অ্যান্টিবায়োটিক
ওষুধ কি আর রোগ সারাতে পারবে?
তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:৪৩
২০২৬ সালের বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ও অস্তিত্ব রক্ষার সংকটের নাম ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ বা অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকরতা। আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘পোস্ট-অ্যান্টিবায়োটিক এরা’ বা অ্যান্টিবায়োটিক-পরবর্তী যুগ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ২০২৫-২৬ সালের যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭৬.৪% সাধারণ ব্যাকটেরিয়া এখন প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এই ডেটা আমাদের নির্দেশ করে, সাধারণ নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ বা টাইফয়েডের মতো রোগ এখন আর সাধারণ ওষুধে সারছে না। আমরা এমন এক ভয়াবহ বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সামান্য অস্ত্রোপচার বা দাঁতের চিকিৎসাও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল রিসার্চ অন অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের (জিআরএএম) তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ ৫৩ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের খুচরা ফার্মেসিগুলোতে ৮২.৫% ক্ষেত্রে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন– অ্যাজিথ্রোমাইসিন বা সেফিক্সিম) বিক্রি করা হচ্ছে। আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া ৫৩.৮% রোগীর মধ্যে অন্তত একটি ‘মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট’ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই তথ্য নির্দেশ করে যে, আমাদের হাসপাতালগুলোই এখন অপ্রতিরোধ্য জীবাণু বা সুপারবাগের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রভাব কেবল ওষুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে মিশে গেছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের ডেটা অনুযায়ী, পোলট্রি মুরগি এবং গবাদি পশুর খাদ্যে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৬৪.২% অবশিষ্টাংশ রান্নার পরেও মাংস ও ডিমে থেকে যাচ্ছে। এর ফলে এই খাবারগুলো গ্রহণ করে আমাদের অজান্তেই শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে এবং ব্যাকটেরিয়াকে সবল বা প্রতিরোধী করে তুলছে।
বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্যবিষয়ক জার্নাল ল্যানসেট এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক সিমুলেশন মডেল অনুযায়ী, সিজারিয়ান সেকশনে সন্তান জন্মদান এবং অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশনের বর্তমান হার বজায় থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে এ দুই ক্ষেত্রে সংক্রমণের কারণে মৃত্যুহার বর্তমানের চেয়ে প্রায় ৩১৫% বৃদ্ধি পাবে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে ‘লাস্ট রিসোর্ট’ বা শেষ ধাপের অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে পরিচিত ‘কার্বাপেনেম’-এর কার্যকরতা বাংলাদেশে গত তিন বছরে ২৮.৪% হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ চিকিৎসকদের হাতে থাকা শেষ অস্ত্রটিও ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। এই ডেটা আমাদের ইঙ্গিত দেয়, আমরা ১৯ শতকের সেই চিকিৎসা ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি যেখানে পেনিসিলিন আবিষ্কারের আগে মানুষ সামান্য ইনফেকশন বা সংক্রমণে মারা যেত।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কেবল চিকিৎসা সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি। জাতীয় ঔষধনীতির এক উপাত্ত অনুযায়ী, ৯১.৪% মানুষ এখনও জানে না, অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স পূর্ণ না করা বা অপ্রয়োজনে এটি খাওয়া কতটা বিপজ্জনক। স্পষ্টত আমরা এক গণ-অজ্ঞতার সাগরে ডুবে আছি।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব: সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর, অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ, যুক্তরাজ্য ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান: রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; প্রজেক্ট অ্যানালিস্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ
- বিষয় :
- অ্যান্টিবায়োটিক
