ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

সেক্যুলার জাতিবাদ যেমন ফ্যাসিবাদ, তেমনি ধর্মীয় জাতিবাদও ফ্যাসিবাদ

সেক্যুলার জাতিবাদ যেমন ফ্যাসিবাদ, তেমনি ধর্মীয় জাতিবাদও ফ্যাসিবাদ
×

ফরহাদ মজহার

ফরহাদ মজহার

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৯ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক এবং দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা’ (উবিনীগ) এবং নয়াকৃষি আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সম্পাদনা করছেন সাপ্তাহিক ‘চিন্তা’। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঔষধশাস্ত্রে স্নাতক এবং পরে অর্থশাস্ত্র পড়েন যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চ’-এ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’, ‘মোকাবিলা’, ‘এবাদতনামা’, ‘সাম্রাজ্যবাদ’, ‘মার্ক্স, ফুকো ও রুহানিয়াত’, ‘ক্ষমতার বিকার’ ইত্যাদি। ফরহাদ মজহারের জন্ম ১৯৪৭ সালে নোয়াখালীতে। এই সাক্ষাৎকারের প্রথম অংশ আজ প্রকাশ হচ্ছে; রোববার প্রকাশিত হবে দ্বিতীয় অংশ। সমকালের পক্ষে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহসম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম

 

সমকাল: বাউলের ওপর আক্রমণ নিয়ে সমাজ এখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেন?

ফরহাদ মজহার: এটা ভালো। মেরূকরণটা সমাজের জন্য সমস্যা নয়। মেরূকরণের ফলে সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বটা সামনে আসে। আমাদের দেশে যে লুটেরা মাফিয়া শ্রেণি গড়ে উঠেছে; সমাজ যাদের কাছে অপরকে শোষণের জায়গা; রাষ্ট্র যাদের কাছে বৃহৎ বৃহৎ প্রকল্পের মাধ্যমে লুটপাটের ক্ষেত্র, তাদের প্রধান মতাদর্শ এটা প্রমাণ করা– সমাজের গরিব ও সর্বহারা শ্রেণির সকল ইহলৌকিক দুর্দশা, শোষণ ও জুলুমের জন্য লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণির লুটপাট, নিপীড়ন ও শোষণ দায়ী নয়। দায়ী গরিব ও মজলুম নিজে। কেন? কারণ সে নামাজ-কালাম ঠিকমতো পড়ে না; এবাদত-বন্দেগি করে না; শরিয়া ঠিকমতো পালন করে না ইত্যাদি। এর ফলে ইহলৌকিক লড়াই-সংগ্রাম থেকে গরিব ও মজলুমকে অনায়াসে পরকালমুখী করা সহজ হয়েছে। ভয়ংকর বাস্তবতা হচ্ছে, এক দল পরকাল ব্যবসায়ী গড়ে উঠেছে, যারা জান্নাতের টিকিট বিক্রি করতে পারছে। স্বয়ং বলে দিচ্ছে– কে দোজখে যাবে, আগুনে পুড়বে। গরিব, মজলুম শ্রেণির নিত্যদিন শোষিত হওয়ার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে ভোঁতা করবার জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে তার অস্তিত্বের প্রধান অনুভূতি হিসেবে হাজির করা হয়েছে। এর ফলে ইসলামের সমাজ গঠনের ধারণা, ইনসাফের ধারণা এবং জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই করার আদর্শ ক্ষয়ে গিয়েছে। কে কাফের, কে মুরতাদ, কে হত্যাযোগ্য, তার ফতোয়া দেওয়াই প্রধান হয়ে উঠেছে। 

সমকাল: এর সঙ্গে বাউলদের ওপর হামলার সম্পর্ক কী?

ফরহাদ মজহার: কারণ লড়াইটা মোটেও বাউল বনাম ইসলাম না। কারণ ‘বাউল’ নামক একাট্টা কিছু নেই। সমাজের বিভিন্ন রুহানি বা দার্শনিক ধারা বিভিন্নভাবে ধর্ম বা ইসলাম ব্যাখ্যা ও বোঝার চেষ্টা করে; কেউ ফকির, কেউ দরবেশ, কেউ সুফি, চিশতিয়া, ভান্ডারি, সাধু, সন্ত ইত্যাদি। সেই সকল ধারা বা স্রোত পরস্পরের অবস্থান বোঝার জন্য আলাপ-আলোচনা তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদি করে। এটা আমাদের দেশের দীর্ঘ ঐতিহ্য। আমাদের সংস্কৃতির অত্যন্ত ইতিবাচক ধারা। এটাই ফকির, দরবেশ, সাধু-সন্তদের গান, পালা, কবির লড়াই ইত্যাদি ফর্মে শতাব্দীর পর শতাব্দী আমাদের সমাজে চলে আসছে। ধর্মতত্ত্বের এই পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সমাজে ধর্মতত্ত্বের অন্তর্গত দর্শন, চিন্তা বা প্রজ্ঞার মর্মশাঁসটা সাধারণ মানুষ সহজভাবে উপলব্ধি বা অনুধাবন করতে পারে। সাধারণত এই চর্চা ঘটে শ্রুতি ও কণ্ঠের পরিসরে; ছাপাখানার বই বা তথাকথিত বইপড়ুয়াদের জগতে বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে না। স্বভাবতই সেখানে তাই গান, পালা, অভিনয় ইত্যাদি প্রধান ভূমিকা রাখে। এর মধ্য দিয়েই সমাজে চিন্তা ও প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটে।

সমকাল: আমাদের বোঝার সুবিধার্থে উদাহরণ দিতে পারেন?

ফরহাদ মজহার: ধরুন ফকির লালন শাহ। তাঁর কালাম খুবই শক্তিশালী দার্শনিক ধারা। কিন্তু খেয়াল করুন, তিনি নিজেকে কখনও ‘বাউল’ বলেননি। ‘ফকির’ বলেছেন। নিজেকে ‘ফকির’ বলার মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামের রুহানি বৃত্তের মধ্যে থেকেই সাধনা করেছেন। অন্যদিকে নিজেকে কখনোই ইসলামের নতুন ব্যাখ্যার প্রবক্তা দাবি করেননি। তাই লালনের ইসলাম বা ‘নদীয়ার ইসলাম’ নামে কিছু নেই। কিন্তু আমরা এখন দেখি, তিনি যেভাবে মানুষকে নিজ নিজ আত্মিক বিকাশের দিকে আহ্বান করেছেন, তার প্রতি লাখ লাখ মানুষ বিপুলভাবে আকৃষ্ট। অর্থাৎ সমাজের আত্মিক বা রুহানি ক্ষুধা আছে প্রবল। সেই ক্ষুধা এই সাধকরাই মেটাচ্ছেন। বাউলরা তাদের গানই পরিবেশন করেন কিংবা নিজেরা লেখেন। এই দিকগুলো না বুঝলে এখনকার তথাকথিত ‘বাউল’ নিয়ে বিতর্ক আমরা বুঝব না। পাশাপাশি এটা বুঝতে হবে বাউলরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সবচেয়ে নিগৃহীত। নিগৃহীত জনগণের মধ্যেই তারা ধর্মতত্ত্বের প্রশ্নকে দর্শনের এবং সামাজিক-রাজনৈতিক তর্কের রূপে হাজির করেন। যেমন  জীব-পরমের পালাটা তাই বাংলার ভাবসাধনা বা দর্শনের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পালা। পালা, কবিয়াল গান বা কাটান গান আমাদের সাংস্কৃতিক ফর্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। পালার মধ্যেই নাটকীয়তার জন্য তারা বিভিন্ন ‘স্ল্যাং’ বা লৌকিক সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহার করে। আমাদের সাধারণ মানুষরা স্ল্যাং ব্যবহার করে না– তা তো না।

সমকাল: প্রশ্ন উঠেছে খোদা বা ধর্মের অবমাননা নিয়ে।

ফরহাদ মজহার: একটা সহজ কথা বলা যাক। সাধারণ মানুষের অনেকে অনেক সময় আক্ষেপ থেকে নিজের দুর্দশা বা হয়রানির জন্য আল্লাহকে দোষারোপ করেন। আল্লাহ কি তখন তার খাদ্য, পানি বন্ধ করে দেন? আর আল্লাহ কী বিচার করবেন, সেটা কি আপনি জানেন? কে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ভক্ত কিংবা বৈরী– সেটা তো আল্লাহই ভালো জানেন। আপনি যখন নিজেই এখানে বিচার করে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছেন, কাউকে পেটাচ্ছেন, কাউকে লাথি মারছেন, পানিতে ফেলে দিচ্ছেন, তখন এই জালিমদের অবস্থান তো ইসলামের মধ্যে থাকে না। তারা তো ইসলামবিরোধী কাজ করছেন। নিজেই বিচারকর্তা হয়ে অপরকে দমন করছেন; ধর্মের নামে শাস্তি দিচ্ছেন! 

সমকাল: বাউলদের ওপর চলা সাম্প্রতিক সহিংসতা কি ঠেকানো যেত না? 

ফরহাদ মজহার: কোরআনের যে কোনো কিছু শুরু করার আগে আমরা বলি, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এর অর্থ, তিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু। বান্দার ঠাট্টা-কৌতুক নিয়ে দয়ালু কি শাস্তি দিতে পারেন? এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যদি আবুল সরকার একটা শব্দ ব্যবহার করেন এবং কারও মনে কষ্ট হয়, হতে পারে। যারা পালা সম্পর্কে জানেন না তাদের কষ্ট লাগতেই পারে। তাদের কষ্টে আমারও কষ্ট লেগেছে, খারাপ লেগেছে। সে ধরনের শব্দটা ব্যবহার করা ঠিক নয়। তাহলে পালাকার ক্ষমা চাইবেন; আমরা সকলেই না হয় ক্ষমা চাইব। কিন্তু পালাগান মানে নিছকই অভিনয়– এইটুকু তো বোঝার ক্ষমতা আমাদের থাকতে হবে। আমাদের ইমান কি এতই ঠুনকো যে, একটা শব্দে ভেঙে খান খান হয়ে যাবে?

সমকাল: বিপুলসংখ্যক মানুষ কিন্তু প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।

ফরহাদ মজহার: ভিডিওটির কেবল একটি ছোট্ট ক্লিপ দেখে আমরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি, সেটা কতটা যুক্তিযুক্ত? এর সঙ্গে আরও চার ঘণ্টার ভিডিও রয়েছে। তার মধ্যে তো আল্লাহর প্রেমের কথা ছিল। তা ছাড়া এটা ছিল জীব ও পরমের মধ্যকার একটা নাটক বা অভিনয়। যদি মনে হয়– একটি শব্দ আপনার মনে আঘাত দিয়েছে, আপনি তাঁকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিতেন। তাহলে তারা সবার পক্ষ থেকে বিষয়টা তুলে নিত। মীমাংসা হতো। কিন্তু তার জন্য কি আপনি তাদের পাছায় লাথি মারবেন? পানিতে ফেলে দেবেন? তাদের কল্লা চাই, তাদের জবাই করতে হবে? এটা করার অধিকার কি আপনার আছে? এ ক্ষেত্রে কারা ইসলামবিরোধী লোক? যে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। আল্লাহ কি তাদেরকে বিচার করার দায়িত্ব দিয়েছেন?

সমকাল: তাহলে আপনার আপত্তিটা কোথায়?

ফরহাদ মজহার: আল্লাহ যদি কাউকে বিচার করার দায়িত্ব না দিয়ে থাকেন; তাহলে আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা গেলে যারা বাউলদের ওপর হামলা করছে; তাদের কল্লা চাইছে, তাদেরও কেন গ্রেপ্তার করা যাবে না? এটাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আমার সরাসরি প্রশ্ন। আইনের প্রয়োগ কি কেবল বিশেষ মহলের জন্য? কেন আবুল সরকারকে আটক করেছেন? কারণ আগামী দিনে নির্বাচন আছে। কেন এ ব্যাপারে অন্যরা চুপ করে আছে? কারণ, যেহেতু তারা মনে করে, এ বিষয়ে কথা বলা বিপজ্জনক এবং বললে ভোট হারানোর আশঙ্কা থাকে। সমাজে এ ধরনের কন্ট্রাডিকশন স্পষ্ট হচ্ছে। যে কারণে আপনার প্রথম প্রশ্নের জবাবে বলেছি, এ দ্বন্দ্বটা ভালো। এভাবে আমরা সমাজটাকে চিনছি। সমাজে একটা শ্রেণি ধনী, যারা গরিবের জন্য খাবারের কথা বলবে না; শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের কথা বলবে না; ইহলৌকিক কোনো সমস্যা সমাধানের কথা তারা বলবে না। তারা ধর্মের কথা বলবে; তারা ধর্ম নিজের হাতে রেখে দিতে চায়; নিজে বান্দা হয়ে আরেক বান্দাকে শাস্তি দিতে চায়। আল্লাহ আপনাকে মাফ করেন, কিন্তু ওরা মাফ করে না। এটাকে কী বলে? 

সমকাল: বাউলদের রাজনৈতিক মতাদর্শের কথাও উঠছে।

ফরহাদ মজহার: কথাটা উল্টোভাবেও বলা যায়– রাজনৈতিক দলগুলোও বাউলদের ওপর ভর করে। এটা সত্য, আবুল সরকারসহ অধিকাংশ বাউলই কমবেশি আওয়ামী লীগপন্থি। কারণ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী সবসময়ই বাউলদের বিরোধিতা করেছে। যতদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল ততদিন তারা বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। এমনকি আবুল সরকারের এমন প্রমাণও আমাকে একজন দিয়েছেন, যেখানে তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষ হয়ে নৌকার জন্য ডাক দিচ্ছিলেন। কিন্তু চলমান বিষয়টা আবুল সরকার নয়। বাউলরা কেন এটা করেছে? কারণ, যেভাবে ধর্মতত্ত্বের ভেতরে– বাংলাদেশের বিশেষ বাস্তব ও ঐতিহাসিকতার পরিস্থিতির মধ্যে– তারা যেভাবে পাশ্চাত্য সেক্যুলারিজম ও ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলা করছে, এখনকার সেক্যুলারদের কাছে তার স্বীকৃতি নাই। কারণ বাউলরা চিন্তাচেতনার দিক থেকে ধর্মপ্রাণ। বলতে পারেন তারা সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্ম এই বিকৃত বাইনারির অসুখে ভোগে না। ধর্মনিরপেক্ষরা রবীন্দ্রসংগীত গায়, সুন্দর সংস্কৃতিচর্চা করে। আবার জনপ্রিয়তার লোভে যখন লালনের গান গায় তখন ব্যান্ড বাজিয়ে গান করে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু ধর্ম বা ধর্মতত্ত্ব হিসেবে নয়, বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক ও চেতনাগত গণপরিসরে ইসলাম হাজির আছে। ইসলাম শুধু ধর্ম মাত্র নয়; আমাদের দার্শনিক ভাবনা, প্রজ্ঞা, রাজনীতি ও সংস্কৃতির অংশ। আমরা এর বাইরে না। তাই আবুল সরকাররা ইসলামকে আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাবুকতা ও সংস্কৃতির অংশ করে তোলার জন্য অনেক প্রশ্ন তোলেন, যাতে ধর্মের অন্তর্গত যেসব দার্শনিক প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলো আমরা ধরতে পারি, বুঝতে পারি। ধর্মের জিজ্ঞাসাকে ভাব বা দর্শনের জিজ্ঞাসার অন্তর্গত করে হাজির করেন। 

সমকাল: সম্প্রতি আপনি বলেছেন, সেক্যুলার জাতিবাদের বিপরীতে গণঅভ্যুত্থানের পর ধর্মীয় জাতিবাদ শক্তিশালী হয়েছে।

ফরহাদ মজহার: সেক্যুলার জাতিবাদের বিপরীত হলো ধর্মীয় জাতিবাদ। এটা ধর্মীয় জাতিবাদ রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে নেই, যেমন ছিল সেক্যুলার জাতিবাদ। কিন্তু জাতিবাদের যুগে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে প্রবলভাবেই হাজির ছিল। নইলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরে জামায়াতে ইসলামী বা জাতিবাদী ইসলামী রাজনীতি ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠল কীভাবে? সেক্যুলার জাতিবাদ যেমন ফ্যাসিবাদ, তেমনি ধর্মীয় জাতিবাদও ফ্যাসিবাদ। ধর্মীয় জাতিবাদকে মোকাবিলা করার জন্য আমাদের রণনীতি ও রণকৌশল লাগবে। ইসলামের ভাবগত দিক আত্মস্থ করতে হবে। ইসলাম কেবল ধর্ম নয়; দর্শনও। এটা রাজনীতি। তার যে দার্শনিক প্রস্তাবনা, সেই প্রস্তাবনা আপনার সংস্কৃতির মধ্যে আত্মস্থ করতে হবে। একই সঙ্গে তার আরব সংস্কৃতির বেদুইন বা ট্রাইবালিজম ও ফ্যাসিস্ট প্রবণতা বা টেনডেন্সিকে মোকাবিলা করতে হবে। আরব সংস্কৃতি মানে ইসলামী সংস্কৃতি নয়। ফলে যারা আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর জবরদস্তি চাপিয়ে দিতে চায়, তারা ফ্যাসিস্ট শক্তি। পেট্রোডলার এদের শক্তিশালী করেছে। আমরা ফ্যাসিস্ট টেনডেন্সি মোকাবিলা করেছি কীভাবে– ধর্ম ও সেক্যুলার এই বাইনারি থেকে মুক্ত হবার পথ আমাদের আবিষ্কার ও অনুসরণ করতে হবে। ধর্ম বনাম সেক্যুলার বাইনারিটাই বিষাক্তরূপে আবার হাজির হয়েছে। এই জন্য আমি বলি, বাউল ইস্যু আসলে বাউল বনাম ইসলাম নয়; বরং এটা দুধের সরের মতো। তা সমাজের আর্থসামাজিক, আত্মিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বটাই বাউল বনাম ইসলামের দ্বন্দ্ব হিসেবে হাজির হয়েছে। এই ব্যাপ্ত কিন্তু গভীর দ্বন্দ্ব মীমাংসার মধ্য দিয়ে আর্থসামাজিক, আত্মিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক দিশা আমাদের নির্ণয় করতে হবে। সেই নির্ণয়ের মূহূর্ত হাজির হয়েছে। বাংলাদেশে এর সমাধান করতেই হবে। মুসলমান হওয়া মানে কি হিংস্র ও প্রকাশ্যে অপরকে খুন করবার লিপ্সা প্রদর্শন করা? যদি না হয়, তাহলে এই প্রকার খুনি ও সন্ত্রাসীদের হাত থেকে ইসলামকে রক্ষা করা কর্তব্য হয়ে উঠেছে। এদের মোকাবিলা করতে হবে। ভালো হলো– এরা তাদের চেহারা জনগণকে দেখাচ্ছে।

সমকাল: আমাদের সমাজে এই আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণ কী?

ফরহাদ মজহার: আগে যাত্রাপালাটা ছিল। এটা তো আমাদের একটা কালচারাল ফর্ম। তার মানে, ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট যারা, তারা কালচারাল ফর্মটাকে ধ্বংস করতে চায়। তারা এখানে বাইরে থেকে একটা ট্রাইবাল বা গোত্রবাদী সংস্কৃতি আমদানি করতে চায়। যেমন সৌদি সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতি সম্বন্ধে তারা কিছুই জানে না। অথচ দেখুন মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ রাজতান্ত্রিক। ইসলামে রাজতন্ত্র নেই, জাতিবাদ নেই। এটাকে তারা চাপিয়ে দিতে চায়। এটা তো হতে পারে না। বাঙালি জাতিবাদকে যখন আপনি মোকাবিলা করছেন, তখন ইসলামকে আপনি অন্তর্গত করছেন না। অথবা ইসলামের মধ্যে আপনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অন্তর্গত করছেন না। ফলে ধর্মীয় উগ্রতা ও ধর্মীয় জাতিবাদ শক্তিশালী হয়েছে। যেই দিক থেকেই দেখুন না কেন, যখনই এটা হবে না তখনই সংকট প্রকট আকারে হাজির হবে। 

সমকাল: এমন সংকটের সময় সরকার কী করছে?

ফরহাদ মজহার: এই সমস্যা সমাধানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন আমাদের বন্ধু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। আমাদের সবারই সমালোচনা করুন, অসুবিধা নাই। ফারুকীরও করুন। কিন্তু ফারুকী চৈত্রসংক্রান্তি, নববর্ষ থেকে শুরু করে জাতীয়ভাবে লালন দিবস পালন করবার মধ্য দিয়ে আমাদের সংস্কৃতির বৃহত্তর পরিমণ্ডলে ইসলামকে অন্তর্গত করার যে রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা শক্তিশালী ও দৃশ্যমান করেছেন, তা বেশ আগ্রহোদ্দীপক। চৈত্রসংক্রান্তিতে সবাই একত্র হচ্ছে। এরপর ফকির লালনের তিরোধান দিবসকে জাতীয় দিবস আকারে হাজির করা হয়েছে। এসবই বিরাট অর্জন। এই অর্জন নস্যাৎ করার জন্য এই ধর্মবাদী ফ্যাসিস্টদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সমকাল: এ ধরনের ঘটনায় কি রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে? 

ফরহাদ মজহার: বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হলে কারা বেশি উপকৃত হবে? এই সরকার এমনিতেই দুর্বল। এই মুহূর্তে যদি সরকার পড়ে যায়, তাহলে কারা ক্ষমতায় আসবে? আওয়ামী লীগ আসবে। ফলে নিশ্চিতভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে দুই দিকেই কাজ হচ্ছে। একবার ইসলামের নামে হচ্ছে, আরেকবার সেক্যুলারিজমের নামে হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার উচিত ছিল অযথা মামলা না নেওয়া। বিষয়টা তো স্রেফ পুলিশ, আইন-আদালতের ব্যাপার নয়। আরও গভীর সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আওয়ামী পুনর্বাসনের রাজনীতিও তৎপর। যদি আইনের কথাই বলেন, তাহলে প্রকাশ্যে খুনের হুমকি যে বা যারা দিচ্ছে, তার বিরুদ্ধে মামলা হলো না কেন?

 

আরও পড়ুন

×