বৃক্ষ ও বন সংরক্ষণ অধ্যাদেশ
বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হইবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩১ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩২
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) সরকার যে বৃক্ষ ও বন সংরক্ষণ অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করিয়াছে, উহা বহুদিক হইতে গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধ্যাদেশে জেলা প্রশাসকের পরিবর্তে বন ইজারা প্রদানের ক্ষমতা বন বিভাগের নিকট ন্যস্ত করা হইয়াছে। বনায়ন ব্যতিরেকে অন্য কোনো কার্যে বনভূমি ব্যবহার করা যাইবে না– এই বিধানও উহাতে সন্নিবেশিত। উপরন্তু অধ্যাদেশটি জারির তিন মাসের মধ্যে কোন বৃক্ষ কর্তনযোগ্য এবং কোনটা কর্তনযোগ্য নহে, তাহা তালিকা আকারে প্রকাশ করিতে হইবে। ইহা সত্য, বন দখল বা ধ্বংসমূলক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য বেশি দেখা গেলেও সরকারি বিভিন্ন মহলের যোগসাজশ ব্যতীত উক্ত অপকর্ম সম্পাদন সম্ভবপর নহে। ফলে বনের জমি ইজারা প্রদানের ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের পরিবর্তে বন কর্মকর্তার হস্তে ন্যস্ত হইলেই বন সংরক্ষণকার্য যথাযথরূপে করা যাইবে না। কারণ জেলা প্রশাসকের ন্যায় বন কর্মকর্তাও সরকারেরই কর্মকর্তা এবং বন বিভাগের অভ্যন্তরে অসাধু কর্মকর্তার অভাব নাই। তবে অধ্যাদেশের মধ্য দিয়া এতদিন বন বিভাগের উপর যে দ্বৈত কর্তৃত্ব ছিল এবং সমন্বয়ের অভাবে এক পক্ষের সিদ্ধান্ত অন্য পক্ষ অবহেলা করিত, সেই সমস্যা দূরীভূত হইবে।
আমরা জানি, এতদিন বনের কোন ধরনের জমি ইজারাযোগ্য, সেই সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিধান ছিল না। অধ্যাদেশটি কার্যকর হইলে ইজারাযোগ্য জমির তালিকা প্রণয়নের মধ্য দিয়া এই বিষয়টিরও সুরাহা হইবে। প্রসঙ্গত, বিগত সময়ে বিভিন্ন স্থানে এমনকি সংরক্ষিত বনাঞ্চলও ইজারা প্রদানের দুর্ভাগ্যজনক দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। এই দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিয়া প্রভাবশালী মহল বহু স্থানে বন উজাড় করিয়াছে। শুধু উহাই নহে, ইজারার নামে বৎসরের পর বৎসর তাহারা জমি দখলে রাখেন। স্পষ্ট নির্দেশনার অনুপস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তাগণও এই বিষয়ে কিছু বলিতে পারিতেন না। গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলি রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার করিয়া বনাঞ্চল উজাড় করিয়া কটেজ, রেস্টুরেন্ট গড়িয়া তুলিয়াছে। পার্বত্য চট্টগ্রামভুক্ত রাঙামাটি কিংবা বান্দারবানের ন্যায় অঞ্চলে স্বয়ং সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জমি দখল ও তথায় বসতি নির্মাণের বহু অভিযোগ রহিয়াছে। কক্সবাজারের বহু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সরকারি প্রশাসন ক্যাডারের জন্য প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের তোড়জোড়ও আমরা দেখিয়াছি।
এই কথাও সত্য, আমাদের নীতিনির্ধারকগণ বিভিন্ন সময়ে বন সুরক্ষার নামে বহু আইন প্রণয়ন করিয়াছেন। দুঃখজনক, এই সকল আইন ও নির্দেশনা পরিবেশ সচেতন মানুষদের এক প্রকার প্রবোধ দেওয়া ভিন্ন খুব বেশি কার্যকর ফল দেয় নাই। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত বৃক্ষ কর্তন নিষিদ্ধ হইবার পরও আমরা ইতোপূর্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন দেখিয়াছি। সুধী সমাজ ও পরিবেশ রক্ষাকর্মীদের আন্দোলন সত্ত্বেও পরিবেশ বিধ্বংসী এহেন কার্য বন্ধ হয় নাই। এমনকি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বহু ক্ষেত্রে বন বা সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কক্সবাজারেই সমুদ্রসৈকত ও বাঁকখালি নদীর মোহনায় দখলকৃত জমিতে স্থাপনা নির্মাণ দেখিয়াছি। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা দীর্ঘদিন ধরিয়া যিনি পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরূপে সুপরিচিত, তিনিও ঐ সর্বদলীয় দখলদারিত্ব উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়া পিছাইয়া আসিতে বাধ্য হইয়াছেন। সুতরাং বন সংরক্ষণের ব্যাপার কেবল অধ্যাদেশ জারির বিষয় নহে, বরং উহা বাস্তবায়নের পথ নিশ্চিতকরণই মুখ্য বিষয়।
আমাদের বক্তব্য হইল, কেবল নির্দেশনা দিয়া সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং বন ও পরিবেশ ধ্বংসের সহিত যুক্ত সকল প্রকার ক্ষমতার বলয়কে জবাবদিহির মধ্যে আনয়ন জরুরি। অন্যথায় এই অধ্যাদেশ কাগজেই থাকিয়া যাইবে। প্রয়োজনে বিষয়সমূহ লইয়া রাজনৈতিক দলগুলির সহিত কার্যকর আলোচনা করিতে হইবে। তৎসহিত জনগণের মধ্যেও বন ও পরিবেশ সুরক্ষা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা গড়িয়া তুলিতে হইবে।
- বিষয় :
- বৃক্ষরোপণ
- বনায়ন
- বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ
