ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভারতে সংসদীয় অচলাবস্থার বিপদ

ভারতে সংসদীয় অচলাবস্থার বিপদ
×

শশী থারুর

শশী থারুর

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের পার্লামেন্টের আরেকটি অধিবেশন শুরু হয়েছে। সেই পুরোনো চিত্র ও অচলাবস্থা। ভোটার তালিকা নিয়ে পর্যালোচনা না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী দল অধিবেশন চালাতে দিতে নারাজ। আর যেভাবেই হোক সে আলোচনা এড়াতে চায় সরকার। ফলে লোকসভায় প্রথম দুই দিনই নষ্ট হয়েছে; পরে একটি আপসের মাধ্যমে অচলাবস্থা কিছুটা কেটেছে। এটি প্রথমবার নয়; এই জাতীয় অচলাবস্থা বারবার দেশের সর্বোচ্চ আলোচনার মঞ্চকে সংকটে ফেলছে। ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হয়।

এই অচলাবস্থা প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। উভয় পক্ষই তাদের আচরণের পক্ষে অতীতের দৃষ্টান্ত টেনে আনছে। ইউপিএ (কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকার) শাসনের দশকে বিজেপি প্রায় অনায়াসে সংসদ অচল করেছিল; ১৫তম লোকসভার ৬৮ শতাংশ সময়ই নষ্ট হয় বিক্ষোভে। এখন বিরোধী দলে থাকা ‘ইন্ডিয়া’ জোট একই পন্থা অবলম্বন করছে। তারা বলছে, সরকার যখন পরামর্শ বা বিতর্কে রাজি নয়, তখন বাধা দেওয়া ন্যায়সংগত। মিশনারি স্কুলে শেখানো গোল্ডেন রুল– ‘অন্য থেকে তুমি যে আচরণ প্রত্যাশা কর, তুমিও তেমন আচরণ কর।’ ভারতের রাজনীতিতে তা বদলে হয়েছে, ‘তারা তোমার সঙ্গে যা করেছিল, তুমিও তাদের সঙ্গে তা-ই কর।’

ইট মারলে পাটকেল খেতে হবে– এটাই এখন প্রতিষ্ঠিত। কে কোথায় বসে, তার ওপর নির্ভর করে তার অবস্থান কী হবে। যারা এক সময় সংসদ অচল করত, তারা এখন নিজেদের উপস্থাপন করছে সংসদীয় শালীনতার রক্ষক হিসেবে। আর যারা এখন বিশৃঙ্খলার পথ নিয়েছে, তারাই হয়তো ক্ষমতায় গেলে সৌজন্যের কথা বলবে। এভাবেই হোঁচট খেতে খেতে পার্লামেন্ট অগ্রসর হয়। ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তার কার্যকর আলোচনার শক্তি।

রাজনীতিতে আসার আগেই আমি এ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি যখন তৎকালীন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় আমাকে এবং নারায়ণ মূর্তি, শ্যাম বেনেগালসহ বিশিষ্ট কয়েকজনকে একটি গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে সংসদের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। আমরা সবাই সংসদে বিতর্ক ও শালীনতা রক্ষায় কঠোর নিয়ম প্রয়োগের পক্ষে মত দিয়েছিলাম। কিন্তু স্পিকার সোমনাথ আমাদের এ বিভ্রমের জন্য বকা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, বিরোধী দল সংসদে বাধা দেওয়াকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার মনে করে। নিয়মের দোহাই দিয়ে তা বন্ধ করার চেষ্টা করলে তাকে সব দল– এমনকি তৎকালীন শাসক কংগ্রেসও অগণতান্ত্রিক বলে নিন্দা করতে হবে। এমপিদের বহিষ্কার রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া কার্যকর নয়।

তাঁর উত্তরসূরি মীরা কুমার আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। তাঁর ভদ্রতা ও শালীনতার নিয়মিত অপব্যবহার করেছে বিজেপি। কিন্তু তিনিও সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন– সব দলের সম্মতি ছাড়া বিশৃঙ্খল সদস্যদের বহিষ্কার অনুচিত। ফলে সংসদীয় বিশৃঙ্খলা এখন সংসদের ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্র্যাজেডি হলো, এই সংকটের জন্য উভয় পক্ষই দায়ী। বিজেপি সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসার বদলে একতরফা আইন পাস করিয়ে নিতে চায়। পার্লামেন্টকে তারা ঘোষণার নোটিশ বোর্ড হিসেবে দেখছে, যেখানে গৃহীত সিদ্ধান্ত বিনাবাক্যে পাস করানো হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পার্লামেন্টে তাঁর উপস্থিতি বিষয়ে একেবারে উদাসীন। যেখানে জওহরলাল নেহরু প্রতিদিন সংসদে উপস্থিত থাকতেন, সেখানে মোদি খুব কমই উপস্থিত থাকেন। শাসক দল পার্লামেন্টকে এক প্রয়োজনীয় ঝামেলা বলে মনে করে– সরকার গঠন ও আইন পাসের জন্য দরকারি, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা ভিন্নমত শোনার ক্ষেত্রে অপ্রস্তুত।
বিরোধী দলও দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। পার্লামেন্টে বিতর্কের মাধ্যমে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার পরিবর্তে তারা বিশৃঙ্খলার পথ বেছে নিয়েছে। ফলে তারা নিজেরাই সংসদের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা হারিয়ে ফেলছে। মন্ত্রীদের জবাবদিহি করার জন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব, বাধাহীনভাবে জরুরি ইস্যু তোলার জন্য জিরো আওয়ার বা রুল ৩৭৭, এমনকি বিল নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তারা গ্রহণ করছে না। সরকার তবুও আওয়াজের মধ্যে আইন পাস করিয়ে নেয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বরং বিরোধী দল।

ভারত আরও ভালো কিছু প্রত্যাশা করে। ভারতীয় নাগরিকদের এমন একটি পার্লামেন্ট দরকার, যা তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। তাদের উদ্বেগ আমলে নেয় এবং প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে। আমাদের গণতন্ত্রের এমন একটি আইনসভা প্রত্যাশিত, যা ব্যক্তিগত ইগো প্রদর্শনের মঞ্চ নয়; বরং আইডিয়া নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র। পার্লামেন্টের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সময় এখনই।

শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

 

আরও পড়ুন

×