জনপ্রশাসন
ভূমি প্রশাসনে বিশেষায়িত নিয়োগ
মো. আসাদুজ্জামান
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমানে বাংলাদেশ অত্যন্ত জনবহুল এবং সীমিত ভূখণ্ডের দেশ হওয়ায় এখানকার ভূমি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর। এই জটিলতা কেবল আইনি নয়, বরং তা সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের বর্তমান ভূমি প্রশাসন কাঠামোয় মাঠ পর্যায়ে এই গুরুদায়িত্ব পালন করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের এই কর্মকর্তারা মূলত রাজস্ব প্রশাসনের প্রাথমিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু একদিকে নামপত্তন বা মিউটেশনের মতো সূক্ষ্ম আইনি কাজ, অন্যদিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও প্রটোকল রক্ষার মতো প্রশাসনিক ব্যস্ততা– এই দুইয়ের চাপে পড়ে ভূমিসেবা আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ভূমি প্রশাসনকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ এবং বিশেষায়িত পেশাদার কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো আজ সময়ের দাবি।
ফৌজদারি কার্যবিধি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন ২০০৯ অনুযায়ী এই সহকারী কমিশনারকে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হয়। বালুমহাল তদারকি, বনভূমি রক্ষা, খাদ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান তাদের দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়। তাঁকে প্রায়ই ভিভিআইপি প্রটোকল রক্ষা, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সভার সমন্বয় এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়। যখন একজন কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কার্যালয়ে অপেক্ষমাণ শত শত ভূমি মালিকের শুনানি ব্যাহত হয়। এই বহুমুখী ব্যস্ততার ফলে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি দীর্ঘায়িত হয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। বর্তমানে একজন সহকারী কমিশনার দুই থেকে তিন বছর কাজ করার পর অন্য কোনো বিভাগে বদলি হয়ে যান।
এই স্বল্প সময়ে তিনি ভূমি আইনের জটিলতাগুলো পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেন না। কিন্তু একটি বিশেষায়িত ক্যাডার থাকলে কর্মকর্তারা সারাজীবন ভূমি বিভাগেই কাজ করবেন, যা তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করবে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।
ভূমি প্রশাসনের মূল ভিত্তি হলো ‘রেকর্ড অব রাইটস’ বা খতিয়ান হালনাগাদ রাখা। সহকারী কমিশনারকে প্রতিদিন শত শত নামপত্তন বা মিউটেশন মামলার নিষ্পত্তি করতে হয়। এই প্রক্রিয়াটি কেবল একটি দাপ্তরিক কাজ নয়, বরং অত্যন্ত জটিল আধা-বিচারিক প্রক্রিয়া, যেখানে দলিলপত্র যাচাই, উত্তরাধিকার আইন প্রয়োগ এবং দখলদারিত্বের প্রমাণ বিশ্লেষণ করতে হয়। এ ছাড়া খাসজমি রক্ষা, অর্পিত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, সায়রাত মহাল ইজারা এবং ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণের মতো কাজে তাঁকে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকতে হয়।
বাংলাদেশে বিচারিক ও সামাজিক সংকটের মূলে রয়েছে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মোট দেওয়ানি মামলার প্রায় ৭৯ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকেন্দ্রিক এবং প্রায় ৭০ শতাংশ ফৌজদারি অপরাধের মূলে রয়েছে জমির দখল বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, মাঠ পর্যায়ে ভূমি প্রশাসনের অদক্ষতা বা দীর্ঘসূত্রতা সরাসরি দেশের অপরাধ প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের আদালতগুলোতে প্রায় ৩২ লাখ মামলা বিচারাধীন, যার একটি বিশাল অংশ ভূমি জরিপ ও মালিকানা-সংক্রান্ত। একজন সাধারণ ভূমি মালিক যখন সহকারী কমিশনারের কার্যালয় থেকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত পান না, তখন তিনি দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন। দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় একটি বংশের কয়েক প্রজন্মকে নিঃস্ব করে দেয়। যদি মাঠ পর্যায়ে ভূমি কর্মকর্তাদের আইনি প্রজ্ঞা এবং পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি করা যেত, তবে এই মামলাজট সহজেই কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অধিকাংশেরই ভূমি-সংক্রান্ত কোনো একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে না। নিয়োগের পর ছয় মাস বা এক বছরের বুনিয়াদি ও বিভাগীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের এই জটিল জগতে প্রবেশ করানো হয়। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বহুমুখী ব্যস্ততা এবং বিশেষায়িত জ্ঞানের অভাব ভূমিসেবার গতিকে মন্থর করে দিয়েছে। এই অচলায়তন ভাঙতে হলে উচ্চশিক্ষিত ‘আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা’ গ্র্যাজুয়েটদের এই পেশায় যুক্ত করা এবং বিজেএসের মতো স্বচ্ছ বিচারিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ বা আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগের গ্র্যাজুয়েটরা চার-পাঁচ বছর ধরে ভূমি আইন, জরিপ প্রযুক্তি এবং উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে গভীর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেন। পরীক্ষার মাধ্যমে যথাযথ যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ দিলে ভূমি প্রশাসনের কাজে গতি আসতে পারে।
মো. আসাদুজ্জামান: সহকারী অধ্যাপক, আইন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- জনপ্রশাসন
