অন্যদৃষ্টি
বাউলরা গান গাইবে না!
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৩৯
আবারও বাউলশিল্পীরা আক্রান্ত হলেন, সেই সঙ্গে পণ্ড হলো বাউল গানের আসর। এবারের স্থান শেরপুর সদর উপজেলার গনইভরুয়া গ্রাম। সমকালের খবর অনুসারে, স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্সচালক শামীম মিয়া গত বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর বাড়ির পাশে বার্ষিক বাউল গানের আয়োজন করেছিলেন। সে গানের আসর পণ্ড করে দিয়েছে কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক। এ সময় শিল্পীদের বাঁশিসহ সরঞ্জাম ভাঙচুর করেছে। হাত-পা ধরে শিল্পীরা কোনোমতে হারমোনিয়ামসহ গানের সরঞ্জাম রক্ষা করেন।
কারা এই উচ্ছৃঙ্খল যুবক– প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। তবে শেরপুরে এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। গত ১৭ অক্টোবর চরভাবনা গ্রামে গানের আসর বন্ধ করে দেয় ইত্তেফাকুল উলামা নামে একটি সংগঠনের লোকেরা। ফেরার পথে তারা প্রতিরোধের মুখে পড়েন। এতে তিন মুসল্লি আহত হন। পরে গ্রামবাসী প্রায় এক সপ্তাহ অবরুদ্ধ ছিলেন। আয়োজকরা ভবিষ্যতে গানের আসর বসাবেন না– এমন ওয়াদা করে রেহাই পান। অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানটি কারা পণ্ড করতে পারে, সে সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
কয়েক সপ্তাহ আগে খ্যাতনামা বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে তাঁর পুরোনো এক অনুষ্ঠানের সূত্র ধরে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে গ্রেপ্তার করা হয়। এর প্রতিবাদে তাঁর ভক্তরা যখন মানিকগঞ্জ আদালতপাড়ার কাছের সড়কে মানববন্ধন করতে যান, তখন তাদের ওপর হামলা চালায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। হামলাকারীদের অভিযোগ, বাউলশিল্পীরা তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেন। তাই তাদের কোথাও অনুষ্ঠান তো করতে দেবেনই না, এমনকি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করতে দেওয়া হবে না।
এ ঘটনা থেকেও বোঝা যায়, শেরপুরের একেবারে প্রান্তিক এলাকায় আলোচ্য বাউল গানের আসর কারা পণ্ড করে দিতে পারে।
এসব গানের আসর সাধারণত শীতকালে হয়। অগ্রহায়ণে নতুন ধান ওঠে। তখন প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক-ক্ষেতমজুরদের হাতে যেমন কিছু টাকা থাকে, তেমনি পেশাগত কাজও থাকে কম। বাউলশিল্পীরা সাধারণত গান করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে শীতকালটা শিল্পী ও শ্রোতা; উভয়ের জন্যই ভালো সময়। বলা যায়, এভাবে একের পর এক অনুষ্ঠান পণ্ড হলে একদিকে শিল্পীদের যেমন না খেয়ে থাকতে হবে; ভোক্তাদেরও বিনোদনের উপায় থাকবে না।
সবারই জানা, গ্রামের প্রান্তিক মানুষের একসময় পালাগান, জারি-সারি, যাত্রা ইত্যাদি ছিল প্রধান বিনোদন মাধ্যম। ইদানীং প্রযুক্তির কারণে শহুরে গানবাজনা গ্রামে ছড়িয়ে পড়লেও বেশির ভাগ প্রান্তিক মানুষ এখনও বাপ-দাদার বিনোদন মাধ্যমেই মজে থাকেন।
শহুরে যেসব গানবাজনা সাধারণত গ্রামে যায় সেগুলো নিয়ে খোদ শহরের রুচিশীল মানুষের মধ্যেই নানা প্রশ্ন আছে। আদিরস ও যৌন সুড়সুড়িরই কারবার সেখানে বেশি। ফলে প্রচলিত পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেসব বিনোদন বরং অস্বস্তিই বাড়িয়ে দেয় শ্রোতা-দর্শকদের মনে। আবহমান কাল থেকে চলে আসা গ্রামীণ সংস্কৃতি-বিনোদনেও আদিরস কম নয়। তবে সেখানে তা আসে গল্পচ্ছলে বা কাহিনির স্বার্থে; বর্তমান অসুস্থ গান-নৃত্যের মতো প্রধান বিষয় হিসেবে নয়। আর বাউল গান এসব থেকে পুরোপুরি মুক্ত। ফলে বাংলা লোকসংগীতের এ শক্তিশালী ধারাটি সুস্থ বিনোদনই জোগায়।
প্রসঙ্গত, অশ্লীলতার দোহাই দিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ আমলেই সারাদেশে যাত্রাপালা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাকি ছিল বাউল গানের আসর। এখন তাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে আলোচ্য ঘটনার দুই দিন পার হলেও অন্তত শনিবার রাত পর্যন্ত পুলিশ বা প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা জানান, বাউল গানের আসর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে– এমন কোনো অভিযোগ তিনি পাননি। পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি ব্যানারে অতিথি হিসেবে যাদের নাম ছিল, সমাজে তারা প্রভাবশালী হলেও অনুষ্ঠান রক্ষায় তারা কোনো ভূমিকা রাখেননি। এই পরিস্থিতিতে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা যে টিকতে পারে না– তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- বাউলশিল্পী
- অন্যদৃষ্টি
