ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী

এটা নেতানিয়াহুর যুদ্ধ, ভারতের নয়

এটা নেতানিয়াহুর যুদ্ধ, ভারতের নয়
×

এম. কে. ভদ্রকুমার

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি ভারতীয় একটি জাতীয় দৈনিক সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছে, মোদি সরকারের উচিত ‘ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে আরও জোরালো অবস্থান নেওয়া এবং সংঘাতের উত্তেজনা কমাতে অন্য বলয়গুলোর সঙ্গে কাজ করা। ভারতেরও উচিত যুদ্ধকে তার বাড়ির উঠোনে নিয়ে যাওয়ার মার্কিন চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করা।’

এই ধরনের পরামর্শ জরুরি। কেননা, এই লক্ষণগুলো ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে, নয়াদিল্লি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণকারী ইহুদি লবির মধ্যে বন্দি। ১০ দিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অসময়ে ইসরায়েল সফর পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের আঞ্চলিক নীতিতে স্পষ্টতই ইসরায়েলপন্থি ঝোঁক তৈরি করেছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে একটি আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর মতামত থাকবে। এর অর্থ হলো, তেহরানে একজন নমনীয় ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্পের শিরশ্ছেদ কৌশল অব্যাহত থাকবে, যদিও এর মধ্যে খামেনির ছেলে নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়েছেন। ট্রাম্পের এ ধরনের কৌশল নেতানিয়াহুর দীর্ঘস্থায়ী এজেন্ডার সঙ্গে মিলে যায়, যিনি ইরানকে ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছক থেকে সরিয়ে তার বৃহত্তর ইসরায়েলের ইহুদিবাদী এজেন্ডার প্রধান বাধা হিসেবে দেখেন। এপস্টেইন ফাইলের কারণে ট্রাম্প ইসরায়েলি ব্ল্যাকমেইলের ঝুঁকিতে আছেন। কিন্তু ভারতের স্বার্থের সঙ্গে এগুলো কীভাবে যুক্ত হয়?

হায়, দিল্লির একটা কেন্দ্রীয় লক্ষ্য রয়েছে। পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান শশী থারুর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার জন্য তাঁর ভিশন ঠিক করেছেন। কেরালার রাজ্য শাখার বিজেপি সভাপতি রাজীব চন্দ্রশেখর বিরোধী দলগুলোর ‘ইরান আক্রমণের জন্য শুধু মার্কিন-ইসরায়েলের নিন্দা করে রাজনৈতিক ইসলাম প্রচার করা’র ‘নির্লজ্জ রাজনীতি’র সমালোচনা করেছেন। 

তবে দিল্লির শাসকগোষ্ঠীর পায়ের তলার মাটি নড়বড়ে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্লুমবার্গ প্রতিবেদন বলেছে, ইসরায়েলে থাকাকালীন মোদির স্পষ্টতই ইসরায়েলপন্থি মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ইন্দোনেশিয়ার কয়েকজন আইন প্রণেতা। তারা ভারতের দুটি শীর্ষস্থানীয় নির্মাতার সঙ্গে ১ লাখ ৫ হাজার ট্রাকের অর্ডার স্থগিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আতঙ্ক ভারত সরকারকে উদ্বেগে ফেলে দিয়েছিল। ব্রেন্ট প্রতি ব্যারেল ৮৩ ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ট্রাম্প আর তেলের উচ্চ মূল্য নিয়ে চিন্তা করছেন না। কিন্তু তিনি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কৌশলী পদক্ষেপ নিয়েই চলেছেন। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সামাজিক মাধ্যমে ৩০ দিনের ছাড়ের ঘোষণার বার্তা একই। এর ফলে ভারত পুনরায় রাশিয়ায় তেল কেনার সিদ্ধান্তে ফিরে আসছে। আবার এর বিপরীত দিকও রয়েছে। কৌশলগত প্রভাব হলো, যুক্তরাষ্ট্রও এই ছাড় স্থগিত রাখতে পারে। দিল্লি কি এ ধরনের ছাড় চেয়েছিল, নাকি ওয়াশিংটনের ইহুদি লবিকে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করেছিল– স্পষ্ট নয়। তবে যেভাবেই হোক পুরো পরিস্থিতি অপমানজনক।

ইতোমধ্যে বিশাখাপত্তনম থেকে মার্কিন পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের বহুপক্ষীয় নৌ ইভেন্টে অংশগ্রহণের পর ফিরে আসা ইরানি ফ্রিগেট সম্পর্কে সংবেদনশীল প্রশ্ন উঠেছে। ভারতীয় ও আমেরিকান পক্ষের মধ্যে দ্বিপক্ষীয়ভাবে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির সুযোগ কি মার্কিনিরা নিয়েছে? ইতোমধ্যে ৮৭ জন ইরানি নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।

ভারতকে ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ পরের দিনই শ্রীলঙ্কা অনুকরণীয় নৈতিক সাহস দেখিয়েছিল এবং ২০০ জনেরও বেশি নাবিক নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই ইরানি জাহাজের বিপদের ডাকে সাড়া দেয়। আর নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন দাবি করে এবং ইরানি জাহাজকে ত্রিণকোমালি বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দিয়েছিল। দৃশ্যপট সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না। তবে সব ধরনের রহস্যের মূল কারণ হলো, কেন সরকার ২৮ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পিতভাবে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে নীরবতা পালন করেছিল। সহজ কথায়, দিল্লি প্রকাশ্যে ইসরায়েলের নিন্দা করতে চায়নি।

ছয় দিন পর অনিচ্ছাকৃতভাবে সংশোধনের মাধ্যমে সরকার ইরানি দূতাবাসের শোক বইতে স্বাক্ষর করার জন্য পররাষ্ট্র সচিবকে দায়িত্ব দেয়। কিন্তু ক্ষতি তো হয়েই গেছে। বড় প্রশ্ন হলো, বিজেপি সরকারের ক্রোধ অর্জনের জন্য তেহরান কী করেছে?

অন্যদিকে, মোদি কিছু উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সমবেদনা জানাতে তড়িঘড়ি করে যোগাযোগ করেন এবং তার প্রতিপক্ষদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে টেলিফোনে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ক্ষয়ক্ষতির নিন্দা জানান। সম্ভবত এটি ছিল একটি কূটনৈতিক কৌশল, যার উদ্দেশ্য আরবদের মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষে টেনে আনা। বিপরীতে মার্কিন বিমান হামলায় ১৫০ জনেরও বেশি ইরানি ছাত্রী নিহত হওয়ার ঘটনায় নীরব থেকেছে। জাতিসংঘ এই হত্যাযজ্ঞকে ‘মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে।
দিল্লির উচিত পূর্ববর্তী ইতিহাস এবং স্বতঃসিদ্ধ সত্যের ওপর ভিত্তি করে যৌক্তিক অবস্থানে থাকা এবং এই অর্থহীন যুদ্ধকে কমিয়ে আনার জন্য সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করা। যাই হোক না কেন, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে যুদ্ধকে বিস্তৃত করার মার্কিন চেষ্টার বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার প্রতিক্রিয়াকে ভারতের প্রশংসা করা উচিত। অবশ্যই এটি নেতানিয়াহুর যুদ্ধ; আমাদের নয়।

এম কে ভদ্রকুমার: ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ইন্ডিয়ান পাঞ্চলাইন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×