ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ছায়ানটে ভাঙচুর

শিশুদের বিদ্যালয়টিও কেন অঙ্গার হলো

শিশুদের বিদ্যালয়টিও কেন অঙ্গার হলো
×

পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ে সেদিন ছিল শিশুদের মূল্যায়নপত্র দেওয়ার দিন। নতুন শ্রেণির স্বপ্নবিভোর নিয়ে দল বেঁধে শিশুরা এসেছিল। অংকুর, কিশলয়, মঞ্জরি শ্রেণির শিশুদের আঁকা-লেখা দেয়ালে সাজানো হয়েছিল। নালন্দায় শ্রেণিকাজে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ। রংতুলিতে আঁকা শিশুদেরই বানানো কাগজের খামে বিগত পরীক্ষার খাতা ও মূল্যায়নপত্র দেওয়া হয়েছিল। কেউ কেউ সেদিন আসতে পারেনি; তারা আর পরীক্ষার খাতা বা মূল্যায়নপত্র দেখতে পাবে না। দেয়ালে টানানো শিশুদের চিত্রকর্মগুলোও আর নেই। এক রাতের আগুনে সব অঙ্গার। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ভবনের সঙ্গে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনেও হামলা হয়। এই ছায়ানট ভবনেই দেশের এক শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়। 

নালন্দার সাবেক ও বর্তমান বহু শিক্ষার্থী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জানবাজি লড়েছিল। কেবল গণঅভ্যুত্থান নয়; প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার বহু আন্দোলনে এই বিদ্যালয়ের শিশুরা অগ্রণী। ঢাকার সাত মসজিদ সড়কে সিটি করপোরেশন হরেদরে দেশীয় গাছ কেটে ফেলছিল; সেই গাছ বাঁচানোর আন্দোলন নালন্দার শিশুরাও জীবন্ত রেখেছিল। শাসকের কোপ থেকে বেঁচে যাওয়া সাত মসজিদ সড়কের গাছগুলোতে শিশুদের সেই দ্রোহের উচ্চারণ পত্র-পল্লব হয়ে আছে। প্রকৃতিপাঠ ও প্রকৃতিমনস্কতা এই বিদ্যালয়ের অবিচ্ছেদ্য শিক্ষাবার্তা। শ্রেণিশিক্ষা কর্মসূচি শিশুদের মনে ফসল, বৃক্ষ, প্রাণী, নদী, দেশ ও মানুষের প্রতি মমতাময় ও দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে।

সকল জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, ভূগোল ও বর্গের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি বৈষম্যহীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে শিশুরা এখানে আনন্দের সঙ্গে সৃজনশীল চর্চা করে। এমন একটি বিদ্যালয় কেন ‘উগ্রবাদী’ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হলো? শরিফ ওসমান হাদিসহ জুলাই গণহত্যার ন্যায়বিচার যেমন জরুরি; অঙ্গার হওয়া বিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকা ভবনের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারও জরুরি। প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি শিশুদের মনে তৈরি হওয়া ক্ষত সারাতে তৎপর হবে? ছায়ানট ভবনে হামলার পর সংবাদমাধ্যম থেকে নাগরিক প্রতিক্রিয়া প্রথম দিকে বেমালুম বিস্মৃত হলো– এই ভবনে মূলত শিশুদের বিদ্যালয় আছে। প্রধান উপদেষ্টার আশ্বাস কিংবা সরকারি প্রেস নোটেও বিদ্যালয়ে হামলার বিষয়টি নিদারুণভাবে অনুপস্থিত। এমনকি শিক্ষা বা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টারা তৎক্ষণাৎ বিদ্যালয়ের শিশুদের পাশে দাঁড়ালেন না। বহু শিশুর মনে এই শিক্ষা উপদেষ্টারা কী বার্তা দিলেন? যদিও পরে শিক্ষা উপদেষ্টা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন। 

কেন স্কুলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হলো, শিশুদের বোঝার মতো কোনো ব্যাখ্যা কি শিক্ষা মন্ত্রণালয় দিতে পারবে? শিশুদের ভাষায় ও তাদের মতো করে বোঝার বিবরণ-বিশ্লেষণ? অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে অনেকেই দগ্ধ স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গেয়েছে। পথচারী, শ্রমজীবী কি পুলিশ বহুজন তখন শিশুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। সংস্কৃতি ও অধিকারকর্মী, নাগরিক সংগঠনের অনেকেই হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে ছায়ানটের সামনে প্রতিবাদ জানাতে শামিল হন। সংস্কৃতি উপদেষ্টা, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকসহ অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন পরিদর্শন করেন এবং ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেন। 

ছায়ানটের এক সংস্কৃতি-সমন্বিত সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে গড়ে ওঠা ‘নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়’ মূলত শিশুদের এক সামূহিক বিকাশ কেন্দ্র। বিভিন্ন দেশের প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি থেকে মানবিক, প্রকৃতিবান্ধব ও বৈজ্ঞানিক দিকগুলো পর্যালোচনা করে, বাংলাদেশ ও বিশ্বসংস্কৃতির অন্তরঙ্গ সম্মিলন ঘটিয়ে পাঠক্রম ও শিক্ষাপদ্ধতি নির্ধারণ ও অনুসরণের চেষ্টা চলে নালন্দায়। 
ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনের খোলামেলা স্থাপত্যটিতে মূলত দিনের আলো ব্যবহার করেই শ্রেণি কার্যক্রম হয়। শিশুদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং কার্বন-নিরপেক্ষ হতে শেখায়। ভবনটি ভরপুর ছিল শিশুদের সৃজনশীল সৃষ্টিকর্মে। পরীক্ষার খাতা, বাড়ির কাজের খাতা, চিত্রকর্ম, রচনা, দিনলিপি, সিলেবাস, পাঠ্যপুস্তক আর এক সুবিশাল পাঠাগার, অফিস কক্ষ, প্রক্ষালন কক্ষ, মিলনায়তন, খেলার জায়গা, মহড়া কক্ষ, খাবারের জায়গা ও বেশ কিছু গবেষণাগার। চুরমার হয়েছে বহু কিছু ১৮ ডিসেম্বর রাতের আগুনে। 

অনেকেই বলছেন, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, নালন্দা এবং পরে উদীচীতে হামলার কারণ আসন্ন সংসদ নির্বাচন বানচাল করা। কিন্তু শিশুদের এখনও নির্বাচনের বয়স হয়নি। তারা কেবল পাঠ্যপুস্তকে পড়েছে, ১৮ বছর বয়সের পর ভোট দেওয়া যায়। বুকের অতলে দারুণ গভীর ক্ষত নিয়ে এই শিশুরা নিশ্চয় একদিন ভোটদানের বয়সে পৌঁছবে। নিশ্চয় তাদের প্রিয় বিদ্যালয় ভাঙচুরের কথা তাদের মনে থাকবে।

মাত্র কিছুদিন বাদেই, জানুয়ারিতে শিশুদের নতুন ক্লাস শুরু হবে। সরকারি নতুন বই পৌঁছবে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। দগ্ধ ও লুট হওয়া শ্রেণিকক্ষেই শুরু হবে নালন্দার শিশুদের নতুন ভোর। হয়তো এই ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ হবে; ক্ষতিগ্রস্ত উপকরণের তালিকা তৈরি হবে। শিশুদের হারিয়ে যাওয়া অঙ্ক খাতা, হাতে লেখা মনীষীর জীবনী বা কোনো স্বপ্নময় গ্রামের ছবি কিংবা দেয়ালের কোণে লুকিয়ে রাখা কোনো আশ্চর্য স্মৃতি। এসব কি আবার কোনো দোকান থেকে কেনা কিংবা ফিরিয়ে আনা সম্ভব? 
আমরা বিশ্বাস করি, নালন্দা আগের মতোই প্রাণবন্ত ও সৃজনশীল হয়ে উঠবে। ক্ষতিগ্রস্ত সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সকলেই হামলা ও ক্ষয় সামলে আবারও অগ্রণী হয়ে উঠবে। পাঠ্য ও পত্রিকার ওপর এই নির্মম আক্রমণকে রাষ্ট্র কীভাবে পাঠ করবে এবং তৎপর হবে, তাও সর্বজনের আস্থার পরিসর নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক 
 

আরও পড়ুন

×