ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

নির্বাচন, রাজনীতি ও আদর্শহীনতা

নির্বাচন, রাজনীতি ও আদর্শহীনতা
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৬ | আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন ঘিরে অনেক কিছুই পরিষ্কার হচ্ছে। অন্তত সংঘাতের বিষয়টি দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। রক্তপাত, প্রাণহানি ঘটেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার প্রচলিত রাজনীতি সমাজকে অস্থির করে তুলছে এবং দিন দিন তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নামের যে বহুল প্রচারিত কথাটি আছে, তা জটিল হয়ে পড়ছে। সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে যে আশার আলো দেখা দিয়েছিল নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, এখন তা অনেকাংশেই  ফিকে হয়ে আসছে।

নৌকা এবং ধানের শীষ প্রতীকের মধ্যে লড়াই আগে ছিল; সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনের বাইরে। ফলে আগে প্রতিযোগিতা যতটুকু হতো, এবার তাও হবে কিনা– সন্দেহ গাঢ় হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে সবাই বলছেন, তারা প্রায় একই চিন্তা ও গোত্রভুক্ত। ইহজাগতিকতা তাদের কারও নীতি নয়; ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্য– এ কথা জোরগলায় ওই দলগুলোর নেতারা বলছেন। 

মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা হয়। ড. কামাল হোসেনদের রাজনৈতিক দল ছিল আওয়ামী লীগ, যে দল বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। অথচ তিনি পরে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা জিয়াউর রহমানের দল বিএনপির সঙ্গে মিশে গেলেন। আবার বদরুদ্দোজা চৌধুরীরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধারণ করে রাজনীতি করেছেন; পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছিলেন। কাদের সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি আর নৌকায় নেই; পৃথক দল গঠন করেছেন।

ড. কামালের দল এবারও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী শিবিরে। বামপন্থিদের কেউ কেউ সারাজীবন ইহজাগতিকতার কথা বলে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় এক পক্ষে নাম লিখিয়েছেন। শ্রমিক-কৃষক শোষিত মানুষের রাজনীতি আপাতত শিকেয় তুলে রেখেছেন তারা। 

ক্ষমতা, পুঁজি এখন শতকরা ১০ জনের হাতে। বাকি ৯০ জন হতাশার সাগরে। তারা ক্ষমতার বাইরে। এই চিত্র গোটা বিশ্বের। নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় যারা, তারা ওই ১০ জনের প্রতিনিধিত্বই করে আসছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বঞ্চিত, শোষিত শতকরা ৯০ জন আজও সংগঠিত হতে পারেনি। এ কারণেই আমেরিকার নির্বাচনে যে ফল, বাংলাদেশের নির্বাচনে একই ফল। এমন ভোটের আয়োজন সংকটকে আরও উন্মোচিত করে দেয়। 

আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, এই দুর্দিনেও বাম শক্তি প্রস্তুত হতে পারেনি। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট তারা গঠন করেছেন বটে, তবে তা কতদূর কীভাবে যাবে, নিশ্চিত নয়। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রবল কোনো চেষ্টাও আমরা বামপন্থিদের মধ্যে লক্ষ্য করছি না। তারা রাষ্ট্রের চরিত্র উন্মোচন করতে পারছে না। পুঁজিবাদীরা যে শুধু নামে বা পোশাকে ভিন্ন এবং কাজে অভিন্ন– এটি জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারছে না। 

বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন আগের চেয়েও অধিক আমলাতান্ত্রিক। উপলব্ধি হচ্ছে, মানুষ পরিবর্তন চায়। জনগণের সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে জনগণের শক্তিকেই সামনে আসতে হবে। যারা সমাজ নিয়ে ভাবেন, তাদের বড় অংশ এখন বুর্জোয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গেছে। রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় সুশীলরাও বড় ভূমিকা রাখছে। টিকে থাকার নীতি অবলম্বন করে সুশীলরাও আজ জনগণ থেকে অনেক দূরে। সুন্দর সুন্দর অনেক কথা বলে তারাই এখন দেশ চালাচ্ছে। অথচ সব ক্ষেত্রে পতন ও ক্ষয় আগের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। কিন্তু তা যে কেমন হবে– এ আশঙ্কায় সমাজের উঁচুতলার তো বটেই, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষও ভুগছেন। 

জাতীয় নির্বাচন সবচেয়ে বড় যে সত্যটা দেখিয়ে দেবে তা হলো, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের আবশ্যকতা। বিদ্যমান ব্যবস্থায় মানুষের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা ও বেকারত্ব বাড়ছে; মাদকাসক্তি মানুষকে পঙ্গু করে দিচ্ছে; ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন ঘটছে যত্রতত্র; সড়কে রীতিমতো নরহত্যা চলছে। অপহরণ করে হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা এখনও চলছে। মব সন্ত্রাস নামে এক নতুন উপদ্রব সমাজের সমস্ত ইতিবাচক অংশকে তছনছ করে দিচ্ছে। বিপর্যস্ত প্রকৃতি ও পরিবেশের নীরব ক্রন্দন কেউ শুনছে না। 

আমেরিকার নির্বাচনে হাতি ও গাধার লড়াইতে সে দেশের মানুষের মুক্তি যে আসবে না– সেটা যেমন স্পষ্ট; বাংলাদেশের রাজনীতিতেও দুই জোটের লড়াই যে মানুষকে মুক্তি দেবে না– তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। বার্নি স্যান্ডার্স নামে একজন সাহসী ও ঘোষিতরূপেই সমাজতন্ত্রী ব্যক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু নিজের দলের অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনও শেষ পর্যন্ত পাননি। বোঝা গেছে, সমাজতন্ত্রীদের স্বতন্ত্র দল চাই। এই বোধটা এখন সব দেশেই শক্তিশালী হচ্ছে। নির্বাচন নামক আমাদের এই সর্বজনীন উৎসব তো অচিরেই শেষ হবে, কিছুদিন মাত্র বাকি; বাস্তবতাটা রয়ে যাবে। তার উন্মোচনও নতুন নতুনভাবে ঘটবে, ঘটতেই থাকবে। তবে আমাদের প্রত্যেককেই ঠিক করতে হবে, দক্ষিণ ও বামের চরম যুদ্ধে আমরা কে কোন পক্ষে। নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই, কোনোকালেই ছিল না। এখন যখন মেরূকরণ ব্যাপক ও গভীর হয়েছে, তখন তো নিরপেক্ষতার কোনো সুযোগই নেই। নিরপেক্ষতা অর্থ হচ্ছে পক্ষপাতিত্বকে লুকিয়ে রাখা। নিজের সঙ্গে প্রতারণা করাটা কি বাঞ্ছনীয়?

ধর্ম নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা নতুন ঘটনা নয়, পুরোনো ব্যাপার বটে। ব্রিটিশ আমলে ও পাকিস্তানি জমানাতে ওই ব্যবস্থা ভালো জমেছিল। তাতে ভীষণ ক্ষতি হয়েছে দেশের মানুষের। ধর্মকে সাইনবোর্ড বানিয়ে মানুষের খাওয়া-পরা, বেঁচে থাকার সংকট সম্পর্কে অন্যমনস্ক করে দেওয়া হয়েছে। ওই ঐতিহ্য এখনও শেষ হয়নি, বরং তেজি হয়ে ঘাড়ে শ্বাস ফেলছে।

একটা গল্প দিয়ে শেষ করা যাক। শবদেহকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল কেওড়াতলার শ্মশানঘাটে। মাঝপথে দুই দলে ঝগড়া লেগেছে। এক দল বলছে– ঠিক পথেই চলেছি। অন্য দল বলছে– ওটা কেওড়াতলার পথ নয়, আমতলার পথ। ভীষণ কলহ। মনে মনে মড়া বলছে, দুই দলকেই আমি চিনি। কিন্তু আমার তো কিছু বলার উপায় নেই। আমি যে মড়া। দেশের মানুষের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে কি মিল আছে ওই অসহায়ের?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×