ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এবারের মেলায় মৌলিক পাঠক এসেছেন বেশি

পাঠ, প্রজন্ম ও পরিবর্তনের রঙিন সরেজমিন

এবারের মেলায় মৌলিক পাঠক এসেছেন বেশি
×

ছবি: সমকাল

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ | ২০:১২

গত ১৫ মার্চ শেষ হলো অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। কেমন হলো এবারের মেলা? বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে ১৮ দিনের বইমেলাকে ঘিরে ছিল নানা আলোচনা, দ্বিধা, সংশয় আবার প্রত্যাশা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রোজা ঘিরে এবার মেলা শুরুর আগেই ছিল নানা প্রশ্ন। রোজার সময় মেলা আয়োজন কতটা কার্যকর হবে, পাঠক উপস্থিতি, বিক্রি কেমন হবে সেসব প্রশ্ন এসেছে ঘুরেফিরে। তবে রোজার ক্লান্তি, ব্যস্ততা– সবকিছুকে ছাপিয়েও বইপ্রেমীরা এসেছেন, ঘুরেছেন, কিনেছেন তাদের নিজেদের পছন্দসই বইগুলো।

এবারের মেলায় একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল তাড়াহুড়ো, ভিড়ভাট্টাহীন পরিবেশে নিজের পছন্দের বইগুলো কিনতে পাঠকদের উপস্থিতি। এবার তুলনামূলক বইমেলা দেখতে আসা মানুষের সংখ্যা কম থাকায় মেলা হয়েছে ছিমছাম। এদিকে সামাজিক মাধ্যম, বুক রিভিউ, আগে থেকে তৈরি তালিকা–  সব মিলিয়ে অনেকেই নির্দিষ্ট বইয়ের তালিকা তৈরি করে মেলায় এসেছিলেন। কেউ খুঁজেছেন মুহাম্মদ জাফর ইকবালের নতুন বই, কারও তালিকায় ছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ। এ দৃশ্য গতবারের মেলায় অনুপস্থিত ছিল। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাস জানার আগ্রহ এবার চোখে পড়েছে। 

মেলায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল উদীচী ও বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর স্টল। প্রচলিত বই বিক্রির বাইরে গিয়ে তারা সামাজিক বার্তা, মানবিক উদ্যোগ ও সচেতনতা তৈরির প্রয়াস চালিয়েছে। বিদ্যানন্দের স্টলে গিয়ে লেখক-প্রকাশকদের দুর্দশা কাটিয়ে ওঠার বার্তা যেমন ঘুরে ঘুরে দেখেছেন দর্শনার্থীরা, উদীচীর স্টলের সামনে গিয়ে থমকে গেছে পোড়া বই ও বাদ্যযন্ত্র দেখে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির ওপর ঘটা নিপীড়নের সেই কথাই শোনা গেল এখানে।

রোজার সময় মেলার পরিবেশ ছিল দ্বিমাত্রিক। এবার মেলা বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে। ছুটির দিনে শুরু হয় বেলা ১১টায়। 

ইফতারের আগে সাধারণ মেলার মতোই পরিবেশ ছিল বইমেলার দুটো অংশরই। কিন্তু ইফতারের সময় হতে হতে বিকেল ৫টার পর থেকে মেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থী ও পাঠকের আনাগোনা কমতে থাকে। আর সঙ্গে প্রতিটা স্টলেই শুরু হয় ইফতারির প্রস্তুতি। আবার অনেক স্টলে দেখা যায় বিক্রয়কর্মীরা ইফতারির প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি পাঠক ও দর্শনার্থীদেরও সময় দিচ্ছেন। 

ইফতারের পর এক ভিন্নধর্মী নীরব পরিবেশ থাকত মেলায়। যখন পরিবার, বন্ধুবান্ধব নিয়ে অনেকে মেলায় আসতেন, যা মেলাকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।

এবার মেলায় তরুণদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ দেখা গেছে ক্ল্যাসিক সাহিত্যের প্রতি। নতুন রঙিন প্রচ্ছদ, আধুনিক উপস্থাপনায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে আগাথা ক্রিস্টি– সবাই যেন নতুন করে ফিরে এসেছেন পাঠকের হাতে। শুধু কেনা নয়, বই কিনে তা সামাজিক মাধ্যমে নান্দনিকভাবে পোস্ট করে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করার প্রবণতাও দেখা গেছে এবার।

অমর একুশে বইমেলা নিয়ে সবার মাঝেই একটু বাড়তি আগ্রহ থাকে। কিন্তু এবার মেলার ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম তৈরি করে আরও এক ধাপ বেশি আগ্রহ। ‘অ আ ক খ’, ‘লিঙ্কন হাসান’, ‘মুসার বইযাত্রা’সহ আরও বেশ কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম থেকে নিয়মিত স্টল, নতুন-পুরোনো বইভিত্তিক রিভিউ ও আপডেট দিয়েছে প্রতিনিয়ত। তরুণ বইপ্রেমী ভ্লগারদের ভিডিও দেখে অনেকে নির্দিষ্ট বই কিনতে গেছেন। বইমেলা যেন এক অর্থে অফলাইন-অনলাইন সমন্বয়ের এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল।

গত বছর শিশুপ্রহরে সিসিমপুর না থাকায় যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, তার অভাব এবার পুরোপুরি পূর্ণ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুতুলনাট্যের আয়োজন। মেলা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ, পুতুলনাচ ও বিশালাকৃতির পাপেট নিয়ে শিশুদের মনোরঞ্জন করেছে। পুরো মেলা প্রাঙ্গণে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে এই জায়গাতেই। শিশু থেকে বৃদ্ধ– সকলেই উপভোগ করেছে এই ভিন্নধর্মী ও নান্দনিক আয়োজন।

মেলা শেষ হওয়ার দুদিন আগে হঠাৎ শিলাবৃষ্টির আঘাতে অনেক প্রকাশনীর বই ও স্টল নষ্ট হয়ে যায়। পরিপাটি মেলায় এই বৃষ্টি কিছুটা বিঘ্ন ঘটালেও সেটি যেন মেলার আবেগকে আরও গভীর করেছে। ভেজা পথে বৃষ্টির পরদিনও দেখা গেছে পাঠকদের বইমেলা। ঈদের আগে মেলা হলেও অনেককেই দেখা গেছে নিউমার্কেট থেকে শপিং করে এসে মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে।

এই দৃশ্যগুলো বইমেলার স্মৃতিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। ১৮ দিনের মেলায় এবার নতুন বইয়ের সংখ্যা দুই হাজার সাতটি। 

মেলার ভিন্ন দৃশ্যও আছে। মেলায় পাঠকদের উপস্থিতি ও স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও প্রকাশকদের মুখে শোনা গেছে হতাশার সুর। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায় প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশকদের অভিযোগ ছিল বিক্রি নিয়ে। তারা বলেছিলেন, করোনা অতিমারির সময়ের চেয়েও কম বিক্রি হয়েছে এবার। 

মেলার শেষ দিনে মেলা পরিচালনা কমিটির প্রকাশিত তথ্যেও এই চিত্রই স্পষ্ট হয়েছে। কমিটির তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী ২৬৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৭ দিনে তাদের মোট বিক্রি দাঁড়িয়েছে আট কোটি টাকা। মোট ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি ছিল মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের, আর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল ৫৭০টি। গড় হিসাব অনুযায়ী, ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে বাংলা একাডেমি ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে বই বিক্রি করেছে ১৭ লাখ চার হাজার ৬২৯ টাকার।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে বেশি ইউনিট বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম ইউনিট পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি বেশি হয়েছে। মেলায় বাংলা একাডেমিসহ সব প্রতিষ্ঠানের বই ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি করা হয়েছে।

গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালে মেলায় অংশ নেওয়া অর্ধেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রির তথ্য অনুযায়ী ২০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি যোগ করলে মোট বিক্রি আনুমানিক ৪০ কোটি টাকা বলে জানিয়েছিল মেলা কর্তৃপক্ষ। এদিকে ২০২৪ সালে বই বিক্রি হয়েছিল ৬০ কোটি টাকার এবং ২০২৩ সালে ৪৭ কোটি টাকার। সেই তুলনায় প্রকাশনা সংস্থাগুলোর দাবি, এবারের বইমেলায় মোট বিক্রি প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে।

এবারের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং ২৮ দিনের পরিবর্তে ১৮ দিনে মেলা সীমাবদ্ধ থাকা, রোজার সময় স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকা, অসময়ে মেলা অনুষ্ঠিত হওয়া বিক্রি কমার অন্যতম কারণ হতে পারে।

দ্রোহী তারা, প্রতিবেদক, সমকাল 

আরও পড়ুন

×