ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জননিরাপত্তা

স্বাভাবিক বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা বন্দুকে সম্ভব?

স্বাভাবিক বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা বন্দুকে সম্ভব?
×

মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৬ | আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতার বয়স তখন এক বছর পার হয়েছে মাত্র। নানা কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার উপক্রম। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও খুনের ঘটনা ঘটছে। এমনই এক অবস্থায় ১৬ মার্চ প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন তদানীন্তন দৈনিক বাংলায় লিখলেন সময়ের দুঃসাহসিক উপসম্পাদকীয়– ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’। পরবর্তী সময়ে তাঁর নিবন্ধের শিরোনামটি প্রায় স্লোগানে পরিণত হয়েছে।

এরপর পাঁচ দশকে বুড়িগঙ্গায় অনেক জল গড়িয়ে গেছে; সামরিক-বেসামরিক, গণতান্ত্রিক সরকার এসেছে। সামরিক অভ্যুত্থান, বেসামরিক গণঅভ্যুত্থান বা স্বাভাবিক নিয়মে বিদায়ও নিয়েছে। কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি রয়ে গেছে সুদূরপরাহত। তারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে সম্প্রতি আরেক প্রথিতযশা সাংবাদিক মাহফুজ আনামের বক্তব্যে। সম্প্রতি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় তিনি বলেছেন, ‘মতপ্রকাশ তো দূরের কথা; এখন বেঁচে থাকার অধিকারের ব্যাপার এসে গেছে’ (সমকাল, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫)।

বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে মাহফুজ আনামের সংশয় অমূলক নয়। খবরের কাগজ উল্টালেই দেখা যায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনোটি পড়তে যাওয়াও দুর্বল স্নায়ুর মানুষের পক্ষে কঠিন। যেমন ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস কিংবা লক্ষ্মীপুরে ৭ বছরের শিশু আয়েশার প্রাণহানি। আদিমতা কোন পর্যায়ে পৌঁছলে কাউকে পিটিয়ে হত্যার পর গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে! কিংবা শিশুসহ পরিবারের সবাইকে ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে জ্বালিয়ে দিতে পারে! 

যদিও দুদিন পর র‌্যাব তদন্ত করে জানিয়েছে, তারা দিপু চন্দ্রের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার প্রমাণ পায়নি। অভিযোগটি সত্য হলেও কাউকে মেরে আগুনে পোড়ানো যায় না। কেউ আইন ভাঙলে তার জন্য আদালত রয়েছে। জ্বলন্ত ঘরের ভেতর ৭ বছরের শিশুকন্যা আয়েশার ‘আব্বু বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও’ আকুতির দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। স্বাভাবিক-সুস্থ মানুষকেও ট্রমাগ্রস্ত হতে হয়।
তার আগে, গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত সড়কে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে গেলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। হাদি ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। মূলত প্রাক-নির্বাচনী প্রচারকালেই তিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। 

ওই ঘটনার সূত্র ধরে ১৫ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এক সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে নতুন আগ্নেয়াস্ত্র বা গানম্যান দেওয়ার ঘোষণা দেন। এদিকে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন হাদির দুঃখজনক মৃত্যুর পর নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। সেই রাতেই মহলবিশেষ ভাঙচুর ও লুটপাটের পাশাপাশি আগুন দেয় প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানট কার্যালয়ে। পরদিন উদীচী কার্যালয়েও আগুন দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে সরকার তার গানম্যান বিতরণ নীতিতে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সমাজের ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করে। জানা যায়, ইতোমধ্যে রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকা তৈরি হয়েছে। নিজের নিরাপত্তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করেছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে দেশে জননিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো রয়েছে মব সহিংসতা। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, বাসার গৃহকর্মী মা-মেয়েকে খুন করে নির্বিকার চিত্তে গৃহত্যাগ করছে। ঘরে ও বাইরে এ-ই যদি হয় পরিস্থিতি, সমাজে মানুষ স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারে না।

সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘এক বছরে খুলনায় মানুষ খুনের সেঞ্চুরি’ হয়েছে। একসময় এ দেশের মানুষ সেঞ্চুরি শব্দটা ব্যবহার করত ক্রিকেট খেলার রানের ক্ষেত্রে। এখন সেটা ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষ খুনের খবরের শিরোনাম হিসেবে! শুধু খুলনা নয়; সিরাজগঞ্জ, কক্সবাজার, নেত্রকোনাসহ দেশের নানা এলাকায় প্রতিদিন তুচ্ছ কারণে মানুষ খুনের খবর আসছে।
জননিরাপত্তা নিয়ে একই রকম আতঙ্ক দেখেছিলাম আফগানিস্তানে। দেশটিতে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, ওখানে প্রায় প্রতিটি পরিবারেই ন্যূনতম একটা কালাশনিকভ আছে। রুটি কেনার পয়সা না থাকলেও তারা কালাশনিকভ ঠিকই কেনে। কেনে নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু প্রতিদিন সেখানে প্রাণহানি ঘটে। 

গানম্যানের কথা যদি বলা হয়, আফগানিস্তানের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী আছে। তারপরও তারা খুন হচ্ছেন এবং নিয়মিত বিরতিতে। একসময়কার প্রেসিডেন্ট বুরহান উদ্দিন রব্বানীকেও ২০১১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এক আত্মঘাতী খুনি তাঁর ঘরে ঢুকে করমর্দন করতে গিয়ে বোমায় উড়িয়ে দেয়। এমন আরও অনেক ঘটনাই আছে। আফগানিস্তানের মানুষের অনেক সমস্যা। সবচেয়ে বড় সমস্যা নিরাপত্তাজনিত আতঙ্ক। গানম্যান কিংবা কালাশনিকভ তাদের সেই আতঙ্ককে জয় করতে পারছে না।

আমাদের দেশেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতে তেমন ভালো ছিল না; কিন্তু বর্তমানের মতো এমন আতঙ্কগ্রস্ত পরিবেশ কখনোই ছিল না। নির্মল সেনের কাঙ্ক্ষিত স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়ে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের বিষয়টিই এখন প্রধান হয়ে উঠছে। রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশ ছাড়া গানম্যান দিয়ে যে তা নিশ্চিত করা যাবে না– বলাই বাহুল্য।

মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক; 
জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা

আরও পড়ুন

×