ব্যবস্থাপনা
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাওয়া রহস্যজনক
মইনুল ইসলাম
মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
চীনা অর্থায়নে তিস্তা মহাপ্রকল্পের বাস্তবায়ন ২০২৬ সালের প্রথম সপ্তাহে শুরু হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বেশ কয়েকবার টিভি ক্যামেরার সামনে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে জানুয়ারির শেষ দিনেও এ কাজ শুরুর কোনো আলামত নেই। মনে হচ্ছে, এবার ভারতের কূটকৌশল নয়, বরং ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোর গোপন খায়েশই এ ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করছে। নির্বাচনের পর তারা এটা শুরু করতে চায়– এমন বার্তা নাকি ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় প্রত্যাশী উভয় দলই দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে।
জানুয়ারি মাসের শুষ্ক মৌসুমে প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত নদী খনন কাজ শুরু না হলে আগামী বর্ষা মৌসুমেও উত্তরবঙ্গের পাঁচটি সবচেয়ে অবহেলিত জেলা নীলফামারী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুরের দারিদ্র্যপীড়িত দুই কোটি মানুষকে আবারও চরম দুর্দশায় পড়তে হবে নিশ্চিতভাবে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বাংলাদেশ ভ্রমণের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা নদীর পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বিষয়ে তাঁকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। একসময় ‘চীনের দুঃখ’ হিসেবে পরিচিত হোয়াংহো নদী বা ইয়েলো রিভারকে দেশটি যেভাবে ‘চীনের আশীর্বাদে’ পরিণত করেছে; একই কায়দায় তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা হতে পারে। তাই শেখ হাসিনার অনুরোধে সাড়া দিয়ে সম্পূর্ণ চীনা অর্থায়নে প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপ্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পর প্রকল্প প্রস্তাবটি চীনের পক্ষ থেকে পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। চীন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে ঋণ প্রদানের যে প্রস্তাব দেয়, বাংলাদেশ তা গ্রহণ করেছিল বলেও জানা যায়।
প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপ্রকল্পে বাংলাদেশের সীমানার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর ১১৫ কিলোমিটারে ব্যাপক খনন চালিয়ে নদীর মাঝখানের গভীরতা ১০ মিটার বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি নদীর প্রশস্ততা ব্যাপকভাবে কমিয়ে ফেলা হবে। রিভার ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ব্যাপক ভূমি উদ্ধার করে চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। নদীর দুই তীরে ১১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চার লেনের সড়ক হবে। উপযুক্ত স্থানে নির্মিত হবে একাধিক ব্যারাজ-কাম-রোড নদীর দুই তীরের যোগাযোগ নিশ্চিত করার জন্য। বর্ষাকালে প্রবাহিত নদীর বিপুল উদ্বৃত্ত জলরাশি সংরক্ষণের জন্য জলাধার সৃষ্টি করে সেচ খাল খননের মাধ্যমে নদীর উভয় তীরের এলাকার চাষযোগ্য জমিতে শুষ্ক মৌসুমে সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি নদীর উভয় তীরের সড়কের পাশে ব্যাপক শিল্পায়ন ও নগরায়ণ সুবিধাদি গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। আন্তর্জালে প্রকল্পটির বর্ণনা জেনে আমার মনে হয়েছে, এটা বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্যপীড়িত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জনজীবনে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটবে।
প্রথম থেকেই এ প্রকল্পে বাগড়া দিচ্ছিল ভারত। ভারতের দাবি, তাদের শিলিগুড়ি করিডরের ‘চিকেন নেক’-এর এত কাছাকাছি তিস্তা প্রকল্পে কয়েকশ বা হাজারের বেশি চীনা নাগরিকের অবস্থানকে ভারত মেনে নেবে না। ভারতের ভেটোকে উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষে চীনের অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ অসম্ভব ছিল। তিস্তা নদী ঐতিহাসিকভাবেই খামখেয়ালি আচরণের একটি নদী, যার বন্যার কবলে পড়ে প্রায় প্রতিবছর বর্ষায় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল একাধিকবার বিধ্বস্ত হয়। শুষ্ক মৌসুমে তুলনামূলক খরাগ্রস্ত এই এলাকার মানুষ তিস্তা নদীর পানিস্বল্পতা হেতু সেচ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত থাকে। তিস্তা নদীর উজানে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় ভারত একতরফা বাঁধ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি সম্পূর্ণভাবে আটকে দেওয়ার পর তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশ বছরের বেশির ভাগ সময় প্রায় পানিশূন্য থাকছে। বলা হয়, এলাকার জনগণের জীবন-জীবিকার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তিস্তা নদী। বাংলাদেশ বন্ধুরাষ্ট্র হলেও একটি আন্তর্জাতিক নদীর উজানে এহেন একতরফা বাঁধ নির্মাণ কিংবা খাল খননের আগে ভারত একবারও বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেনি। বরং দীর্ঘ তিন দশকের কূটনৈতিক আলোচনার পথ ধরে যখন ২০১১ সালে দুই দেশ তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে উপনীত, তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যায় আবদারের কাছে নতি স্বীকার করে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং চুক্তি স্বাক্ষর থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। আমার আশঙ্কা, যতদিন মমতা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন ততদিন ন্যায্য শর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো সম্ভাবনা নেই।
ইতোমধ্যে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার উৎখাত হয়ে গেছে। এর ফলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের মোদি সরকারের সম্পর্ক তেমন বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি হয়তো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এজেন্ডায় অদূর ভবিষ্যতে থাকবেই না। অবশ্য তিস্তা চুক্তি আর প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প মোটেও সাংঘর্ষিক নয়। সংকুচিত নকশায় হলেও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন ওই অঞ্চলের জনগণের জীবন-জীবিকায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। চুক্তি হলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ খানিকটা হয়তো বাড়বে, কিন্তু বর্ষায় গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ায় এ অঞ্চলের জনগণ যে একাধিকবার বন্যায় ডুবছে, তার কোনো সমাধান হবে না। চীন প্রস্তাবিত প্রকল্পের জলাধারগুলোর সংরক্ষিত পানি পরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হলে হয়তো এ সমস্যার টেকসই সমাধান মিলত।
যেহেতু প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী হাত-মোচড়ানোর কাছে নতি স্বীকার করার কথা নয়, তাই আমরা আশা করেছিলাম, অনতিবিলম্বে এ সরকার চীনকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে আমন্ত্রণ জানাবে। কিন্তু সে আশার গুড়ে ইতোমধ্যে বালি পড়েছে। আগামী দিনে এলাকাবাসীকে আবারও হয়তো রাস্তায় আন্দোলনে নামতে হবে প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করার জন্য।
অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত
অর্থনীতিবিদ; সাবেক সভাপতি,
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি
