নগর শাসন ব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট
মো. হাসিবুল কবীর ও ফয়সাল কবীর শুভ
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে নগর পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বিভিন্ন আলোচনায় বহু ইস্যু সামনে এলেও পরিকল্পিত নগরায়ণ ইস্যুটা তার প্রাপ্য গুরুত্ব এখনও পায়নি। অথচ দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যা, পরিবেশ, কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পর্যন্ত সবকিছুর সঙ্গে নগরায়ণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের মোট জিডিপির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আসে নগর অঞ্চল থেকে। সেই নগরগুলোই আজ বিশৃঙ্খলা, খণ্ডিত পরিকল্পনা, দুর্বল নেতৃত্ব ও অসমতা– এই চার সংকটের ভারে বিপর্যস্ত।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দু-একটি রাজনৈতিক দল বাদে বেশির ভাগের এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু নগরায়ণ নিয়ে তেমন কোনো নীতির কথা শোনা যায়নি। বিএনপি ও এনসিপি উভয় দল তাদের ইশতেহারে নগরসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপির ৩১ দফার মধ্যে ২১ নম্বর– বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বশাসিত ও ক্ষমতাবান করা; ২৮ নম্বর– সড়ক, রেল, নৌপথের আধুনিকায়ন ও বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা; ২৯ নম্বর– জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ এবং নদী শাসন ও খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ; ৩১ নম্বর– যুগোপযোগী, পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব আবাসন এবং নগরায়ণ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে বলা যায় সরাসরি নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে ২১ ও ৩১ নম্বর দফা ভবিষ্যৎ নগরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ার ব্যাপারে এসব দফা অত্যন্ত যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিএনপির জন্য জটিল প্রশ্ন হচ্ছে, এগুলো কে এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করবে?
সক্ষমতা বৃদ্ধি নাকি কাঠামোগত সংস্কার?
বাংলাদেশের নগর সমস্যার জটিলতা এতটাই গভিরে, তা কেবল অবকাঠামোগত নয়; এটি সামাজিক, পরিবেশ ও প্রশাসনিক– সব কিছুর সমন্বিত রূপ। তাই ঢাকা শহরসহ সারাদেশের নগরের পরিকল্পিত উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে কোনো নীতি প্রণয়নের আগে ‘নগর পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের কাঠামো কী হবে’– এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর জানা, একই সঙ্গে অনেক সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
এখানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো জাতীয় পর্যায়ে একটা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে নেতৃত্ব দেবে কোন দপ্তর? অতীতে দেখা গেছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে নগর পরিকল্পনার মতো একটি অত্যন্ত কারিগরি ও কৌশলগত খাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের লক্ষ্যে যে ধরনের যুগোপযোগী পরকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার ছিল, তা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর ফলে পরিকল্পনা প্রণয়ন দুর্বল হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা থাকলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি এবং অসংখ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে পরিকল্পিত উন্নয়ন অত্যন্ত সীমিত রয়ে গেছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নগর শাসন ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোতে যোগ্যতাভিত্তিক, প্রজ্ঞাসম্পন্ন এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনতে হবে।
নগর পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের পথনকশা
বর্তমান বাস্তবতায় নতুন মন্ত্রণালয় বা নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সময়সাপেক্ষ। এ জন্য আমাদের বিশ্লেষণে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে নগর ও স্থানিক পরিকল্পনার নেতৃত্বকারী মন্ত্রণালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা হবে বাস্তবসম্মত। কারণ এই মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যমান বিভাগগুলো ইতোমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ে একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি বিশেষায়িত ‘নগর ও স্থানিক পরিকল্পনা বিভাগ’ গঠন করা যেতে পারে। এ বিভাগের কাজ হবে জাতীয় মহাপরিকল্পনা, নগর উন্নয়ন কৌশল এবং স্থানিক পরিকল্পনার সার্বিক দিকনির্দেশনা বা কৌশল নির্ধারণ করা। এখানে পেশাদার নগর পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন সেক্টরের অভিজ্ঞ পেশাজীবীরা যুক্ত থাকবেন। এই বিভাগ সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে না; বরং রাষ্ট্রের নগর পরিকল্পনার দার্শনিক, কৌশলগত এবং সমন্বয়কারী কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থা একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কাঠামোর আওতায় আসবে এবং খণ্ডিত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া গড়ে উঠবে।
স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ ২০২৫
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রাষ্ট্রীয় আলোচনায় আনার জন্য সরকারের এ উদ্যোগকে অবশ্যই স্বাগত জানানো উচিত। কারণ জাতীয়ভাবে স্থানিক পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন অনুধাবিত হলেও এতদিন এটিকে একটি সুসংহত আইনগত কাঠামোয় আনা যায়নি।
তবে আমাদের বিবেচনায়, স্থানিক পরিকল্পনার মতো একটি কৌশলগত ও আন্তঃখাতভিত্তিক বিষয় যদি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা যেত, তাহলে দেশের নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়নে শক্ত নীতিগত নেতৃত্ব তৈরি করা সম্ভব হতো। কারণ স্থানিক পরিকল্পনা কেবল গৃহায়ন বা অবকাঠামোর বিষয় নয়। এটি ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং নগর-গ্রাম সংযোগ– সবকিছুর সমন্বিত কাঠামো।
আমাদের মতে, স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে এই কাঠামোর নাম ও ভূমিকা আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ‘স্থানিক পরিকল্পনা অনুবিভাগ’-এর পরিবর্তে এটিকে ‘স্থানীয় পরিকল্পনা অনুবিভাগ’ এবং প্রস্তাবিত অধিদপ্তরকে ‘স্থানীয় পরিকল্পনা অধিদপ্তর’ বলা অধিক যুক্তিযুক্ত।
কাঠামোগত সংস্কারে রাজনৈতিক প্রয়াস ও রূপান্তরকালীন নেতৃত্ব
বাংলাদেশের অপরিকল্পিত নগরায়ণের সংকটের সমাধান কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি নেতৃত্বের সংকট, সমন্বয়ের সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার সমন্বিত রূপ। তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস, স্পষ্ট নীতি, যোগ্য নেতৃত্ব ও শক্তিশালী পরিকল্পনা কাঠামো, যার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নগরায়ণ গড়ে উঠবে।
মো. হাসিবুল কবীর ও ফয়সাল কবীর শুভ: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী নগর পরিকল্পনাবিদ; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সদস্য
- বিষয় :
- নগরায়ণ
