ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দেশে ঘন ঘন ভূমিকম্প বড় দুর্যোগের বার্তা

দেশে ঘন ঘন ভূমিকম্প বড় দুর্যোগের বার্তা
×

সৈয়দ ফারুক হোসেন

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১৩:৪৬ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১৩:৪৬

ফেব্রুয়ারিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এটির উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরায়। এটি নিয়ে গত ১৩ মাসে দেশে ৩২টি ছোট-বড় ভূমিকম্প হলো, যা বড় ভূমিকম্পের সংকেত দেয়। গত ২৫ দিনে তিনবার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এ অঞ্চলটি দেশের কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। জানুয়ারি মাসেও বেশ কয়েকটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পে সারাদেশে প্রায় ১০ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে শতাধিক।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বলছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৫। তবে ইউরোপিয়ান ইএমএসসির মতে, ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদীতে ছিল। ভূমিকম্পটির স্থায়িত্ব ছিল ২৬ সেকেন্ড। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে এটিই অনুভূত হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন, এমন তীব্র ভূমিকম্প এর আগে কখনও দেখিনি।

এ বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সাত দিনে দেশে দুবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জানুয়ারি সকালে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্প ছিল অপেক্ষাকৃত বড়। আর গত ৩ জানুয়ারি হওয়া ভূমিকম্পটি ছিল মাঝারি মাত্রার। এক সপ্তাহে দেশে দুবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার ঘটনা দেশকে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূমিকম্পে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের তালিকায় ঢাকা অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমিকম্পের আঘাত উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে দেখা গেছে।

অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে ভূমিকম্প এক মহা প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম। সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাপক ভূমিকম্পের ঝুঁকির মুখোমুখি। এখানকার ঘনবসতি, পুরোনো অবকাঠামো এবং বিল্ডিং কোডের দুর্বল প্রয়োগ এই বিপদগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অবিলম্বে পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতের জন্য একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। ভৌগোলিকভাবে নাজুক অবস্থানের কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। যে কোনো সময় ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়। কারণ, বাংলাদেশ অবস্থান করছে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং মিয়ানমারের টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে।

বেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইনসহ টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান দেশটিকে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিতে ফেলেছে। ঐতিহাসিকভাবে, এই অঞ্চলে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছে, ১৮৬৯ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে পাঁচটি বড় ঘটনা রিখটার স্কেলে ৭-এর ওপরে রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর থেকে উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প স্তিমিত হয়ে আসছে। মূলত ভূমিকম্পের বিপর্যয়ের আগে এই নীরবতা থাকতে পারে। ২০২৪ সাল থেকে রেকর্ড করা ৬০টি ভূমিকম্পের মধ্যে তিনটি ৪ মাত্রার ওপরে এবং ৩১টি ৩ থেকে ৪ মাত্রার মধ্যে ছিল। এই ঊর্ধ্বগতি, শহর এলাকায় বিস্তৃত এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত জাতিকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে তুলে ধরছে।

ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশে বারবার আঘাত হানে। প্রতিবছরই কোনো না কোনো দুর্যোগ বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। ভূমিকম্পে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল তুরস্ক ও সিরিয়া। প্রতিদিনই শত শত নতুন মৃত্যু যুক্ত হয়েছিল।

বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা অনুমান করা অসম্ভব। ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস নেই, যার কারণে মানুষ সতর্কতামূলক কোনো পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে না। বড় ধরনের ভূমিকম্পে হলে বাংলাদেশের অসংখ্য ঘরবাড়ি ধসে পড়বে; রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ ভেঙে পড়বে; মানুষসহ অসংখ্য প্রাণী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে, অনেক মানুষ দেয়াল চাপা পড়ে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করবে। তাছাড়া জীবনধারণের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ধ্বংস হয়ে পড়বে। এককথায় আমরা বলতে পারি যে, যদি কখনও বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয় তাহলে সারাদেশ একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।

ভূমিকম্পের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে আমরা যে ভবনটিতে থাকি সেই ভবনটি ভূমিকম্পরোধক কি না তা জানতে হবে, থাকলে কত মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় এবং না থাকলে দুর্বল ভবনে রেট্রোফিটিংয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। বিছানার পাশে সব সময় টর্চলাইট, ব্যাটারি ও জুতা রাখতে হবে। প্রতি বছর পরিবারের ‘ফোরশক’ এবং আফটার শক। এ সময়ও সতর্ক থাকতে হবে। কেননা, ‘আফটার শক বা ‘ফোরশক’ থেকেও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। প্রথম ভূমিকম্পের সময় সম্ভব না হলেও পরে গ্যাস ও বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করে দেওয়া।

ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়লে যা যা করণীয় সেগুলোর ব্যাপারে সজাগ থাকাও জরুরি। হাতে রুমাল, তোয়ালে বা চাদর থাকলে হালকাভাবে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন। যাতে ধ্বংসস্তূপের ধুলাবালি নাকে, মুখে প্রবেশ করতে না পারে। হাতে টর্চ থাকলে জ্বালান, ম্যাচ না  জ্বালানো। কেননা, গ্যাসের পাইপ লিক থাকলে আগুন লেগে যেতে পারে। কাউকে চিৎকার করে না ডেকে মুখে শিস বাজিয়ে, হাতে রেফারির বাঁশি থাকলে বাঁশি বাজিয়ে অথবা কোনোকিছুতে শব্দ করে ডাকা। এতে মুখে ধুলাবালি প্রবেশ করবে না। সকল প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিকম্প সবচেয়ে বেশি বিধ্বংসী। এই বিধ্বংসী ভূমিকম্পের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় বা পূর্বাভাস নেই।

ভূমিকম্প রেখার ঝুঁকিপূর্ণ সীমানার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান। তাই আমাদের শক্তিশালী। ভূমিকম্পের বিপর্যয় মোকাবিলা করতে সকল প্রকার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। বাংলাদেশে অনেকবার বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এতে জানমালের তেমন ক্ষতি না হলেও বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে বাংলাদেশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। সুতরাং বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে এখনই ভবন নির্মাণের জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও দুর্বল স্থাপনাসমূহ চিহ্নিতকরণপূর্বক ভেঙে ফেলতে হবে। প্রতিটি বিপর্যয়ের ধরন আবার আলাদা রকমের। পৃথিবীর ওপরে আঘাত হানতে পারে বহু প্রাকৃতিক বিপর্যয়। যার জেরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আমাদের পৃথিবী। পৃথিবীতে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে চলেছে।

অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের বেলায় আগে থেকে বোঝা গেলেও ভূমিকম্প এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে যায় এই বিশাল দুর্যোগ, যার ফলে পূর্ব সতর্কতা নেওয়া সম্ভব হয় না। এর ফলে ক্ষয়ক্ষতিও হয়ে থাকে। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন তাই ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও সচেতনতার বিকল্প নেই। দেশে ঘন ঘন ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার ঘটনা দেশকে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূমিকম্পে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের তালিকায় ঢাকা অন্যতম। শুক্রবারের ভূমিকম্প ও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমিকম্পের আঘাত উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে দেখা গেছে। একমাত্র প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিই পারে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে ভূমিকম্প সহনশীল দেশ গড়তে।

সৈয়দ ফারুক হোসেন: লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি

আরও পড়ুন

×