ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কূটনীতি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ‘মুখরক্ষার উদ্যোগ’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ‘মুখরক্ষার উদ্যোগ’
×

মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৯ | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি সম্প্রতি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং শরণার্থীদের নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে নতুন করে বৈশ্বিক প্রচেষ্টা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। গত ১৯ নভেম্বর অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যৌথভাবে উত্থাপিত প্রস্তাবে এ আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩ দেশের মধ্যে ১০৫টি এ প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি হলো এই পরিষদের ছয়টি প্রধান কমিটির একটি, যা মানবাধিকার, মানবিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করে। ‘সি-৩’ হিসেবেই এটি সমধিক পরিচিত। প্রতিবছর একবার– অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসে এই কমিটি মিলিত হয়।

যতটুকু জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি এ ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করে আসছে। ফলে এবারের প্রস্তাবকে নতুন কিছু মনে করার কারণ নেই। এর ফলে রোহিঙ্গা সংকটের খুব যে পরিবর্তন ঘটবে– এমন ভাবারও অবকাশ নেই। তাই হয়তো জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল যেসব দেশ প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছে, তাদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপনের পাশাপাশি গত আট বছরে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় এই বলে কিছুটা হতাশাও ব্যক্ত করেছে যে, ‘বাংলাদেশ আর ১৩ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা বহন করতে পারছে না।’

২. 
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাতিসংঘ বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। তারপরও দেশে দেশে যুদ্ধ যেমন থামছে না; তেমনি থামছে না ঘরছাড়া উদ্বাস্তু মানুষের মিছিল। প্রথম দেড় দশকে শরণার্থী বা উদ্বাস্তু সংখ্যা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থাকলেও গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তর দশকে আফ্রিকা ও এশিয়ার কিছু দেশে বি-উপনিবেশায়ন ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্রুতলয়ে বাড়তে থাকে। যেখানে ১৯৬০ সালে বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখের মতো, ১৯৮০ সালে এসে তা দাঁড়ায় প্রায় এক কোটিতে। আফগানিস্তান ও ইথিওপিয়ার যুদ্ধ ১৯৯০ সালে এ সংখ্যাকে নিয়ে যায় প্রায় দুই কোটিতে। পরবর্তী দুই দশকে শরণার্থীর সংখ্যা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান, ২০০৩ সালে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীর ইরাক অভিযান এবং দক্ষিণ সুদান ও সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের ফলে শরণার্থীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। ২০১০ সালে বিশ্বে উদ্বাস্তু/শরণার্থী সংখ্যা দাঁড়ায় চার কোটি ৩৭ লাখে; ২০২৫-এর এপ্রিল নাগাদ তা ১২ কোটি ২১ লাখে পৌঁছে। 

এর মাঝে ইউএনএইচসিআর নিবন্ধিত শরণার্থীর সংখ্যা চার কোটি ২৭ লাখ, বাকি প্রায় আট কোটি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত। এ ছাড়াও জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ নিবন্ধিত আরও প্রায় ৬০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। এই সাধারণ পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, জাতিসংঘের আপ্রাণ প্রচেষ্টার পরও বিশ্বের শরণার্থী গ্রাফ কেবলই ঊর্ধ্বমুখী।

৩. 
বিশ্বজুড়ে শরণার্থী বা বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সে তুলনায় প্রত্যাবাসিত শরণার্থীর সংখ্যা নগণ্য। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার হিসাবমতে, ২০১০ থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে প্রায় ৭০ লাখ বাস্তুচ্যুত কিংবা শরণার্থী মানুষ নিজ আবাসে ফিরে গেছে। যদিও গত তিন বছরে এই প্রত্যাবাসনের হার গতি পেয়েছে, আন্তঃরাষ্ট্রীয় শরণার্থীর বেলায় তা শ্লথ। আফগান গৃহযুদ্ধের খেলা শেষ হয়েছে সেই কবে! এখনও প্রায় ৩৫ লাখ আফগান শরণার্থী পাকিস্তানে এবং ৩০ লাখ ইরানে বসবাস করছে। দক্ষিণ সুদানেরও প্রায় ২৩ লাখ মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় রয়েছে। প্রায় ২৪ লাখ সিরীয় শরণার্থী রয়েছে একমাত্র তুরস্কেই। আর ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। সেই ১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনের লাখ লাখ মানুষ গাজা, পশ্চিম তীর, জর্ডান, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ৫৮টি ক্যাম্পে বসবাস করছে, যাদের বর্তমান সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ।
এদিকে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে ৪৪ লাখ নাগরিক রাষ্ট্রবিহীন অবস্থায় আছে। তাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা, কুর্দি, ফিলিস্তিন জাতিগোষ্ঠীর। রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি এ মুহূর্তে অবস্থান করছে বাংলাদেশে। এদের প্রায় সবাই রোহিঙ্গা, যাদের জন্মভূমি মিয়ানমার তাদের নাগরিক হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় না।

৪. 
শরণার্থী সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটির প্রস্তাবকে সরলরৈখিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ রোহিঙ্গা সংকট নিছক শরণার্থী ইস্যু নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত সমীকরণ, যা বিদ্যমান সমস্যাকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে। অনেকের ধারণা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপকূলীয় এলাকায় রয়েছে হাইড্রোকার্বনের বিপুল রিজার্ভ। এ ছাড়াও বাংলাদেশ-মিয়ানমার উপকূলীয় অঞ্চল বরাবর গভীর সমুদ্রে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুত। প্রাকৃতিক সম্পদের এই বিশাল উপস্থিতির কারণেই গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে পরাশক্তিগুলোর দৃষ্টি এ অঞ্চলের দিকে। 
যতটুকু জানা যায়, ইতোমধ্যে মিয়ানমারে গ্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করে সেই গ্যাস কুনমিংয়ে নিচ্ছে প্রতিবেশী চীন। উপরন্তু রাখাইন রাজ্যের কাইয়াকুক পিউইয়ে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। অপর প্রতিবেশী ভারতও বড় ধরনের বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে। এসব কারণে অন্যান্য বিষয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীন ও ভারত মিয়ানমারের পাশেই থাকছে। এ ছাড়াও আছে সামরিক কৌশলগত ভাবনা। যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগে থেকেই এ অঞ্চলে নৌঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই চীন তার ঘরের কাছে সেটা হতে দেবে না।

৫. 
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটির প্রস্তাব খুব আশাজাগানিয়া– এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। উল্লেখ্য, সি-৩ প্রস্তাবের আগে এ বছরেরই ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদরদপ্তরে রোহিঙ্গাবিষয়ক সম্মেলনে চীন, ভারত ও রাশিয়া যোগদানে বিরত থেকেছে। এই বিরত থাকার অর্থ মিয়ানমারের প্রতি সমর্থন; মিয়ানমার নিজেও এতে অংশ নেয়নি। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, চীন ও ভারতকে দূরে রেখে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সুদূরপরাহত। বিশেষত রাশিয়া ও চীনের মতো দুটো ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রকে বাইরে রেখে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমর্থন গ্রাউন্ড রিয়েলিটি পরিবর্তন করবে না। এই বাস্তবতা জাতিসংঘ অবশ্যই বোঝে; আমাদের কর্তাব্যক্তিরা কতটা বোঝেন, জানি না। এই বাস্তবতায় জাতিসংঘ তৃতীয় কমিটির প্রস্তাবে মুখরক্ষা হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কতটুকু সফলতা বয়ে আনবে, দেখার বিষয়।

মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক;
সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা

আরও পড়ুন

×