বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং: যেতে হবে অনেক দূর
মাহবুবুর রাজ্জাক
মাহবুবুর রাজ্জাক
প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৯ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিউ এস অথবা টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাঙ্কিং নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। পরিকল্পনা মাফিক পদ্ধতিগতভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলে র্যাঙ্কিং ভালো করা সম্ভব। সম্প্রতি কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা করে দেখিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম দিকে থাকার বিষয়টি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। কিছু নির্দিষ্ট সূচক পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে র্যাঙ্ক নির্ধারণ করা হয়। সেই সূচকগুলোতে উন্নতি করলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ধীরে ধীরে উন্নত হয়। র্যাঙ্কিং নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচকটি হলো গবেষণা। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান কেমন–তা উচ্চমানের জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ও মান দিয়ে পরিমাপ করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত মানসম্পন্ন গবেষণাকর্ম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি না করলে ভালো মানের গবেষণাপত্র তৈরি হবে না। এ জন্য ভালো মানের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারের সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাড়াতে হবে। স্নাতকোত্তর পর্যায়, অর্থাৎ মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রাম শক্তিশালী করতে হবে।
আমাদের দেশে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা যতটুকু আছে, তার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। অনেক ক্ষেত্রে এ পড়াশোনা নামকাওয়াস্তেও বলা যায়। গবেষণার নামে অন্যের গবেষণা নকল করে কাগুজে ডিগ্রি পাওয়াও এখানে বিচিত্র নয়। প্রকৃত গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এর মূল কারণ হলো, চাকরিতে উচ্চতর ডিগ্রির যথাযথ মূল্যায়নের ব্যবস্থা নেই। আমাদের দেশে করপোরেট সেক্টরের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংযোগ নেই বললেই চলে। ঠিক তেমনি প্রতিরক্ষা খাতের গবেষণার টাকাও বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে না। অথচ উন্নত বিশ্বে এ দুটি খাত থেকেই গবেষণার সিংহভাগ টাকা আসে।
র্যাঙ্কিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের ধারাবাহিক মানোন্নয়নের ব্যবস্থা করা; পিএইচডিসহ উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষকের হার বাড়ানো এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কমিয়ে আনা; বিদেশি এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক নিয়োগ। আমাদের দেশে সাধারণত মাস্টার্স পাস করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া যায়। মাস্টার্সের ফল ও শিক্ষক নিয়োগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের বেতন কাঠামো যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের মাসিক আয়ের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তাই এদের মধ্যে যারা উচ্চতর ডিগ্রি নিতে বিদেশে যান, তাদের দেশে ফিরে আসার হার কম। চাকরি কাঠামোতে বিদেশি শিক্ষক নিয়োগের কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি বিদেশি শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় ফেলোশিপের ব্যবস্থাও নেই।
র্যাঙ্কিংয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি শিক্ষকের মতো বিদেশি শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতেও আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। একসময় নেপাল, ভুটান, ইরান, ফিলিস্তিন, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করতে আসত। বর্তমানে এই সংখ্যা অনেক কমে গেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমে কোনো প্রোগ্রাম না থাকায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। র্যাঙ্কিং বাড়াতে চাইলে বিদেশি ছাত্র আকৃষ্টের জন্য আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ ডিগ্রি দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ক্লাস পরীক্ষা সময়মতো অনুষ্ঠানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতা। শিক্ষা কার্যক্রম রুটিন মাফিক না চালাতে পারলে বিদেশি ছাত্র আকৃষ্ট ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সুনাম হলো র্যাঙ্কিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শ্রমবাজারে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের চাহিদা বেশি, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং তত ভালো। কাজেই একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে শক্তিশালী ক্যারিয়ার সার্ভিস সেন্টার থাকা উচিত; যারা শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ ও বিভিন্ন স্কিলবেজড ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করবে। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সংযোগ রক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ে সহায়তা করবে। অ্যালামনাই ডেটাবেজ সংরক্ষণ করবে। চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী একাডেমিক প্ল্যানিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে। বর্তমানে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে, তাদের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাথা ঘামায় না। এমনকি শ্রমবাজারে এই সার্টিফিকেটধারী স্নাতকদের চাহিদা আছে কিনা, সেটি নিয়েও চিন্তাভাবনা করে না।
আধুনিক ল্যাব, স্মার্ট ক্লাসরুম, শক্তিশালী আইটি সাপোর্ট, ডিজিটাল লাইব্রেরি, ডেটাবেজ অ্যাকসেস ইত্যাদি অবকাঠামোগত সুবিধাও র্যাঙ্কিংয়ের সময় বিবেচনা করা হয়। এই দিক দিয়ে খুব দ্রুত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন না হলেও একাডেমিক তথ্য সংগ্রহ ও ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম পরিচালনায় আমাদের প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতি আছে। র্যাঙ্কিং এজেন্সির চাহিদা অনুযায়ী তথ্যাদি নথিবদ্ধ রাখার অভ্যাস আমাদের নেই। শিক্ষক মূল্যায়ন, শিক্ষার্থী মূল্যায়ন, কারিকুলাম মূল্যায়ন ইত্যাদি সঠিকভাবে সম্পাদনে সংশ্লিষ্ট অনেকের অনীহা পরিলক্ষিত হয়। তাই প্রয়োজনীয় তথ্যাদি আমরা সময়মতো জমা দিতে পারি না বলে র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকি।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও ব্র্যান্ডিং কিউএস র্যাঙ্কিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কতটা পরিচিত এবং কতটা অবদান রাখতে পারছে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন, খ্যাতিমান গবেষক ও নোবেল বিজয়ীদের আমন্ত্রণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ডিং, মিডিয়ায় উপস্থিতি, সাবেক ছাত্রদের সাফল্য ইত্যাদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইমেজ তৈরিতে সহায়তা করে থাকে। মনে রাখতে হবে মেধাবী ছাত্র, মেধাবী শিক্ষক, ভালো পড়াশোনা আর ভালো গবেষণাই যথেষ্ট নয়; র্যাঙ্কিং নিয়ে উচ্চাশা থেকে থাকলে ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজের সাফল্য নিজেই জাহির করার পরিকল্পিত চেষ্টা অবশ্যই থাকতে হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছুটা চেষ্টা করছে, এটা বলা যায়; যার সুফলও আমরা দেখছি। আরও জোরালো প্রচেষ্টা প্রয়োজন, তাহলেই হয়তো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্মানজনক র্যাঙ্কিংয়ে পৌঁছতে পারবে।
ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক,
যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট
