ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

নির্বাচনী ডামাডোল এবং ‘উন’ মানুষদের কথা

নির্বাচনী ডামাডোল এবং ‘উন’ মানুষদের কথা
×

মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৪ | আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন একেবারেই দোরগোড়ায়। যারা সংবাদপত্রে লেখালেখি করেন স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনই এখন তাদের লেখার প্রধান উপজীব্য। আমিও লিখি। কিন্তু কদিন ধরে যখনই কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে চেষ্টা করি, টেলিভিশন স্ক্রলে দেখি আমার লেখার বিষয়ের চেয়েও দরেদামে গুরুত্বপূর্ণ অন্য বিষয় এসে গেছে। আমার আর লেখা হয়ে ওঠে না।

এই তো তিন দিন আগে (৪ ফেব্রুয়ারি) খবরে দেখলাম নির্বাচন উপলক্ষে নাকি সাতটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন থাকবে। খোদ নৌবাহিনীপ্রধান এ তথ্য দিয়েছেন। শুনে বেশ অবাক হলাম। এখন তো যুদ্ধ হচ্ছে না, একটা সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে। এর জন্য যুদ্ধজাহাজ! যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন একটি স্বাভাবিক বিষয়। কোথাও চার বছর, কোথাও পাঁচ বছর পরপর তা অনুষ্ঠিত হয়। ওইসব দেশে নির্বাচন এলে একটা উৎসবমুখর সাজ সাজ পরিবেশ বিরাজ করে। আমাদের দেশেও অতীতে অনেকবারই তা দেখা গেছে। বিগত তিনটি নির্বাচনে এর ছেদ ঘটেছিল। তাই ত্রয়োদশ নির্বাচনকে উৎসবমুখর করার কথা সরকারসংশ্লিষ্ট সবাই বলছেন। কিন্তু সেখানে যুদ্ধজাহাজের ভূমিকা কী? 

এ নিয়ে যখন একটা লেখার মুসাবিদা করছি ঠিক তখনই দেখি লক্ষ্মীপুরে নির্বাচন কাজে ব্যবহারের সিল (স্ট্যাম্প) তৈরি করে একজন ধরা পড়েছে। সমকালের খবরমতে, ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে শহরের পুরোনো আদালত রোডের মারইয়াম প্রেস থেকে ভোটে ব্যবহারের অবৈধ ছয়টি সিল, একটি কম্পিউটার, একটি মোবাইল ফোনসহ জনৈক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে নেওয়ার পর ধৃত ব্যক্তি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। তাতে সে জানিয়েছে, ‘স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফের নির্দেশে এসব সিল তৈরি করা হয়েছে’ (সমকাল, ৪ ফেব্রুয়ারি)। কী ভয়ানক কথা! যে দলটি আল্লাহর আইন চায়, সেই সঙ্গে চায় সৎলোকের শাসন, সেই দলের লোকেরাই যদি জাল সিল তৈরি করে রাখে নির্বাচনের আগে, তাহলে সাধারণ মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে?

ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই যদি এইরূপ দেখা যায়, ক্ষমতায় গেলে পরে কী হবে ভাবতে ভাবতে যখন মাথাটা আমার ঝিম মেরে আসছিল, তখনই দেখি বরিশালে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক নির্বাচনী সভায় অভিযোগ করেছেন, একটি দল নাকি ইতোমধ্যেই জাল ব্যালট ছাপানো শুরু করে দিয়েছে। একেবারে খাপে খাপ! সিল আর ব্যালট;  আর তো কিছুর দরকার নেই। সাথে যুদ্ধজাহাজ তো আছেই। তবে এটাও তো সত্য, যে দেশে জাল সার্টিফিকেট ছাপা হয়, জাল টাকা ছাপা হয়, জাল সিল তৈরি করা হয়, সেই দেশে নির্বাচনের আগেই যদি জাল ব্যালট ছাপা হয়, তাকে খুব কি দোষ দেওয়া চলে?
এদিকে কাগজে দেখলাম কিশোরগঞ্জে এক মৃত বাবা গেছেন কারাগারে বন্দি ছেলের সঙ্গে দেখা করতে। তা-ই তো যাবেন। কদিন আগে মৃত সন্তান গিয়েছিল কারাগারে বন্দি বাবার সঙ্গে দেখা করতে। যতটুকু জানা গেছে, কোনো মামলায় নাম না থাকলেও গত ১৯ জানুয়ারি এক বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় ইট-বালু ব্যবসায়ী মিলন মিয়াকে (৪০)। বায়বীয় ওই মামলায় জামিন হলেও আবারও আটক করা হয় বিশেষ ক্ষমতা আইনে। তার বাবা ফুল মিয়া (৬৮) ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে। আইনজীবীর মাধ্যমে ছেলে মিলনের প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু মঞ্জুর হয়নি। তবে ভাগ্যই বলতে হবে–অন্তত ফ্রিজিং ভ্যানে করে হলেও মৃত বাবা তাঁর স্থির চোখ দিয়ে কারাফটকে ছেলের দুটি শুষ্ক চোখকে দেখতে পেয়েছেন।
বলা চলে দেশে এখন প্যারোলের এক নতুন সংস্কৃতি চালু হয়েছে। শুধু মৃত ব্যক্তিরাই কারাফটকে আসে কারাবন্দির সঙ্গে দেখা করতে। আমরা এগোচ্ছি।

এই যখন অবস্থা,  তখনই দেখলাম আরেক মর্মান্তিক খবর। রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকার ওয়াপদা বিহারি ক্যাম্পে ঋণের বোঝা টানতে না পেরে এক দম্পতি দুই শিশুসন্তানকে হত্যা করে নিজেরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, শিশুসন্তানদের হত্যার পর বাবা-মা আত্মহত্যা করেছেন। ‎নিহতরা হলেন–মোহাম্মদ মাসুম (৩৫), তাঁর স্ত্রী ফাতেমা আক্তার সুমি (৩০), তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মিনহাজ ও দুই বছর বয়সী ছেলে আসাদ। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে কোনো এক সময় তাদের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, নিহত দম্পতি বিহারি ক্যাম্পের একটি টিনশেড বাসায় ভাড়া থাকতেন। স্বামী রিকশা চালাতেন এবং স্ত্রী বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এ পরিবার বিভিন্ন সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছিল। প্রতিদিন কেউ না কেউ ঋণের কিস্তির জন্য বাসায় আসত। হয়তো কোনো উপায় না পেয়ে পরিবারের শিশুদের নিয়ে স্বামী-স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন।

এমন একটি ভয়াবহ ঘটনা কিন্তু তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই নাগরিক সমাজে। না হওয়াই স্বাভাবিক। প্রথমত এখন নির্বাচনের সময়, এসব গরিব উন মানুষ নিয়ে ক্ষমতাবানদের ভাবনার সময় কোথায়? প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঋণের দায়ে মানুষ গলায় দড়ি দিচ্ছে, না-হয় বিষ খেয়ে মরছে। তাদের কথা ভাবার সময় কারও নেই।

 খবরে দেখলাম গত এক বছরে দেশে ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসবে মোট কত শ্রমিক ছিল তার হিসাব অবশ্য কাগজে আসেনি। তবে টেক্সটাইল খাতের মালিকেরা সংবাদমাধ্যমে দেখলাম ত্রাহি রব তুলেছেন। তাদের অর্ধেক কারখানা নাকি বন্ধ হয়ে গেছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা বাকি কারখানাগুলো বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। শেষে অবশ্য সরকারের আশ্বাস পেয়ে সে পথে তারা হাঁটেননি। কিন্তু মিরপুরের মাসুমের মতো যারা আছেন, তাদের কী হবে? 

আমি নিশ্চিত এসব নিয়ে কেউ ভাববে না। নির্বাচনের শেষে দেশে নতুন নতুন গাড়ি আসবে। নতুন আইন হবে। নতুন রাস্তাঘাট হবে। সেসব নিয়ে পত্রিকায় খবর হবে, কলাম লেখা হবে। কিন্তু ফুল মিয়া, মিলন মিয়া কিংবা মাসুমদের নিয়ে কিছু লেখা হবে না। তারা জন্ম নেয় হারিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা হারিয়ে যাবে। যতক্ষণ না ইতিহাসের সেই নূরলদীনের মতো কেউ একজন ডাক দেবে–‘জাগো বাহে, কোনঠে সবাই’।

মোশতাক আহমেদ: অবসরপ্রাপ্ত জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×