ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সুশাসন

সামাজিক কাঠামো শক্তিশালী করতে হলে

সামাজিক কাঠামো শক্তিশালী করতে হলে
×

শেখ নাহিদ নিয়াজী

শেখ নাহিদ নিয়াজী

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

গণঅভ্যুত্থানের পর গত ১৮ মাস বাংলাদেশ একটি জটিল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একটি দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে গভীর রাজনৈতিক মেরূকরণ, আস্থার সংকট/ক্ষয় এবং ক্রমবর্ধমান জননিরাপত্তাহীনতা বা উদ্বেগ মিশ্রিত একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষ একটি স্বাভাবিক সরকার পেয়েছে। এটি অবশ্যই স্বস্তির ব্যাপার। তবে নাজুক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে হলে নাগরিকদের বা জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধার যেমন প্রয়োজন, তেমনি সামাজিক কাঠামোর পুনর্গঠন ও শক্তিশালীকরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না; টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও অধরা থেকে যাবে।

সামাজিক কাঠামোকে (সোশ্যাল ফেব্রিক) নাগরিক সম্পর্কের নেটওয়ার্ক, মূল্যবোধ, নানা সম্প্রদায়ের আস্থা এবং সামাজিক সংহতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে তুমুল রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অধ্যাপক ইউনূসের সরকার দায়িত্ব নিয়ে গুরুতর টালমাটাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে আংশিক সফল হলেও তারা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আর্থিক ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ-বহিরাগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রেখে গেছেন। 

দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘর্ষ ‘ক দল বনাম খ দল’-এর মতো একটি হিংসাত্মক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যা সামাজিক ঐক্যকে ধ্বংস করেছে। এ ধরনের বিপজ্জনক মেরূকরণ সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করেছে এবং বছরের পর বছর ধরে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়িয়েছে। তাই মূল সংকট কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নয়; এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে এবং নাগরিকদের নিজেদের মধ্যে আস্থার গভীর অভাবকে নির্দেশ করে। সমাজের অভ্যন্তরে গোষ্ঠীতান্ত্রিক স্বার্থ হাসিল, অসহনশীলতা এবং অনুদারনৈতিক মূল্যবোধ রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রতিফলিত, যা দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, শাসনতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। 

সোশ্যাল ফেব্রিক (সংযুক্তি, সংহতি, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের অনুভূতি) সমাজকে একত্র করে রাখার ‘আঠা’ হিসেবে কাজ করে এবং সামাজিক বা সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা ও উগ্রবাদ রোধ করে। একটি সামাজিকভাবে সংহত সম্প্রদায় অর্থনৈতিক ধাক্কা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতি আরও স্থিতিস্থাপক হয়। একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য এমন সব মানুষের প্রয়োজন যারা প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য ক্ষমতায়িত বোধ করে। নাগরিক-বান্ধব, মানবতাবাদী রাজনীতি ছাড়া যে কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভঙ্গুর বা ফাঁপা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। 

দশকের পর দশক ধরে ‘পেট্রন-ক্লায়েন্ট’ রাজনীতি এবং কর্তৃত্ববাদী মনোভাব সমাজের ভেতরে গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পুলিশ, আমলাতন্ত্র এবং বিচার বিভাগের ওপর জনসাধারণের আস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে জাতীয় পুনর্মিলনের (রিকনসিলিয়েশন) দিকে এগিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ এই নতুন সরকারের রয়েছে। অন্যথায় রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া আবারও বিপন্ন হতে পারে। 

জনসংখ্যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশের বয়স ৩০ বছরের কম। বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব এবং পর্যাপ্ত কাজের সুযোগের অভাব যুবসমাজের মধ্যে গভীর হতাশা ও সামাজিক অস্থিরতাকে ইন্ধন জোগায়। অতএব, কর্মসংস্থান সৃষ্টি নতুন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। 

নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করার জন্য নবগঠিত সরকারের উচিত হবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনাকে সংকীর্ণ ধর্মীয় পক্ষপাত অতিক্রম করতে হবে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা জোটের উচিত এটি নিশ্চিত করা– গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অনুশীলন এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সমাজের সকল অংশের প্রতিনিধিত্ব বিদ্যমান। 

স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন ও জবাবদিহি অপরিহার্য। জাতীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে একটি পুনরুজ্জীবিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্পষ্টতই স্থানীয় নির্বাচনকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে, যেখানে নাগরিকরা বা সম্প্রদায়গুলো বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহি আদায় করতে পারবে। সংলাপের মাধ্যমে জনসাধারণের আস্থা পুনর্গঠন একটি অব্যাহত অনুশীলন হওয়া উচিত। নতুন সরকার এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতাদের অবশ্যই শালীন ভাষা ব্যবহার করতে হবে এবং সাংস্কৃতিক বিভাজন দূর করতে রাজনৈতিক অনুশীলনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হবে।
নাগরিক সমাজকে ‘জাতির বিবেক’ হিসেবে কাজ করতে হবে এবং মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলতে হবে। এ ছাড়া নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে (সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী বা বুদ্ধিজীবী সংগঠন) অবশ্যই দলীয় রাজনীতিতে (রাজনৈতিক দাসত্ব) জড়িত না হয়ে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল থাকতে হবে, যাতে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

নবনির্বাচিত সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখার জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি এবং শ্রমজীবী ​​মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান দূর করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে একটি ‘টেকসই গণতান্ত্রিক সুশাসন’ মডেল প্রতিষ্ঠা করা। 

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জনসাধারণের আস্থা হারিয়ে ফেলে তখন গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়। পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর ওপর আস্থার ক্ষয় হওয়ার অর্থ– রাষ্ট্র বা সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে ‘সামাজিক চুক্তি’ পুনর্গঠন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুসংহত সমাজ একটি ‘জবাবদিহির নেটওয়ার্ক’ তৈরি করতে পারে, যা নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক নেতা উভয়কেই জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে। এভাবেই জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। 
দুর্ভাগ্যবশত, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করার তীব্র উত্তেজনা এবং ভয় দেখা যায়। প্রকৃত গণতান্ত্রিক বৈধতা সংখ্যালঘুসহ সকল নাগরিকের নিরাপদ বোধ করার ওপর নির্ভর করে; রাষ্ট্রক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন। একটি সুস্থ, সামাজিক কাঠামো নাগরিকের নিরাপত্তাকে অধিকার হিসেবে গণ্য করে; কোনো রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে নয়।

শেখ নাহিদ নিয়াজী: সহযোগী অধ্যাপক; ইংরেজি বিভাগ; স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
[email protected] 
 

আরও পড়ুন

×