ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিস্বর

রাষ্ট্র ও দল হিসেবে কমিউনিকেশনকে মূল্য দিন

রাষ্ট্র ও দল হিসেবে কমিউনিকেশনকে মূল্য দিন
×

ইকরাম কবীর

ইকরাম কবীর

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতার পর থেকেই দেখছি রাষ্ট্র হিসেবে, দল হিসেবে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশে ‘কমিউনিকেশন’ বা গণযোগাযোগ বা যোগাযোগ এখনও যেন অপরিকল্পিত ক্ষেত্র। আমরা অনেক কথা বলি, বিবৃতি দিই, সংবাদ সম্মেলন করি, পোস্টার লাগাই, ব্যানার টাঙাই; কিন্তু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ‘স্থাপন’ করি না। আমার কাছে মনে হয়, যোগাযোগ মানে কেবল তথ্য জানানো নয়। যোগাযোগ মানে আস্থা তৈরি করা, মিস-কমিউনিকেশন কমানো, নাগরিকদের মনস্তত্ত্ব বোঝা, সংকটের সময় সঠিক ভাষায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষকে অনুভব করানো যে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তাদের কথা শুনছে।

আমাদের কমিউনিকেশন অনেক দুর্বল। এটা কোনো অভিযোগ নয়; আমাদের সাংস্কৃতিক, মানসিক ও বেড়ে ওঠার সমস্যার প্রতিফলন। আমাদের রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ একেবারেই একমুখী। সরকার কথা বলে, জনগণ শোনে। একই ধারা চলছে ৫৫ বছর ধরে। নীতিনির্ধারণের আগে জনগণের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা এখানে নেই বললেই চলে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কখনও কখনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়; কিন্তু সিদ্ধান্তের আগে জনসাধারণের সঙ্গে কোনো কথা বলা হয় না। ফলে আমরা নিজেদের সেই সিদ্ধান্তের অংশীদার মনে করি না; দূর থেকে দর্শক-শ্রোতা হয়ে মেনে নিই। এই দূরত্ব থেকেই জন্ম নেয় অবিশ্বাস, গুজব, ক্ষোভ।

সংকটের সময় কমিউনিকেশনের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট। দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জননিরাপত্তার সমস্যা; অর্থনৈতিক চাপের সময় আমাদের প্রধান চাহিদা তথ্য নয়; নিশ্চয়তা। তার বদলে দেখা যায় বিলম্বিত বিবৃতি, বাগাড়ম্বর, পরস্পরবিরোধী তথ্য এবং দায় এড়ানোর প্রবণতা। একটি সুচিন্তিত, মানবিক ও সহানুভূতিশীল বার্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে পারে। অথচ প্রায়ই তা মেলে না। ফলে গুজব ছড়িয়ে যায় এবং সরকারি তথ্যে আস্থা কমে যায়।

ভাষার ব্যবহারও কার্যকর যোগাযোগের বড় সমস্যা। রাষ্ট্রীয় ও দলীয় যোগাযোগে প্রায়ই এমন ভাষা ব্যবহৃত হয়, যা জনসাধারণের জন্য ‘কমিউনিকেটিভ’ নয়। আমলাতান্ত্রিক শব্দ, জটিল বাক্য, আইনি পরিভাষা মানুষের ‘মাথার ওপর দিয়ে’ চলে যায়। বাংলাদেশের ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকা মানুষের জন্য যোগাযোগের ভাষাও তেমন সহজ-সরল হওয়া উচিত। 

রাজনৈতিক যোগাযোগেও আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভাষাকে প্রাধান্য দিচ্ছি; সংলাপমূলক ভাষা থাকছেই না। রাজনৈতিক দলগুলো শুধু সমর্থকদের উদ্দেশে কথা বলে; বিরোধী মতের নাগরিকদের কথা চিন্তাই করে না। বললেও উগ্র ভাষা ব্যবহার করে। ফলে জাতীয় ঐকমত্যের স্থান সংকুচিত হয়ে যায়। সমালোচনা হচ্ছে গণতন্ত্রের শক্তি। ভাষার কারণে সেটা শত্রুতায় রূপান্তর হতে পারে।
তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও কমিউনিকেশনকে অকার্যকর করে রেখেছে। কোনো ঘটনার পর বিভিন্ন দপ্তর থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য আসে। অথচ আধুনিক রাষ্ট্রে তথ্যপ্রবাহ হতে হয় দ্রুত, সমন্বিত ও স্বচ্ছ। সামাজিক যোগাযোগের এই যুগেও আমাদের রাষ্ট্রীয় কমিউনিকেশন এখনও পুরোনো স্টাইলে আটকে আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি থাকলেও ভাষা ও মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেনি। সামাজিক মাধ্যম সংলাপের জায়গা। কিন্তু সেখানে প্রায়ই একমুখী প্রচার দেখতে পাই।

কমিউনিকেশন আমাদের দেশে এখনও ‘কৌশলগত শক্তি’ নয়। উন্নত রাষ্ট্রগুলো বোঝে যে যোগাযোগ কেবল জনসংযোগ নয়; নীতি বাস্তবায়নের অপরিহার্য হাতিয়ার। একটি ভালো নীতি যদি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা না করা হয়, তাহলে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নাও পেতে পারে। বাংলাদেশে নীতির চেয়ে নীতির ঘোষণা বেশি জোরালো; ব্যাখ্যা, অংশগ্রহণ ও প্রতিক্রিয়া শোনার আগ্রহ একেবারেই নেই।
এ দেশে মানবিক যোগাযোগের অভাবও প্রকট; নাগরিকরা কোনো সেবার জন্য কোনো দপ্তরে গেলে প্রায়ই সম্মানজনক আচরণ পান না। একজন সরকারি কর্মকর্তার আচরণ, একজন পুলিশ সদস্যের ভাষা– এসবই রাষ্ট্রের চেহারা। এই চেহারা মানবিক না হলে রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়ে।

আস্থার সংকট কমিউনিকেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ যখন বিশ্বাস করে না; বার্তা যতই সঠিক হোক, তা গ্রহণযোগ্য হয় না। আস্থা তৈরি হয় ধারাবাহিক স্বচ্ছতা, সততা, ভুল স্বীকারের সাহস এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার মাধ্যমে। ভুলকে অস্বীকার বা তথ্য আড়াল করার সংস্কৃতি আস্থা কমিয়ে দেয়।
আমাদের যোগাযোগে স্টোরিটেলিং নেই। সাধারণ মানুষ তথ্যের চেয়ে গল্প মনে রাখে বেশি। রাষ্ট্র যদি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের গল্প তুলে ধরতে পারে; যদি সাফল্যের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জের কথাও খোলামেলা বলে, তাহলে যোগাযোগ জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য হয়। কিন্তু আমরা শুধু পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যস্ত থাকি; মানুষের গল্পগুলো বলিই না।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর নানা আশাবাদ উচ্চারিত হচ্ছে। আমার প্রত্যাশা, কমিউনিকেশনকে ক্ষমতার অস্ত্র হিসেবে না দেখে সেবা হিসেবে দেখা হোক। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নাগরিকদের সঙ্গে পরামর্শের সংস্কৃতি তৈরি হোক। সংকটের সময় দ্রুত, সুনির্দিষ্ট ও সহানুভূতিশীল বার্তা দেওয়া হোক। সহজ ভাষা ব্যবহার এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় হোক। সামাজিক মাধ্যমে সংলাপকে উৎসাহিত করা হোক। এসব পরিবর্তনের জন্য সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় কর্মীদের যোগাযোগ দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক। ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল শুধু আদেশ দেওয়া নয়, নাগরিকের সঙ্গে কথা বলা শিখুক। 

কমিউনিকেশনের মান উন্নত হলে, এর ব্যাকরণ বুঝলে শুধু ভুল বোঝাবুঝি কমবে না, গণতন্ত্রও শক্তিশালী হবে। সামাজিক আস্থা বাড়বে, নীতি বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক সুন্দর হবে।
নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে– ভোট পেয়েছেন মানেই জনগণের কথা শুনে ফেলেছেন; তা নয়। পরিবর্তন যদি সত্যিই চান, তাহলে যোগাযোগের সংস্কৃতিও পরিবর্তন করুন। কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন মানুষ বুঝতে পারে যে, রাষ্ট্র তার সঙ্গে কথা বলছে, তার কথা শুনছে এবং তাকে সঙ্গে নিয়েই এগোচ্ছে।

ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক; যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত
[email protected]

আরও পড়ুন

×