিষ্কের যুক্তি ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র তথা প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অ্যামিগডালাকে শান্ত করে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী চাপ, অনিশ্চয়তা এবং ক্রমাগত উদ্বেগ সৃষ্টিকারী কনটেন্ট এই নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। তখন মস্তিষ্ক অল্পতেই ভয় পায় এবং সহজে স্থিতিশীলতায় ফিরে যেতে পারে না। 

কীভাবে ভয় সংক্রমিত হয়
ভয় সামাজিকভাবে খুব দ্রুত ছড়ায়। স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ মুখভঙ্গি, আচরণ, বার্তা এসব দেখে বিপদের সংকেত শিখে নেয়। অন্যের আতঙ্ক আমাদের নিজের ভয়-সার্কিট সক্রিয় করে। বাংলাদেশে তিনটি পথে সবচেয়ে বেশি ভয় ছড়ায়। সেগুলো হলো অতিপ্রতিযোগিতামূলক সংবাদমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমিক ত্বরণ ও সামষ্টিক স্মৃতিতে দুর্বলতার ছাপ। হাজারো অনলাইন সংবাদমাধ্যম ক্লিকের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে প্রতিনিয়ত। 
ভয় ছড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ভীতি-জাগানিয়া শিরোনাম– ‘বড় ভূমিকম্প আসছে!’ ‘ঢাকা বিপৎসীমায়!’ ‘বিশেষজ্ঞদের ভয়াবহ সতর্কতা!’ এতে যে-খবরের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তাও ‘ক্লিক’ পায়। 

ভয়ের চড়া দাম 
অতি ছোট কম্পন যদি বিশাল আতঙ্ক তৈরি করে, তবে মানুষ সত্যিকারের বিপদের সময় কীভাবে স্থির থাকবে? সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা করার ফলে মানসিক শান্তি নষ্ট হয়। মানুষ সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এতে ডিপ্রেশন আর অ্যাংজাইটি বাড়ে। আমরা কাল্পনিক বিপদের ভয়ে বাস্তবে অসুস্থ হয়ে পড়ি।
ভয়ে মস্তিষ্ক সংকীর্ণ হয়। মানুষ ভুলভাবে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ায়, বিপজ্জনক জায়গায় জড়ো হয়। ফলে আঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। আবার মানুষ যখন বেশি নিরাপত্তা পায়, তখন সে অজান্তেই বেশি ঝুঁকি নেয়। যেমন গাড়ির ব্রেক ভালো হলে মানুষ আরও জোরে গাড়ি চালায়। অর্থাৎ, সব ঝুঁকি কমানো যায় না। অন্যদিকে, যেখানে ভয়ের আধিপত্য, সেখানে গুজবের ক্ষমতা বেশি। কেউ চাইলে ভয়কে ব্যবহার করে সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এ ছাড়া ভয় দেখিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ। অনেক সময় রাষ্ট্র বা নেতারা কাল্পনিক ভয়ের কথা বলে আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেন। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আমরাও তখন বন্দিজীবন মেনে নিই।

এই চক্র ভাঙার উপায়
শতভাগ নিরাপত্তা বা ‘রিস্ক-ফ্রি’ জীবন বলে কিছু নেই। আমাদের ভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বদলাতে হবে। এ ছাড়াও জরুরি হলো দ্রুত, বিজ্ঞানভিত্তিক সরকারি বার্তা প্রদান ব্যবস্থা, মিডিয়ার জন্য সংকট-সংবাদনীতি গ্রহণ, ডিজিটাল ও আবেগ-সচেতনতা শিক্ষা প্রদান, স্কুল ও কমিউনিটিতে ভূমিকম্প প্রস্তুতি মহড়া, বিশ্বস্ত সামাজিক নেতৃত্ব সক্রিয় করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা। আর ভয়ের উল্টো শব্দ সাহস নয়। ভয়ের উল্টো হলো ‘কাজ করা’। সবচেয়ে জরুরি হলো বাস্তব বিপদ চিনতে শেখা। কোনটা আসল ঝুঁকি আর কোনটা বানানো গল্প, তা বুঝতে শিখতে হবে। সেই সঙ্গে মেনে নিতে হবে অনিশ্চয়তাকে। জীবনে ঝুঁকি থাকবেই। সব কিছু নিশ্চিত করতে চাইলে মানুষ কখনোই নতুনের দেখা পাবে না। 

ফ্যারান্ডারের ভয়ের প্যারাডক্স আমাদের মনে করিয়ে দেয়– যে সমাজ বিপদমুক্ত হতে চায় সব সময়, সেই সমাজ শেষ পর্যন্ত বিপদের ছায়ায় বাস করতে শেখে। বাংলাদেশ একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে: আমরা কি ভয়ে চালিত সমাজ হবো, নাকি জ্ঞাননির্ভর স্থিতির সমাজ? ভূমিকম্প আসবে। এটিই প্রকৃতির নিয়ম। ভয়কে যদি আমরা সমাজের গভীরে সক্রিয় ‘ফল্ট লাইন’ বানিয়ে দিই, তবে বিপদ প্রাকৃতিক নয়, আমাদের নিজেদেরই তৈরি।

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম: জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ; শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল
আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)

 

আরও পড়ুন

×