সড়ক নিরাপত্তা
যানবাহনের গতি কমিয়ে জীবনের গতি বাড়ুক
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ১০:২৩
দেশে সড়ক নিরাপত্তা নতুন আলোচ্য বিষয় নয়। নতুন হলো মোটরসাইকেলের দ্রুত বিস্তার ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি। গত পাঁচ-ছয় বছরে শহর থেকে মফস্বল, সড়ক থেকে মহাসড়ক– সবখানে যানবাহনটির আধিপত্য দৃশ্যমান। ট্রাফিক-অবকাঠামো, সড়ক শৃঙ্খলা, গাড়িচালকের ফিটনেস, নীতি-ব্যবস্থাপনা কোনো দিকেই প্রস্তুতিহীন অবস্থায় মোটরসাইকেলের এই আধিক্য এখন সড়ক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
কেন বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা? সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক নাগরিক সংগঠনগুলোর মতে, দুর্ঘটনার প্রধান তিন উৎস– বেপরোয়া গতি, চালকের অদক্ষতা এবং আইন না মানার সংস্কৃতি। তরুণ চালকদের বড় অংশ ‘স্পিড’ ও ‘স্টান্ট’ সংস্কৃতি পরিচালিত; যেখানে রোমাঞ্চ ছাপিয়ে যায় নিরাপত্তাবোধ। হেলমেট ও সুরক্ষা উপকরণের এখনও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেনি; বিশেষত রাজধানীর বাইরে অনেকের কাছেই সেগুলো অপ্রয়োজনীয়। মফস্বলে প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্স ছাড়াই মোটরসাইকেল চালানো প্রথায় পরিণত হয়েছে।
এর বাইরে অবকাঠামোগত দুর্বলতা– গর্ত, বাঁক, আলো, সেতু, সিগন্যাল, ফিডার রোড সংযোগ– দুর্ঘটনার ঝুঁকি করে বহুগুণ। তার সঙ্গে যুক্ত ট্রাফিক আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। নীতি ও নিয়ন্ত্রণহীনতার এই মিশ্রণ মোটরসাইকেলকে ঘাতক যানবাহনে রূপ দিয়েছে।
২. রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সাত হাজার ৩৫৯ জন এবং আহত ১৬ হাজারের বেশি। এ দুর্ঘটনার ৪০ শতাংশ এবং মোট নিহতের ৩৬ শতাংশের জন্য মোটরসাইকেল দায়ী। মোটরসাইকেল চালকদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ নিরাপত্তা-বর্ম ছাড়া আঘাত। যেখানে গাড়িতে একই ধাক্কা গুরুতর আঘাতে শেষ হতে পারত, মোটরসাইকেলে তা মৃত্যুতে শেষ হয়। হেড ইনজুরি, স্পাইনাল ইনজুরি ও পলিট্রমা সবচেয়ে বেশি, যা দীর্ঘ পুনর্বাসন ও স্থায়ী বিকলঙ্গতায় পর্যবসিত।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, ২০২৫ সালে সড়কে নিহত ৯ হাজার ১১১ জন এবং আহত ১৪ হাজারের বেশি। এদের মধ্যে প্রায় তিন হাজার মানুষ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। নিহতদের ৭৮ শতাংশই ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ– অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজের সবচেয়ে উৎপাদনশীল অংশ।
একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বহু পরিবারের জন্য আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ের সূচনা করে। অনেক সময় আহত ব্যক্তির দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পরিবারকে দারিদ্র্যে ঠেলে দেয়। মূল উপার্জনকারী অক্ষম হলে সন্তানদের শিক্ষা থেমে যায়, ঋণগ্রস্ততা বাড়ে, সামাজিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্রও জরুরি স্বাস্থ্য ব্যয় ও সুযোগ-সুবিধায় অতিরিক্ত চাপ বহন করে। অর্থাৎ দুর্ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় ট্র্যাজেডি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ, সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, পুলিশ, সিটি করপোরেশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও সমন্বয়ের ঘাটতি প্রকট। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নীতিহীনতা ও জবাবদিহির অনুপস্থিতিতে বছর বছর বৈঠক, কমিটি ও সুপারিশে সবকিছু আটকে থাকে; বাস্তবায়নে নয়।
৩. বাস্তবতা হলো, এ দেশে মোটরসাইকেল এখন রাজনৈতিক শোডাউন ও স্ট্যাটাসেরও বাহন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া যানবাহনটির বিক্রি আরও বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সোয়া চার লাখের বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি; ২০৩০ সালের মধ্যে ছয় লাখে পৌঁছাতে পারে।
প্রশ্ন হলো, যে রাষ্ট্র কার্যকর ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে এখনও প্রস্তুত নয়, সেই রাষ্ট্র কি আরও বিপুল মোটরসাইকেলকে নিরাপদে ধারণ করতে পারবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বছরে সাড়ে ১৩ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়; এর ২৮ শতাংশ মোটরসাইকেল চালক। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডে মোটরবাইক ব্যবহারের হার বেশি হলেও সেখানে বাধ্যতামূলক হেলমেট ও কার্যকর গতি নিয়ন্ত্রণ আইন মৃত্যুহার কমিয়েছে। অর্থাৎ আইন, সচেতনতা ও শৃঙ্খলা জীবন বাঁচায়।
৪. এখন আমাদের কী করা উচিত? জরুরি হলো– আইন ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, বাধ্যতামূলক হেলমেট, স্পিড গভর্নর ও আইওটি গতি নিয়ন্ত্রণ, লাইসেন্স-নিবন্ধনে কঠোর তদারকি, অবকাঠামো উন্নয়ন, আলাদা মোটরসাইকেল লেন, সার্ভিস লেন, নিরাপদ মহাসড়ক সংযোগ, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মানোন্নয়ন, বাধ্যতামূলক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, সচেতনতার সামাজিকীকরণ, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিরাপত্তা শিক্ষা, তরুণদের মধ্যে ঝুঁকি-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রচারণা।
মোটরসাইকেল আমাদের গতির স্বাধীনতা দিয়েছে। কিন্তু সেই গতি যদি জীবনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, তবে তা কল্যাণ নয়; নিঃশব্দ মহামারি। এই মহামারি আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি, পরিবার ও অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। চালক, পরিবার, বাজার, সমাজ– প্রত্যেকেই এর অংশ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি মৃত্যুর গতি কমিয়ে জীবনের গতি বাড়াতে প্রস্তুত?
সাব্বির নেওয়াজ: বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- সড়ক নিরাপত্তা
