ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চারদিক

নবান্ন উৎসব

নবান্ন উৎসব
×

মো. শহিদুল্লাহ সিকদার

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:০৭ | আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৫৪

দেশে আমন ধান কাটার পরই নবান্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনেক অঞ্চলে তিনটি মৌসুমে ধান কাটা হয়। যেমন আমন, বোরো ও আউশ। কিন্তু সামগ্রিকভাবে প্রায় সব অঞ্চলে একই সময় নতুন ধান কাটা হয়। সেই সময় হলো আমন। আমন ধান শুধু কাটার বিষয় নয়।

এ সময় হেমন্তের এই নাতিশীতোষ্ণ বাংলার যে আবহাওয়া, এটি শত শত বছর ধরে বাঙালির মনে এক মানবিক সংস্কৃতিবোধ তৈরি করেছে। এটি ধনী-গরিব সব মানুষকেই যেন একটি অজানা ভালো লাগার আমেজে একসঙ্গে একই সুতোয় হৃদয়কে বাঁধতে পেরেছে। ধনী-গরিব সব পেশার মানুষ এ উৎসব উদযাপনে চেষ্টা করে।

তাই পল্লিকবি জসীম উদ্‌দীন তাঁর ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থে নবান্ন উৎসবের অনন্যসুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন– ‘আশ্বিন গেল, কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান,/ সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হল্‌দি-কোটার গান।/ ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়িছে বায়,/ কলমীলতায় দোলন লেগেছে, হেসে কূল নাহি পায়।’

গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিছু জায়গায় হেমন্তেই শীতের আমেজ দেখা দেয়। শরৎ এবং শীতের মাঝামাঝি একটি ঋতু, যেই ঋতুকে অনেক কবি-সাহিত্যিক সবচেয়ে প্রিয় ঋতু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণনার অন্যতম কারণ হলো, কৃষকের ঘরের হাসি। এখানে শুধু পিঠা উৎসব নয়। এর পাশাপাশি অনেক জায়গায় নাচ-গান, অনুষ্ঠান ও স্থানীয় কিছু অঞ্চলভেদে একেক ধরনের লোকগানের আয়োজন করা হয় এবং অনেক জায়গায় মেলা বসে। এই যে নবান্ন উৎসব; এ উৎসব দীর্ঘদিন থেকে যে বাঙালি সমাজ বিজাতীয় দ্বারা শাসিত হয়েছে, সেই সমাজে নিজস্ব সংস্কৃতি নিজস্ব ভূমিতে নিজের উৎপাদিত ফসল, নিজের ঘর, নিজের প্রাকৃতিক পরিবেশে তার পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারের যে ভালো লাগার সামাজিক আয়োজন, সে আয়োজনকে ধারণ করে অতীত, অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে একইভাবে বর্তমানকে উপভোগ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থনা করে, ভবিষ্যতের সুখকর, সুখময় সম্ভাবনার  কথা ভেবে আনন্দিত হয়।

আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সময় সংকীর্ণতার এই যে বিশাল জোয়ার আজ শুধু শহর নয়, গ্রামকেও ক্রমে গ্রাস করছে। সেই সময় নিষ্পাপ, নির্মোহ, প্রকৃতিনির্ভর মাটির এই ফসলকে দিয়ে মানুষ নিজের ঘরে আনন্দের সম্ভাবনা এবং আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে অনাবিল সুখ অনুভব করে। তাই নবান্ন শুধু উৎসব নয়; এটি বাঙালির ঐতিহ্য, ভালো লাগা, বঞ্চনার থেকে মুক্তি এবং সুখময় ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দীর্ঘদিনের প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতা; যে আনুষ্ঠানিকতা এখনও বাংলার ঘরে ঘরে, গ্রামগঞ্জে উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়।

এই নবান্ন উৎসব সমতল অঞ্চলে একভাবে উদযাপন করা হয়। তেমনই পাহাড়ি অঞ্চলে তা ভিন্নরূপে উদযাপিত হয়। আবার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষও তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অনুযায়ী নবান্নকে বিশেষভাবে উদযাপন করে। কিন্তু মূল অবদান– প্রকৃতি, জমি, মাটি এবং মাটির ফসল যে আমাদের মায়ের মতো স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা এবং বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়; সেই কথাটি এই উৎসবের মাধ্যমে সব অঞ্চলের মানুষ স্মরণ করে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা‌ ও ভক্তির সঙ্গে এবং সেই উৎসব তাদের নতুন শক্তি, অনুপ্রেরণা এবং নতুনভাবে বেঁচে থাকার একটি সম্ভাবনার উন্মুক্ত স্থানে নিয়ে যায়।

নবান্ন উৎসব সবাই মিলে উদযাপন করে। আমাদের এ উৎসবকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ উৎসব আমাদের জন্য কল্যাণকর ও বেঁচে থাকার এক অফুরন্ত শক্তির জোগানদার আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। বিশ্বাস করি, নবান্ন উৎসব আমাদের সংকীর্ণতা ভুলে নিষ্পাপ, নির্মোহ মানুষ হিসেবে বাঁচার শক্তি জোগাবে এবং আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

অধ্যাপক ডা. মো. শহিদুল্লাহ সিকদার: সাবেক প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

আরও পড়ুন

×