ভাষা
নৃগোষ্ঠী ভাষা বিপন্নতার নীরব পথঘাট
চারু হক
চারু হক
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাঙামাটির প্রার্থনা আসামের বয়স ২০র কোঠায়। তাঁর মা চাকমা, বাবা অহমিয়া ভাষার মানুষ। বাড়িতে ছোটবেলায় মা তাঁকে চাকমায় গল্প শোনাতেন, বাবা মাঝে মাঝে অহমিয়ায় গান ধরতেন। কিন্তু প্রার্থনা নিজে এখন যে ভাষায় স্বচ্ছন্দ, সেটি বাংলা। শিক্ষালয়ে বাংলা, বন্ধুদের সঙ্গে বাংলা, সামাজিক মাধ্যমে বাংলা। চাকমা বুঝতে পারে; অহমিয়া কানে পরিচিত লাগে, কিন্তু কোনোটাতেই সে পুরোপুরি বাস করে না। ধীরে ধীরে সে এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে, যারা দুই ভাষার উত্তরাধিকার নিয়ে জন্মায়, কিন্তু জীবন কাটায় তৃতীয় এক ভাষায়। প্রার্থনা আসামের এই গল্প ব্যক্তিগত হলেও এটা এখন এ দেশের নৃগোষ্ঠী ভাষার এক সাধারণ সামষ্টিক বাস্তবতা।
বাংলাদেশে ভাষা বিপন্নতার আলোচনা সাধারণত সংখ্যার ভেতর আটকে থাকে– কতটি ভাষা আছে; কতটি বিলুপ্তির পথে; কোন ভাষায় কতজন বক্তা অবশিষ্ট। কিন্তু ভাষা কখনও শুধু পরিসংখ্যান নয়। ভাষা হলো ব্যবহার; ঘরের ভেতরের স্বর। দাদির গল্প, ঝগড়ার শব্দ, প্রেমের গোপন বাক্য। এই জায়গাগুলোতে ভাষার ব্যবহার কমে গেলে ভাষা বিপন্ন হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে সেটা ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সুবাদে আগে যে ভাষাগুলোকে চরম বিপন্ন বলা হয়েছিল, সেই তালিকার বাইরে আরও কয়েকটি ভাষা কার্যত একই ঝুঁকির ঘরে ঢুকে পড়েছে। অবশ্য এটা কোনো পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ জরিপের দাবি নয়। বরং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে; পরিবারে কথা বলে; প্রজন্মান্তরের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে যে বাস্তবতা চোখে পড়েছে, সেটির সংক্ষিপ্ত রূপ। বাস্তবতা হলো, ভাষা হারানো এখন আর দূরের আশঙ্কা নয়; ঘরের ভেতরের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার একটি বড় কারণ আন্তঃজাতি বিয়ে। কাগজকলমে এটি সামাজিক অগ্রগতি, বৈচিত্র্যের মিলন। কিন্তু ভাষার ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল। যখন একজন ত্রিপুরা পুরুষ একজন মারমা নারীকে বিয়ে করেন; সন্তানের জাতিগত পরিচয় সাধারণত পিতার নামে নির্ধারিত হয়। কিন্তু ভাষা শেখার ক্ষেত্রে মা প্রাথমিক প্রভাব রাখেন। ফলে সন্তানের পরিচয় ও ভাষার মধ্যে এক ধরনের ফাঁক তৈরি হয়। আবার অনেক পরিবারে দুজনেই আলাদা ভাষাভাষী হওয়ায় তারা ঘরে একটি তৃতীয় ভাষা বেছে নেন, যাতে দুজনেই স্বচ্ছন্দ। চা-বাগান অঞ্চলে এই তৃতীয় ভাষা সাদরি। অন্যত্র বাংলা। সন্তান তখন এই ‘কমন’ ভাষাকেই নিজের প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে। বাবা-মায়ের ভাষা থাকে স্মৃতির মতো, প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য কিন্তু দৈনন্দিন নয়। এভাবে ভাষা পরিবার থেকে বেরিয়ে টিকে থাকে আনুষ্ঠানিক পরিচয়ে।
ভাষা টিকিয়ে রাখতে হলে ঘরের ভেতর তার নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার দরকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিশুদের ভাষিক জগৎ এখন গড়ে ওঠে পাঠ্যবই, পরীক্ষা আর সহপাঠী-সঙ্গের মাধ্যমে। খাতা-কলমের ভাষা বাংলা। ক্লাসরুমে মাতৃভাষার জায়গা প্রায় নেই। ২০১৭ সাল থেকে পাঁচটি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরে বই ও শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, ওঁরাও ভাষায় পাঠ্যবই তৈরি হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী, অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যেও দ্বিধা থাকায় মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম আশানুরূপ সাফল্য পায়নি। অনেক অভিভাবক ভাবেন, মাতৃভাষায় পড়লে সন্তান পিছিয়ে পড়বে।
আন্তঃজাতি বিয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি অনালোচিত বিষয়– জাতিকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী নিয়মনীতির অবহেলা। একসময় প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক বিধি ছিল। বিয়ে, উৎসব, শোক, কৃষিকাজ, আচার, সবকিছুর সঙ্গে ভাষা জড়িত ছিল।
ভাষা শুধু কথোপকথন নয়; ছিল রীতির ধারক। এখন সেই রীতিগুলো ভেঙে পড়ছে। আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো, বাজার অর্থনীতি এবং মূলধারার সংস্কৃতির প্রভাবে ঐতিহ্যগত পরিসর সংকুচিত হয়েছে। যখন উৎসব কমে যায়, আচার সহজ হয়; গান হারিয়ে যায়, তখন ভাষার ব্যবহারও কমে যায়। কারণ, ভাষা তখন আর প্রয়োজনীয় থাকে না। প্রয়োজনের জায়গা থেকে ভাষা সরলে তার মর্যাদা থাকে স্মৃতিতে; প্রতিদিনকার জীবনে নয়।
বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিষ্টান মিশনারি কার্যক্রমের ফলে অধিকাংশ নৃগোষ্ঠীই ধর্মান্তরিত। ধর্মান্তর নিজে সমস্যা নয়। সমস্যা হয় যখন নতুন ধর্মীয় চর্চা পুরোনো রীতিকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন ধর্মীয় অনুশীলনে স্থানীয় ভাষার বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলা বা ইংরেজি। প্রার্থনা, গীত, ধর্মীয় পাঠ– সবই অন্য ভাষায়। ধীরে ধীরে পরিবারে সেই ভাষার গুরুত্ব বাড়ে। ফলে নিজস্ব ভাষা পিছিয়ে পড়ে। প্রজন্মান্তরে শিশুরা মনে করে, তাদের ভাষা ঘরোয়া ও অনানুষ্ঠানিক; বাংলা বা ইংরেজিই উন্নত। ভাষা তখন শুধু যোগাযোগের নয়, মর্যাদার প্রশ্নেও হারতে থাকে।

আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। পরিবার চায় সন্তান সরকারি চাকরি পাক, শহরে যাক; অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হোক। সেই লক্ষ্য পূরণে বাংলা ও ইংরেজি অপরিহার্য। ফলে বাড়িতে সচেতনভাবে শিশুদের সঙ্গে বাংলায় কথা বলা হয়। মাতৃভাষা তখন আদিম আবেগের জায়গায় থাকলেও আগামীর প্রশ্নে প্রভাব হারিয়ে ফেলে।
ভাষা চর্চায় না থাকলে তা দিনে দিনে দুর্বল হয়। দুর্বল হলে সংকোচ তৈরি হয়। তারপর আসে আত্মসমর্পণ। কেউ কেউ সরাসরি বলেন, ‘ঘরের বাইরে তো এই ভাষা লাগে না।’ ভাষা যদি শুধু ঘরের কোণে আটকে যায়, তবু টিকে থাকতে পারত। কিন্তু এখন ঘরেও তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। এই সংকটের আরেকটি দিক হলো পরিচয়ের পুনর্নির্মাণ। নতুন প্রজন্ম নিজেদের প্রথমে জাতীয় নাগরিক হিসেবে দেখে, তারপর জাতিগত পরিচয়। এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু যখন জাতিগত পরিচয় সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন ভাষা সবার আগে আঘাত পায়। কারণ, ভাষা ছাড়া নৃতাত্ত্বিক পরিচয় কাগজে থাকলেও বাস্তবে হারিয়ে যায়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ভাষা বদলানো কি সবসময় ক্ষতিকর? ইতিহাসে ভাষা বদল হয়েছে, নতুন ভাষা এসেছে। ঠিক। কিন্তু একটি ভাষার বিলুপ্তি মানে একটি জগতের বিলুপ্তি। কারণ প্রতিটি ভাষায় থাকে পৃথিবী দেখার আলাদা পদ্ধতি; প্রকৃতি বোঝার আলাদা শব্দভান্ডার; আত্মীয়তার আলাদা মানচিত্র। যখন একটি ভাষা হারায়, আমরা কেবল শব্দ হারাই না, হারাই একটি দৃষ্টিভঙ্গি। উন্নয়নের নামে যদি আমরা সব ভাষাকে একটি বড় ভাষায় গলিয়ে ফেলি, তাহলে বৈচিত্র্যের বদলে একরঙা আবহ পাই। আর এটাই দীর্ঘ মেয়াদে সাংস্কৃতিক দরিদ্রতা তৈরি করে।
আইন করে ভাষা বাঁচানো যায় না, যদি পরিবারে তা ব্যবহৃত না হয়। আবার পরিবারকে দায়ী করাও অন্যায়, যদি রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভাষাকে মূল্য না দেয়। প্রয়োজন দ্বিমুখী উদ্যোগ। শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষার কার্যকর অন্তর্ভুক্তি; শিক্ষক প্রশিক্ষণ; পাঠ্যবইয়ের মানোন্নয়ন; সবচেয়ে বড় কথা, মাতৃভাষাকে পিছিয়ে পড়ার প্রতীক না বানানো। পিতামাতার বোঝা দরকার- একই সঙ্গে দুই বা তিন ভাষা শেখা শিশুর জন্য বোঝা নয়, বরং সম্পদ।
প্রার্থনা আসামদের প্রজন্ম এখন সন্ধিক্ষণে। তারা বহুভাষিক বাস্তবতায় বড় হচ্ছে, কিন্তু কোনো ভাষায় পুরোপুরি নিবিষ্ট নয়। তাদের হাতে আছে সম্ভাবনা, আবার ঝুঁকিও। যদি আমরা এখনও ভাবি, ভাষা শুধু উৎসবে বক্তৃতার বিষয়, তাহলে কয়েক দশক পর হয়তো আরও কিছু ভাষা থাকবে শুধু গবেষণাপত্রে; মানুষের মুখে নয়।
আমরা ভাবি, যা কিছু করছি তা নিজের সুবিধার জন্যই; নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য করছি। কিন্তু ভবিষ্যৎ যদি নিজের শিকড় ভুলে যায়, সে কতদূর যাবে– প্রশ্নটা রোমান্টিক নয়; বাস্তব। কারণ, শিকড় কেটে দিলে গাছ কিছুদিন দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠী ভাষাগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা খুব সম্ভব সর্বনাশের সেই মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছি।
চারু হক: গবেষক ও অনুবাদক
[email protected]
