ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নির্বাচনী বিলবোর্ড

পুরান সমস্যার স্থলে নূতন সমস্যা কাম্য নহে

পুরান সমস্যার স্থলে নূতন সমস্যা কাম্য নহে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:১৮ | আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৫২

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে প্রার্থীদের পোস্টারের পরিবর্তে বিলবোর্ড ব্যবহারের যেই নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে, তাহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। রবিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি জারিকৃত রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য আচরণ বিধিমালায় বলা হইয়াছে, একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড স্থাপন করিতে পারিবেন।

ইহার অর্থ হইল, একটি আসনে যদি ১০ জন প্রার্থী থাকেন, তাহা হইলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অন্তত ২০০ বিলবোর্ড বসিবে। মহানগরীর ১৬টি সংসদীয় আসনে বসিবে তিন সহস্রাধিক বিলবোর্ড। কিন্তু জনবহুল ঢাকা মহানগরীতে বাস্তবে এত বিলবোর্ড স্থাপনের স্থান কি পাওয়া যাইবে? যদি কোনোভাবে বসানো হয় তাহা হইলে শুধু বিলবোর্ডই থাকিবে; নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত পরিসর বলিতে তেমন কিছুই থাকিবে না। প্রার্থীদের মধ্যে বিলবোর্ডের জন্য পছন্দের স্থান লইয়া জটিলতা বা সংঘাত-সংঘর্ষ হইবে না– এমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না। 

যত্রতত্র বিলবোর্ড বসাইলে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কাও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। অতীতে এই ঢাকা মহানগরীতেই বাতাসে বিলবোর্ড ভাঙিয়া লোকজনের হতাহত হইবার একাধিক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, আচরণবিধিতে ১৬ ফুট প্রস্থ ও ৯ ফুট উচ্চতার বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন রহিয়াছে, আকার-আকৃতিতে যাহা ছোট নহে। বৃষ্টি বা ঝড়ের কথা বিবেচনায় রাখিয়া বিলবোর্ড যদি শক্ত ও ভারী বস্তু দ্বারা তৈয়ার করা হয়, তাহা হইলে উপরের আশঙ্কা অমূলক নহে। এদিকে বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন দিয়া থাকে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভাগুলি। প্রতিবেদনমতে, ঢাকায় নির্বাচনী বিলবোর্ড এক মাসের জন্য রাখিতে হইলে অর্ধ লক্ষাধিক টাকা খরচ পড়িবে, যেই খরচ ২০টি বিলবোর্ড বাবদ কমপক্ষে ১০ লক্ষ টাকা হইবে। বড় দল ও বিত্তবান প্রার্থীদের জন্য এই খরচ বেশি না হইলেও ছোট দলগুলি বা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত প্রার্থীদের জন্য তাহা নিশ্চয় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করিবে। ফলস্বরূপ, প্রচারে শেষোক্তরা পূর্বোক্তদের তুলনায় পশ্চাতে থাকিবেন। সর্বোপরি, পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্যও যত্রতত্র স্থাপিত বিলবোর্ড যে ক্ষতিকর হইবে, তাহা বুঝিতে বিশেষজ্ঞ হইতে হয় না। শুধু ঢাকা শহর নহে, অন্যান্য শহরের জন্যও এই বিলবোর্ড যে অধিকতর সমস্যার কারণ হইতে পারে, তাহাও বলা বাহুল্য।

অতীতে যে কোনো নির্বাচনকালে দেয়ালে কাগজের পোস্টার সাঁটানোই ছিল প্রচারের প্রধান উপায়, তাহা আমরা জানি। বিগত দেড় দশক ধরিয়া শহর বা এলাকার সৌন্দর্য রক্ষার স্বার্থে রশিতে পোস্টার ঝুলাইবার বিধান চালু আছে। কিন্তু ঘন কুয়াশা বা বৃষ্টিবাদল হইতে পোস্টার রক্ষার্থে পোস্টারগুলিকে পলিথিন দিয়া লেমিনেটিং করিবার কারণে উহা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি সৃষ্টি করে। একদিকে প্লাস্টিকসহ সেই সকল পোস্টার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিয়া জলাবদ্ধতার জন্ম দেয়, অন্যদিকে সেই পোস্টার অপসারণ করিতে সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলিকে অনেক কাঠখড় পোড়াইতে হয়। সম্ভবত এই সমস্যার সমাধান হিসাবেই বিলবোর্ড সংস্কৃতি প্রবর্তনের পদক্ষেপ গৃহীত হইয়াছে। কিন্তু ইহাতে সমস্যা দূর করিতে গিয়া বরং উপরে যদ্রূপ বলা হইয়াছে, নূতন সমস্যা সৃষ্টির শঙ্কা জাগিয়াছে। 

স্মরণ করা যাইতে পারে, ঢাকা সিটি করপোরেশন দ্বিধাবিভক্ত হইবার পর পরিবেশবাদী, নগরবাসী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের চাপে তৎকালীন দুই মেয়র বিলবোর্ড অপসারণে যুক্ত হইয়াছিলেন। ইহার পর দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীতে কোনো বিলবোর্ডের অনুমতি দেয় নাই, যদিও সম্প্রতি দুই সিটি করপোরেশন রাজস্ব আয় বৃদ্ধির নামে পুনরায় বিলবোর্ডের অনুমতি দেওয়া শুরু করিয়াছে। নির্বাচন কমিশনের উচিত হইবে না এই সমস্যা বাড়াইয়া তোলা।

আমরা মনে করি, নির্বাচনী প্রচার উৎসবমুখর করা যদ্রূপ প্রয়োজন, তদ্রূপ পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য ইহা যাহাতে ক্ষতিকর না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হইবে। পোস্টারকে বিদায় দিতে যদি বিলবোর্ডকে স্বাগত জানাইতে হয়, তাহা হইলে বিলবোর্ডের জন্য স্থান নির্দিষ্ট করিয়া দিতে হইবে। সর্বোপরি, এই সকল সিদ্ধান্ত হইতে হইবে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে। 

আরও পড়ুন

×