ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী

ভারতীয় সংসদ যখন রাবার স্ট্যাম্প

ভারতীয় সংসদ যখন রাবার স্ট্যাম্প
×

শশী থারুর

শশী থারুর

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০০ | আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

নয়াদিল্লির শীতকালীন বাতাস এখন কেবল ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন নয়; ক্ষয়িষ্ণু সংসদীয় সংস্কৃতির দুর্গন্ধেও তা ক্রমশ ভারি হয়ে উঠছে। সম্প্রতি সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শেষ হয়েছে। এটি কেবল সরকারি দল যেমনটা দাবি করেছে; আইন প্রণয়নের দক্ষতার প্রদর্শনী ছিল না, বরং আমাদের উন্মুক্ত গণতন্ত্র পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংসের এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও বটে। খুব স্পর্শকাতর কিছু আইন পাসের মাধ্যমে সরকার আবারও সংসদীয় পরামর্শমূলক গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার চেয়ে আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোঁতা অস্ত্রের প্রতি তার পক্ষপাত দেখিয়েছে। আইনগুলোর মধ্যে আছে সাবকা বীমা সবকি রক্ষা (বীমা আইন সংশোধন) বিল, শান্তি (পারমাণবিক শক্তি বিল) ও ভিকসিত ভারত-জি রাম জি বিল (যেটি ঐতিহাসিক এমজিএনআরইজিএর উত্তরসূরি বলা যায়)। এমজিএনআরইজিএ হলো দীর্ঘদিন ধরে চলমান গ্রামীণ মানুষের জীবিকা ও আশ্রয়স্থল নিশ্চিত করার কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মসূচি, যা মহাত্মা গান্ধীর নামে পরিচিত।

শাসকগোষ্ঠী এই আকস্মিক ও তড়িঘড়ি বিল পাসের কৌশলের নাম দিয়েছে ‘উৎপাদনশীল অধিবেশন’। কিন্তু তার জন্য কী মূল্য দিতে হয়? যখন শাসন ব্যবস্থায় কোনো ধরনের জবাবদিহি থাকে না, তখন এর ফল অগ্রগতি নয়, বরং নির্বাহী বিভাগের স্বৈরতন্ত্রের দিকে অস্থিতিশীল পতনকে নির্দেশ করে। আজ সংসদ ভবনের তাৎপর্যপূর্ণ কক্ষগুলো জনপ্রতিনিধিদের ফোরাম হিসেবে কম বিবেচনায় আসে; বরং মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সুবিধাজনক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র হিসেবেই প্রাধান্য পাচ্ছে। 

বিলের সংখ্যা এমন এক গল্পের অবতারণা করে যা মন্ত্রীদের কোনো বক্তব্য দিয়েই চেপে রাখা যায় না। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে আমরা দেখেছি, ১০টি বিলের মধ্যে আটটিই উভয় কক্ষে সদস্যদের আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও পাস হয়েছিল। সাম্প্রতিক স্মৃতিতে সবচেয়ে রূপান্তরকারী দুটি আইনের কথা মনে পড়ছে। বীমা সংশোধনী বিল, যা ১০০ শতাংশ বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের অনুমোদন দেয়; আরেকটি হলো শান্তি বিল, যার মধ্য দিয়ে দায়মুক্তিসহ আমাদের বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি খাতকে বেসরকারীকরণ করা হয়। বিক্ষোভ, হট্টগোল এবং ওয়াকআউটের কারণে বিরোধীদের নীরবতার মধ্যে এটি পাস করিয়ে নেওয়া হয়। 

আরও বেশি বিরক্তিকর ছিল জি রাম জি বিলের ধাক্কা। এমজিএনআরইজিএ হলো ২০ বছরের পুরোনো লাইফলাইন, যা দুই দশক ধরে রূপান্তরকারী আইন হিসেবে প্রমাণিত। আর মহামারিকালে লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের হাত থেকে বাঁচিয়েছে, অথচ এর পরিবর্তে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরি এবং মধ্যরাতের পর রাজ্যসভায় তা সম্পন্ন করা সংসদীয় চেতনার প্রতি অবমাননার শামিল। বিরোধী পক্ষগুলো বারবার ও যুক্তিসংগতভাবে আবেদন জানিয়েছিল, এই জটিল বিলগুলো যেন স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু আমাদের অনুরোধ না ভেবেই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। এটি এখন আর কোনো বিচ্যুতি নয়; এক দশক ধরে চলমান আইনসভার তাড়াহুড়ো করার একটি ধরন, যা যাচাই-বাছাই করাকে উপেক্ষা এবং সূক্ষ্মতাকে উপদ্রব বলে গণ্য করে।  

অনভিজ্ঞদের কাছে কমিটির বিবেচনা একঘেয়েমি মনে হবে এবং আমলাতান্ত্রিক বাধার মতো শোনাতে পারে। বাস্তবে এটি একটি কার্যকর গণতন্ত্রের ভেতরের স্পন্দন। টেলিভিশনে প্রচারিত অধিবেশনের নাটকীয় পারফরম্যান্সের বাইরে থাকা কমিটিতেই বিশেষজ্ঞদের দ্বারা বিলগুলো ব্যবচ্ছেদ করা হয়, যা বহুদলীয় প্রতিনিধিদের দ্বারা যাচাই, আর পরে তা কার্যকর আইনে রূপান্তর করা হয়। পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চের তথ্য এ ধরনের অনুশীলনের জন্য একটি ভয়াবহ উদাহরণ। ১৫তম লোকসভায় (ইউপিএ-২ এর অধীনে), ৭১ শতাংশ বিল বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমান সরকারের ১৭তম লোকসভার অধীনে এই সংখ্যাটি মাত্র ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

কমিটিগুলোর ‘দ্বিতীয় যাচাই-বাছাই’ উপেক্ষা করার মাধ্যমে আমরা বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানাই। আমরা এই সিনেমাটিও আগে দেখেছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কৃষি-সংক্রান্ত আইনগুলো কমিটির যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে সংসদে পাস করা হয়েছিল। কিন্তু এক বছর পর রাস্তায় দীর্ঘ বিক্ষোভের পর তা বাতিল করা হয়। আলোচনা ছাড়াই আইন প্রণয়ন পরিবেশের প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে নদীতে বাঁধ নির্মাণের মতো– উদ্বোধনের দিন এটি চিত্তাকর্ষক দেখাতে পারে, কিন্তু বাস্তবতার জোয়ারের চাপে এটি ভেঙে যাওয়াই নিয়তি।

সংসদের সংকুচিত সময় কমিটির কাছে বিল পাঠানোর হার আরও কমিয়ে দেয়। ১৭তম লোকসভায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বিল ৬০ মিনিটেরও কম আলোচনায় পাস হয়েছিল। কল্পনা করুন: যেসব আইন দশকের পর দশক ধরে ১.৪ বিলিয়ন মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেগুলো ‘দ্য বা****স অফ বলিউড’-এর একটি পর্ব দেখার জন্য যত সময় লাগে তার চেয়ে কম সময়ে ‘বিতর্ক’ করা হয়।
এই নীরবতার অস্ত্রাগারের সবচেয়ে ভয়াবহ হাতিয়ার হলো ‘গিলোটিন’, আর্থিক আইনের বিশাল অংশ এবং পুরো ইউনিয়ন বাজেটের একাংশ কোনো আলোচনা ছাড়াই পাস করার প্রথা। যখন আমরা ২০১৮ ও ২০২৩ সালে এটি দেখলাম, তখন এটি একটি মৌলিক ভাঙনের ইঙ্গিত দেয়। যখন সংসদের ক্ষমতা (নির্বাহী বিভাগের ওপর আইনসভার প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণ) এত নম্রভাবে সমর্পণ করা হয়, তখন আইনসভা কার্যকরভাবে সরকারের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য একটি গৌরবময় নোটিশ বোর্ড এবং তার ইচ্ছা পাসের জন্য একটি রাবার স্ট্যাম্প হয়ে ওঠে।

এই তাড়াহুড়োয় কী হারিয়ে যায়? অংশীদারদের কণ্ঠস্বর। এমপিরা কখনও বীমা কর্মচারী ইউনিয়নের কথা শোনেননি, যারা ১০০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগজাত অস্থিরতাকে ভয় পান। পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কথা বলা যায়, যাদের শান্তি বিলের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা সম্পর্কে বৈধ উদ্বেগ রয়েছে অথবা এমজিএনআরইজিএর কর্মীরা, যাদের একটি নতুন জি রাম জি কাঠামোতে ঢুকতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা তারা বোঝে না বা গঠনে সহায়তা করে না। তাদের কথা না শুনতে সংসদীয় কমিটির কক্ষের দরজা বন্ধ করে সরকার মূলত ভারতীয় নাগরিকদের বলছে– ‘আমরা জানি আপনার জন্য কোনটা সবচেয়ে ভালো; আপনার মতামত একটি অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব’।

একটি গণতন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হতে হলে ‘তিনটি বিষয়’ রক্ষা করতে হবে: বিতর্ক, ভিন্নমত এবং আলোচনা। এগুলো ছাড়া সংসদের পবিত্রতা ভেতর থেকে ফাঁকা হয়ে যায়। প্রস্তাবের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক এবং বিরোধী দলের পাল্টা পরামর্শ নিয়ে আলোচনা সংসদীয় ব্যবস্থার প্রাণ। যে সরকার ভিন্নমত দমন করার জন্য তার সংখ্যাগরিষ্ঠতার অস্ত্র ব্যবহার করে, সে শক্তিশালী সরকার নয়। এটি একটি অনিরাপদ সরকার, যা যাচাই-বাছাইকে ভয় পায়।

সরকার যদি বিরোধী দলকে অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে, তাহলে অনেকের কাছে যুক্তিকে সংসদের মেঝে থেকে রাস্তার ধুলোয় ছুড়ে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। যদি আমরা আগামী সপ্তাহ এবং মাসগুলোতে জি রাম জি বিলের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখতে পাই, তাহলে এর দায় সরাসরি তাদের নিতে হবে যারা কমিটি রুমে এমপিদের এটি পর্যালোচনা করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

এটা এক প্রহসন যে যখন আমরা ‘গণতন্ত্রের জননী’ উদযাপন করছি, তখন আমরা ধীরে ধীরে তার শ্বাসরোধের কর্মকাণ্ডে সভাপতিত্ব করছি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভারতীয় জনগণকে হতাশ করেনি; শাসকরাই ব্যবস্থাকে ব্যর্থ করেছে। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, একটি প্রকৃত গণতন্ত্রে সংখ্যালঘুদের অবশ্যই তাদের মতামত প্রকাশ করার অধিকার থাকতে হবে, এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতও যদি এতে জয়ী হয়।

শশী থারুর: লোকসভার সদস্য 
এবং বিদেশবিষয়ক সংসদীয় 
স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান

আরও পড়ুন

×