ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী

নেপালের নতুন নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ

নেপালের নতুন নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ
×

নেপালের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন বালেন্দ্র শাহ

স্মৃতি এস পট্টনায়েক

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ১৫:২২

দক্ষিণ এশিয়ার আন্দোলনগুলো নজরকাড়া ফলাফল এনেছে। একসময় শ্রীলঙ্কায় রেডিকেল বামপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিল জেভিপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি)। দলটি ‘আরাগালায়া প্রতিবাদ আন্দোলন’ পুঁজি করে প্রচলিত রাজনৈতিক অভিজাত এবং তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছিল। বিক্ষোভের পর এনপিপি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে। ২০২২ সালের গোড়ার দিকে ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়াকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, যিনি জনরোষ থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

একইভাবে বাংলাদেশে শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের মতো দলকে উৎখাত করে, যারা ১৭ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল। তরুণদের আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই আন্দোলনের পুরোভাগে নেতৃত্ব দেন তরুণ শিক্ষার্থীরা, যারা পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি নামে একটি পৃথক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তবে, তাদের নির্বাচনী ফলাফল খারাপ ছিল এবং তারা দেশের প্রধান ধর্মপন্থী একটি দল জামায়াত ইসলামীর নির্বাচনী অংশীদার হিসেবে ৩০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৬টিতে জয়লাভ করতে পেরেছে।

ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কার মতো নেপালের জেনজি আন্দোলন কেবল পুরনো রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেই নয়, বরং নির্বাচনীভাবে তাদের ধ্বংস করেও পথ প্রশস্ত করেছিল। মাওবাদী নেতা পুষ্প কমল দহল প্রাচণ্ড ছাড়া অন্যান্য বড় বড় নেতাদের সবাই নির্বাচনে হেরে গেছেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ জামানতও হারিয়েছেন। এরই মধ্যদিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, কিভাবে মানুষ তাদের ‘নয়া নেপাল’-এর প্রতিশ্রুতির উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির উপর কোনও প্রভাব ফেলেনি।

দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই যুবসমাজ একটি চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। লাভজনক কর্মসংস্থান ও দুর্নীতিমুক্ত সরকারের আকাঙ্ক্ষা তিনটি দেশেই একটি নতুন সূচনার আশাকে তুলে ধরেছে, যেখানে যুবসমাজ রূপান্তরমূলক রাজনীতির জন্য লড়াই করেছিল। নেপালের নির্বাচন দেখিয়েছে যে, প্রথমবারের মতো নেপালের সংসদে ৩৭ শতাংশ সংসদ সদস্য যুক্ত হয়েছে, যাদের বয়স ৪০ বছরের কম।

রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ১২৫টি আসন নিয়ে হাউসের সবচেয়ে বড় দল হয়ে উঠেছে। তাছাড়া আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দিক থেকেও তাদের অবস্থান নজরকাড়া। প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো নেপালে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে, যা আরএসপিকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য পরিবর্তন ও সমন্বয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। 

গত দুই দশক ধরে নেপালের রাজনীতি কীভাবে দর কষাকষির মধ্যদিয়ে এগিয়েছিল, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কিছু রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কোনো কিছু বাদ রাখেননি। আশা করা যায়, এটি বালেন্দ্র শাহকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সমস্যায় মনোযোগ দিতে সুযোগ দেবে। কারণ, তরুণরা তার ওপর আস্থা এনে এতবড় পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং তিনি তরুণদের সেই আকাঙক্ষার গুরুত্ব দেবেন। 

প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে তরুণ নেপালিদের জন্য দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। নেপালের বেকারত্বের হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ, যা ২০.৬ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় চাকরি হ্রাস পাচ্ছে, বেসরকারি খাতের চাকরি তরুণদের এই বিশাল সংখ্যাকে কাজে লাগাতে পারছে না। আবার নেপালের অনেকেই পর্যটন খাত এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবা শিল্পে নিযুক্ত। কর্মসংস্থানের ব্যাপারটি গত বছর জেনজি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ইরানে যুদ্ধ অব্যাহত থাকার কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন ও রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করবে। এই অঞ্চলের কিছু দেশ ইতিমধ্যেই জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত পথে মিমাংসার চেষ্টা করছে। ফলে এই পরিস্থিতি নেপালের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।

নেপালের নতুন সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হল পররাষ্ট্রনীতি। শাহের কিছু সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট ভারতের পছন্দের হয়নি। তিনি নিজেকে একজন জাতীয়তাবাদী হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং ‘ভারতপন্থী’ এবং ‘চীনপন্থী’ পররাষ্ট্রনীতির তকমা থেকে সরে এসে ‘নেপালকে প্রথমে’ রেখেছেন। একই সাথে আশা করা হচ্ছে যে, তিনি ভারতের সাথে নেপালের সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেবেন। কারণ, দেশটি নেপালের আমদানির ক্ষেত্রে একটি প্রধান উৎস এবং তার বন্দর, বিমানবন্দর ও জলপথের মাধ্যমে অন্যান্য দেশে নেপালের রপ্তানি সহজতর হয়। 

২০১৫ সালের ব্লকেডে নেপালে জ্বালানির দাম বেড়ে গিয়েছিল, এর বিপরীতে ভারত ইতিমধ্যেই একটি পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন তৈরি করেছে, যা তার প্রতিবেশীকে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল সরবরাহ করবে। বাজারে তেলের অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারত আগামী পাঁচ বছরে ১ হাজার মেট্রিক টন এলএনজি সরবরাহের চুক্তির মাধ্যমে প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে টিকে থাকবে।

নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রতিবেশীদের স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নেপালের নিজস্ব উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা ভূ-রাজনীতিতে আটকে না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। নেপালের রাজনৈতিক রূপান্তরকে ভারতের স্বীকৃতি দিতে হবে, যা রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়। একইভাবে নেপালে গড়ে উঠা নতুন রাজনৈতিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী সরকার এবং তরুণদের প্রতিনিধিত্বকারী নেতৃত্বের সাথে চীন ও ভারত কিভাবে মুখোমুখি হবে– তার জন্যও একটি নতুন পদ্ধতির প্রয়োজন রয়েছে।

স্মৃতি এস পট্টনায়েক: ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের গবেষণা ফেলো; দ্য কাঠমুন্ডু পোস্ট থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম।

আরও পড়ুন

×