ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা

গোদের উপর বিষফোঁড়া

গোদের উপর বিষফোঁড়া
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৫ | আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধের লক্ষ্যে সরকার যেই ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার-এনইআইআর কার্যক্রম প্রবর্তন করিয়াছে, উহা লইয়া গ্রাহক মহলে নানা উদ্বেগ আমলযোগ্য। সমকালে শনিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রবর্তনের পরই এনইআইআর ব্যবস্থায় ত্রুটি পরিলক্ষিত হইয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র এনআইডি দিয়া কয়েক শত মোবাইল ফোন নিবন্ধনের অভিযোগ উঠিয়াছে। উপরন্তু এনআইডি ব্যতীত যেই কোনো ১৩টি অঙ্ক প্রবেশ করাইলেও ব্যক্তিগত তথ্য মিলিতেছে বলিয়া দাবি করিয়াছেন কেহ কেহ। অন্যদিকে, অনেকে বারংবার চেষ্টা করিয়াও এনইআইআর সার্ভারে প্রবেশ করিতে পারিতেছেন না। অর্থাৎ যদ্রূপ বিদ্যমান এনইআইআর ব্যবস্থায় গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের শঙ্কা সৃষ্টি হইয়াছে, তদ্রূপ ইহার ব্যবস্থাপনা লইয়া শঙ্কা ও ভোগান্তিতে পড়িয়াছেন ব্যবহারকারীগণ। যদিও গত বৃহস্পতিবার ইহা প্রবর্তনের পর এনইআইআর কার্যক্রমের ত্রুটির কথা প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী স্বীকার করিয়া উহা সমাধানের চেষ্টা চলিতেছে বলিয়া জানাইয়াছেন। এই সন্দেহ অমূলক নহে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ব্যবস্থাটি প্রবর্তন করা হয় নাই। মহলবিশেষের বাণিজ্যিক স্বার্থে এনইআইআর কার্যক্রম অস্বাভাবিক দ্রুততায় প্রবর্তন করা হইয়াছে বলিয়া বিশেষত মোবাইল সেট ব্যবসায়ীদের পক্ষ হইতে ইতোপূর্বে যেই অভিযোগ উঠিয়াছিল, উহারও ভিত্তি রচনা করিতেছে। দেশে নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘনকারী ঘটনা বহুভাবেই ঘটিতেছে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে এই বিষয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছিল। তথায় বলা হইয়াছিল, টাকা দিলেই মিলিতেছে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ব্যাংক হিসাবের স্থিতির ন্যায় ব্যক্তির ২৫ ধরনের গোপনীয় তথ্য। ফেসবুকের ন্যায় সামাজিক মাধ্যম, নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং অ্যাপসের মাধ্যমে এই কার্যক্রম প্রায় প্রকাশ্যে চলিলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাসমূহের পক্ষ হইতে উল্লেখযোগ্য কোনো নিবৃত্তিমূলক তৎপরতা পরিলক্ষিত হইতেছে না। ত্রুটিপূর্ণ এনইআইআর কার্যক্রম নিঃসন্দেহে এই উদ্বেগে নূতন মাত্রা যুক্ত করিয়াছে। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য অরক্ষিত থাকিলে ভুক্তভোগীর জন্য উহা কত প্রকার বিড়ম্বনা সৃষ্টি করিতে পারে বিদ্যমান ডিজিটাল যুগে, তাহা কাহারও অজানা থাকিবার কথা নহে। সম্পদ হস্তগতকরণ এবং অপরাধী চক্র এই সকল তথ্য বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যে ব্যবহার করিতে পারে, যাহাতে এমনকি ভুক্তভোগীর জীবনও বিপন্ন হইবার আশঙ্কা থাকিয়া যায়। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা না থাকায় দেশে নারীদের কতটা হেনস্তা, এমনকি নানাবিধ গুরুতর অপরাধের শিকার হইতে হয়, তাহাও আমরা সম্যক জ্ঞাত। নারীদের উত্ত্যক্ত করা এবং তাহাদের অগোচরে প্রতারণার মাধ্যমে অশ্লীল ছবি ও ভিডিওচিত্র অনলাইনে বিস্তারের ন্যায় ভয়ংকর ঘটনা তো ঘটিতেছে আকছার। 

এনইআইআর কার্যক্রমের মধ্য দিয়া নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হইবার আশঙ্কা কেবল গোদের উপর বিষফোঁড়া নহে; খোদ সংবিধানের প্রতিও সরকারের অশ্রদ্ধার পরিচায়ক। 

আমরা জানি, বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার মৌলিক মানবাধিকাররূপে স্বীকৃত, যথায় আয়-ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য, অসুস্থতাজনিত তথ্য, যোগাযোগ তথ্য ইত্যাদি সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর ন্যস্ত। সংবিধান গৃহীত হইবার ৫৪ বৎসরেরও যে এই বিষয়ে গ্রহণযোগ্য আইন প্রণীত হয় নাই, ইহাও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় সরকারের অবহেলার প্রমাণ। আমরা মনে করি, সরকারকে সম্ভাব্য স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যক্তির তথ্য সুরক্ষা বিষয়ে আইনি কাঠামো প্রবর্তন করা যদ্রূপ জরুরি, তদ্রূপ দ্রুত এনইআইআর কার্যক্রমের ত্রুটিসমূহও সংশোধন অপরিহার্য। উপরন্তু স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে এনইআইআর কার্যক্রমে তথ্য পাচারের ছিদ্র রাখিবার রহস্য উন্মোচন করিয়া দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।
 

আরও পড়ুন

×