কূটনীতি
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম–গেল সপ্তাহে পেঁয়াজ কিনলাম ১৪০ টাকা কেজি আর আজ দেখছি ৬৫ টাকা কেজি? উত্তর সহজ–স্যার, ভারতের পেঁয়াজ আসায় দাম কমেছে। সে আরও যোগ করল, অধুনা আপদ মোকাবিলায় পাকিস্তান ও তুরস্ক থেকে আমাদের পেঁয়াজ আমদানির অভিজ্ঞতা ভালো নয়। ভারতই নাকি আমাদের শেষ ভরসা।
কেলগ স্কুল অব ম্যানেজমেন্টে জিওপলিটিকসের এক বিশেষ আলোচনায় আমাদের শিক্ষক বলেছিলেন, তোমার পিতামাতা ও নিকট প্রতিবেশী দেশ তোমার ইচ্ছায় নির্ধারিত হবে না। সিটিব্যাংক এনএ-তে আমার নিয়োগকারী কর্মকর্তা প্রয়াত নানু পামনানি বলেছিলেন, তুমি হয়তো ভারতে প্রবেশে অনীহ হতে পারো কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে কোথাও ভারতীয়দের অবস্থানকে অবজ্ঞা বা অবহেলা করতে পারবে না। এমনকি আমাদের অর্থ উপদেষ্টাও বলেছেন, অর্থনৈতিক আর স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ভারতকে আমাদের প্রয়োজন।
সন্দেহ নেই, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতা হারানো ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ছাড়াও সমগ্র ভারতের জন্যই একটি বড় ধাক্কা ছিল। কারণ শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারত ছিল তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র। নয়াদিল্লির সমর্থন আওয়ামী লীগকে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন পার হতে সহায়তা করে। কিন্তু ক্রমেই অজনপ্রিয় হতে থাকা একজন শাসকের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও বাড়িয়ে তোলে। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে উভয় দেশই সম্পর্ক মেরামতে হিমশিম খাচ্ছে। একে অপরের উদ্দেশে আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং অভিন্ন সীমান্তে সংঘাতের মতো ঘটনায় লিপ্ত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচন এই সম্পর্ককে নতুন করে ঢেলে সাজানোর একটি সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। এই সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে নয়াদিল্লির উচিত নির্বাচনের পরে সহযোগিতার মনোভাব প্রদর্শনের প্রস্তুতি নেওয়া এবং যাদের সঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে, তাদেরসহ রাজনৈতিক অংশীজনের সঙ্গে বিস্তৃত পর্যায়ে যোগাযোগ জোরদার করা। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের উচিত নির্বাচনী প্রচারণার সময় ভারতবিরোধী বক্তব্য যথাসম্ভব পরিহার করা।
দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আনতে কী করতে হবে, তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতেও বলা হয়, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের ফলে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। সীমান্ত নিয়ে বিরোধ, পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য বহুগুণ বেড়েছে। তবে তাদেরও আশাবাদ, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন এ সম্পর্ককে নতুন করে ঢেলে সাজানোর একটি সুযোগ এনে দিয়েছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং দেশ দুটির মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে; তবুও সীমান্ত বিরোধ, নিরাপত্তা ঝুঁকি, ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণ নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রায়ই টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের একটি সরব ভূমিকা রয়েছে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভারতকে বেশ সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ হাসিনার বিজয় এমন এক সুযোগ এনে দিয়েছিল, যাকে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে। উভয় পক্ষ স্থল ও সমুদ্রসীমা নির্ধারণ সম্পন্ন করে এবং শুল্ক হ্রাস, একাধিক ট্রানশিপমেন্ট চুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংহতি পাকাপোক্ত করে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি পর্যটন ও চিকিৎসার জন্য ভারত সফর শুরু করেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে প্রবল ধারণা ছিল ও আছে যে, শেখ হাসিনার একনায়কতান্ত্রিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে ভারত রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে একতরফা সুবিধা নিয়েছে। শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান সত্ত্বেও ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার ভারতের সিদ্ধান্ত এই তিক্ততা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

উভয় পক্ষই দাবি করছে যে তারা সম্পর্ক মেরামতের জন্য হাত বাড়িয়েছে, অন্যপক্ষ থেকে সাড়া পায়নি। উল্টো একে অপরের বিরুদ্ধে উস্কানির অভিযোগ তুলেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থান নেয়, যা বাণিজ্য নিয়ে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে। এই উত্তেজনা কোনো পক্ষের জন্য সুবিধা না এনে দিয়ে বরং নেতিবাচক ধারণাকে আরও বদ্ধমূল করেছে।
উভয় দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা এটি স্বীকার করেন বলে মনে হয় যে, আরও ভালো সম্পর্ক উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক; তবুও একটি ঝুঁকি রয়ে যায় যে তারা তিক্ততা ও অবিশ্বাসের আবর্তে আটকে যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সংঘাতের সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও সম্পর্কের টানাপোড়েন ব্যাপক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সহিংস বিক্ষোভ, সাম্প্রদায়িক হামলা, সীমান্ত হত্যা এবং বিদ্রোহী তৎপরতা। ভবিষ্যতে ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তির উত্থান এটিকে আরও জটিল করতে পারে।
দীর্ঘকাল ধরে ভারত মনে করে আসছিল, বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা নির্ভর করে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার ওপর; যা বাংলাদেশের রাজনীতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যদি পরবর্তী সরকার বিএনপিই গঠন করে, তবে উভয় পক্ষেরই উচিত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্পর্ককে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে নিয়ে আসা। নয়াদিল্লির উচিত হবে এর চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা–শুধু নির্বাচন-পরবর্তী প্রশাসনের সঙ্গেই নয়; বরং অন্য দলগুলোর সঙ্গেও। পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরও উন্নত করতে হবে, যাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখা যায়। ভারত যৌক্তিকভাবেই নিজেদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। তবে একই সঙ্গে দেশটিকে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যেন তাদের উদ্যোগগুলো উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক হয় এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীল বিষয়গুলো বিবেচনায় থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে আরোপিত ভিসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লির উচিত নিজ থেকে আগ্রহী হয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা ও নতুন নীতি নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করা, যা তারা নতুন সরকারের কাছে তুলে ধরতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের উচিত নয়াদিল্লির ইতিবাচক উদ্যোগগুলোতে সাড়া দেওয়া, একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা, বিদ্রোহ ও চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান ও অবৈধ অভিবাসন রোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। আগামী বছরগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সঠিক পথে পরিচালনা এবং একে স্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। ভারতের মতো কৃষি, বিজ্ঞান আর স্বাস্থ্যসেবায় এগিয়ে থাকা একটি উদীয়মান শক্তির সঙ্গে একযোগে কাজ করার সুফলও বিবেচনায় রাখতে হবে।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- মামুন রশীদ
- ভারত
- কূটনৈতিক সম্পর্ক
