ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সুশাসন

যেসব বোঝা বইতে হবে ‘গঠিতব্য’ সরকারকে

যেসব বোঝা বইতে হবে ‘গঠিতব্য’ সরকারকে
×

খাজা মাঈন উদ্দিন

খাজা মাঈন উদ্দিন

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৫৩ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:২২

বিগত ১৭ বছরে বৈষম্যের শিকার বা বঞ্চিত বিশাল জনগোষ্ঠীকে সুষম সুবিধা দিতে কত টাকা লাগবে, কে জানে! বর্তমান বেকারদের ও প্রতিবছর চাকরির বাজারে আসা ২০ লাখের অধিক তরুণের সুযোগ তৈরি হবে কোথায়, কী জানি! মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত এবং বাসযোগ্য নগর, শহর ও গ্রাম নির্মাণ সম্ভব হবে কীভাবে?

খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংক খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে অন্তত পাঁচ লাখ কোটি টাকার জোগান দেবে কোন উৎস? ১০০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং সুদ পরিশোধের দায় মেটানোর ফর্মুলা কই? পাচার হয়ে যাওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ কি দেশ ফেরত পাবে কোনোদিন?

এ রকম অনেক প্রশ্নের শুধু তাত্ত্বিক উত্তর খুঁজলেই চলবে না; গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের জনগণ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফলাফল দেখতে চাইবে।
পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও ভূ-রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান কী হবে এবং দেশীয় স্বার্থ বৃদ্ধি করতে কোন ধরনের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে, তা জাতীয় সমঝোতা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে নির্ধারণ করতে হবে নতুন আঙ্গিকে।

ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোত যোগ্যতম ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্কার সার্থক করতে কত বড় আয়োজন এবং যে কষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করা প্রয়োজন, সেটিও এক গুরুতর জাতীয় মন্ত্রণার ব্যাপার।

ফ্যাসিবাদী শাসকদের ফেলে যাওয়া পাহাড়সমান সমস্যার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ভিন্ন প্রত্যাশা এবং নতুন যুগের অজানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার গুরুদায়িত্ব পড়তে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনের পর ‘গঠিতব্য’ সরকারের ওপর। সুতরাং আগামীতে যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছেন তাদের ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতে থাকছে না কোনো মধুচন্দ্রিমা কাল, যে সময়টায় নবনির্বাচিত শাসকরা সাধারণত প্রশংসায় ভাসেন এবং জনপরিসরে খুব একটা সমালোচনা শুনতে হয় না।

কারণ শুধু জমে থাকা সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের বোঝা নয়; জুলাই সনদসহ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে অগ্রিম দায়িত্ব পালন নিয়ে এক ধরনের জাতীয় ঐকমত্য আছে।

জনতার দাবি-সংবলিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুর আবারও প্রতিধ্বনিত হয়েছে একই মাসে তিনবার; ২০ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদির জানাজার ভিড়ে, ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের গণসংবর্ধনায় এবং ৩১ ডিসেম্বর খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানানো ঐতিহাসিক গণজমায়েতে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে জনতার এভাবে একত্রিত হওয়ার পরিবেশ ছিল না বলেই তাঁর বিদায় হয়েছে গণবিস্ফোরণে।

সেই তপ্ত আবেগ কিছুটা ঠান্ডা হয়ে এলে এবং মানুষ যার যার কাজে অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়লে ক্ষমতা কেন্দ্রের ব্যক্তি-গোষ্ঠীরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দাবি অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার থেকে সরে আসার আয়েশি চেষ্টা করলেও করতে পারেন। কোনো কারণে গণভোটে জুলাই সনদ ৫১ শতাংশ জনসমর্থন না পেলে তো কথাই নেই, তবে তা হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

একটু সাধারণ জ্ঞান প্রয়োগ করলেই বোঝা যাবে, সংস্কারবিহীন কোনো সরকার ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা থেকে উত্তম তো হবেই না, বরং অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠী, সামাজিক মতামত তৈরি করা ব্যক্তি এবং গণতান্ত্রিক মানসিকতার জনতার চাপে রাষ্ট্র পরিচালনাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, মানুষ কোনো কিছুতে হতাশ হলে বা তাদের দাবি পূরণ না হলে কথায় কথায় মিছিল বা অবস্থান ধর্মঘট ঘোষণা করা হবে। এগুলো তবু গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই পড়ে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, দিশেহারা দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীগুলো সংগঠিত হয়ে নাশকতা করতে পারে– তাতে সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই। তাদের কাছে ৫০০ টাকা ও ১০০০ টাকার নোটের শত শত, এমনকি হাজার হাজার কোটির যে নগদ অর্থ আছে, তা কি স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে ব্যবহৃত হবে না?

শেখ হাসিনার গৃহীত ব্যবস্থা ও তাঁর ‘সেক্যুলার’ রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত বিদেশি শক্তি এবং ব্যক্তি কূটনীতিকরা পরিবর্তিত কেন্দ্রের বাম থেকে ডান দিকে সরে আসা রাজনৈতিক মেরূকরণ বিষয়ে ‘সংক্ষুব্ধ’ হতে পারেন এবং তা বাংলাদেশ নিয়ে তাদের নীতিতে প্রতিফলিত হতেই পারে।

বাংলাদেশের মতো একটি রেমিট্যান্স ও আমদানি-নির্ভর এবং রপ্তানির জন্য দু-চারটি আইটেম ও মাত্র কয়েকটি গন্তব্যের ওপর নির্ভরশীলতার দেশে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে খুব সহজেই ভঙ্গুর করে ফেলতে পারে পররাষ্ট্র সম্পর্কের অনাকাঙ্ক্ষিত অবনতি। তার ওপর দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা যদি স্মার্ট ও দূরদর্শী না হয়, তখন দেশ ও জনগণের ওপর তার অভিঘাত হতে পারে ভয়াবহ।

তাই ততটা ইচ্ছা না থাকলেও ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠায় আগামী সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে জনআকাঙ্ক্ষা মেটাতে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থেই; আরও সরাসরি বললে নির্বাচিত নেতৃত্বের পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে হলে পরিবর্তনের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন জরুরি। 

দেশের শ্লথ অর্থনীতিতে গতি আনতে, বিশেষ করে বিনিয়োগে বন্ধ্যত্ব দূর এবং কোটি তরুণের চাকরি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং ফ্রিল্যান্সিং কাজের ব্যাপক সুযোগ তৈরি করতে না পারলে সামাজিক হতাশা বেড়ে যাবে; জাতীয় অগ্রগতি হবে ব্যাহত। সেখানে উল্টো সেই সরকারের বাধ্যবাধকতা থাকবে অধিক হারে বিদেশি ঋণ পরিশোধের। সে জন্য এবং একই সঙ্গে উন্নয়ন কর্মসূচি ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দেবে। যার অবধারিত পদক্ষেপ হবে অজনপ্রিয় ব্যবস্থায় মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো।

এ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে যদি বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে অধিষ্ঠিত হয়; সরকার ও ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য এবং অন্যান্য সহযোগিতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাতে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। 

এই সমস্যাটি শেখ হাসিনার শাসনামলে সৃষ্ট। কিন্তু তাঁর পতনের পরও এ ইস্যুগুলো নিয়ে নীতিনির্ধারণে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সুস্পষ্ট। কার্যত অন্তর্বর্তী সরকারের আপৎকালীন ধাঁচে জাতীয় সমস্যা মোকাবিলা এবং সংস্কার, ফ্যাসিবাদী আমলের হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জাতীয় নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় পুঞ্জীভূত জাতীয় সমস্যার অনেকটিই পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের শক্তিশালী পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়ে গেল।

দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের ভূত বাংলাদেশকে তাড়া করবে আরও বেশ কিছুদিন এবং আগামী নেতৃত্ব চাইলেও শেখ হাসিনা সরকারকে ‘চট’ করে ভুলতে পারবে না। শিক্ষা ও দক্ষতায় গুণগত মান অর্জনে সমাজে, নির্দিষ্ট করে বললে ক্ষমতার বলয়ে যে অনীহা, সহজ পন্থা ব্যবহার, দুর্নীতি এবং অবক্ষয় যেভাবে বাসা বেঁধেছে, তার মূল্যও দিতে হবে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারকে। স্থিতাবস্থা ভাঙতে চাইলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভবের ভয়; পরিবর্তন না আনতে পারলে প্রতিশ্রুতি পালন ও কাজ করতে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা– এই উভয় সংকট থাকবে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সফল হওয়ার দায়িত্ব এবং সাহস চাইলে দেখাতে পারবে বাংলাদেশের আগামী নেতৃত্ব। কেতাবি ভাষায় সেই নেতৃত্বের অনেক গুণ এবং ব্যবস্থা নিতে এক গাদা উপদেশ দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে উদ্দেশ্য সাধনে নেতৃত্বের সদিচ্ছা ও ত্যাগের মানসিকতা।

সামগ্রিক ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে আরও দরকার হবে নতুন রাজনীতি, যা বদলানোর প্রক্রিয়া হয়তো শুরু হয়ে গেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে, আমরা যা এখনও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছি না। আমরা এমন এক অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্যে আছি যখন সরকারের কার্যসিদ্ধির জন্য লাগবে সুস্থ ধারার রাজনীতি এবং নতুন রাজনীতির ধারা তৈরি করতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বলেছিলেন, আমেরিকার বিপ্লব কখনোই সমাপ্ত নয় বরং নতুন বাস্তবতায়, নতুন প্রয়োজন মেটাতে নবায়নযোগ্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে প্রত্যাশা ও প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসকদের বিতাড়িত করে, সেই বিপ্লবী ঘটনার পরম্পরা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে বলে মনে হয় না।

খাজা মাঈন উদ্দিন: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×