ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিস্বর

যে ধাক্কা থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাঁচা কঠিন

যে ধাক্কা থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাঁচা কঠিন
×

ইকরাম কবীর

ইকরাম কবীর

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে কোনো সংকট এলে একটা স্বাভাবিক ধারণা আমাদের মনে কাজ করে– এই খারাপ সময় খুব সাময়িক; বাজারই নির্ধারণ করে দেবে যে আমরা কীভাবে মানিয়ে নেব; তারপর আমাদের জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু এবার মনে হয় জীবন স্বাভাবিক হবে না। হরমুজ প্রণালিতে যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটায় বর্তমান জ্বালানি সংকট সবাইকে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। যদিও এই সংকট সব দেশকে সমানভাবে আঘাত করছে না, তবে এটা যে বিশ্ব অর্থনীতির কঠিন সত্য সামনে নিয়ে এসেছে, তা পরিষ্কার। জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগবে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো।

বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। নেপালে মানুষ শুধু রান্নার গ্যাস কেনার জন্যই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রীলঙ্কায় জ্বালানি বাঁচাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সপ্তাহে এক দিন বন্ধ রাখতে বলা হচ্ছে। পাকিস্তানে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে; বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্বালানি ব্যবহার কমাতে অনলাইনে চলে যাচ্ছে। সব সমাজই চাপ টের পাচ্ছে।

এই চিত্র আমরা আগেও দেখেছি। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। ধনী দেশগুলো ভর্তুকি দিয়ে নাগরিকদের সুরক্ষা দিয়েছিল। চাহিদা অনেক থাকায় মূল্য ছিল উচ্চ। কিন্তু চাপ গিয়ে পড়েছিল গরিব দেশগুলোর ওপর। শ্রীলঙ্কা শেষ পর্যন্ত তাদের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। পাকিস্তান প্রবেশ করে কঠিন ভারসাম্যহীনতার সংকটে। বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার ঝুঁকিতে।

কারা ঝুঁকিতে? যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং আর্থিকভাবে কম সুরক্ষিত, তাদের জন্য দুশ্চিন্তা ধেয়ে আসছে। যাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কম, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। খবরে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান ও মিসর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সামনের সারিতে। দুই দেশই মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আবার উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপরেও নির্ভরতা অনেকখানি। জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি খরচ বেড়ে যাবে; যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে রেমিট্যান্স কমে যেতে বাধ্য। এতে তৈরি হবে দুই রকম চাপ– খরচ বাড়বে, আয় কমবে। এর ফলে দেশগুলো আরেক বিপজ্জনক চক্রে পড়ে যাবে। জ্বালানি আমদানিতে বেশি খরচ করতে গিয়ে মুদ্রা দুর্বল হয়ে পড়বে। মুদ্রা দুর্বল হলে ডলারে নির্ধারিত তেলের দামও বেড়ে যায়। ঘাটতি সামাল দিতে সীমিত রিজার্ভ ব্যবহার করতে হয়, না-হয় আরও ঋণ নিতে হয়। বোঝা সহজ– কী ঘটতে চলেছে।

যেমন, পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তিন মাসের আমদানি জন্যও উপযুক্ত নয়। মিসরের রয়েছে বিশাল বৈদেশিক ঋণের বোঝা; শিগগিরই পরিশোধযোগ্য বিলিয়ন ডলারের দেনা। এ অবস্থায় জ্বালানির দাম সামান্য বাড়লেও তা পুরোপুরি আর্থিক সংকটে রূপ নেবে।

বাংলাদেশ কি ঝুঁকির বাইরে? আমাদেরও রিজার্ভ সীমিত। আমরাও আইএমএফ কর্মসূচির আওতায়। আরও গুরুতর বিষয়, আমাদের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল তৈরি পোশাকশিল্পে, যা আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে; রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। বাড়তি আমদানি খরচ বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দেবে।
শ্রীলঙ্কা যে অর্থনৈতিক সংকট থেকে সম্প্রতি বেরিয়ে এসেছে, এর বড় কারণ ছিল এমনই জ্বালানি সংকট। তারা এখনও নাজুক পরিস্থিতিতে। 

আরেকটা মূল্যস্ফীতি এলে আবারও অস্থিরতায় পড়তে পারে।

তবে সব দেশ সমানভাবে ঝুঁকিতে নেই। যেমন থাইল্যান্ডের জিডিপির বড় অংশ জ্বালানি আমদানিতে খরচ হলেও তাদের শক্তিশালী আর্থিক সুরক্ষা ও কৌশলগত মজুত রয়েছে। ভারতও তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থায়; বড় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে, জ্বালানির উৎসগুলো ডাইভারসিফায়েড এবং রাশিয়ার মতো বিকল্প উৎস থেকে ছাড়ে তেল আমদানির সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তারা আমদানি করা গ্যাসের ওপর কম নির্ভরশীল। ফলে মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব কম পড়তে পারে। আর আর্থিক সংকট কিছুটা সামলাতে পারলেও এসব দেশের অন্যান্য খাতে খরচ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
কারণ জ্বালানি শুধু জ্বালানি নয়; খাদ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। প্রাকৃতিক গ্যাস সার উৎপাদনের প্রধান উপাদান। গ্যাসের দাম বাড়লে সারের দামও বাড়বে; কৃষি উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে– বর্তমান সংকট চলতে থাকলে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এ কারণেই সংকটটি অর্থনৈতিক থেকে মানবিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক, যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হলেও এর ক্ষতি রাতারাতি মুছে যাবে না। জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল হতে এবং সরবরাহ আবার ঠিক করতে সময় লাগে। মূল্য স্বাভাবিক হতেও অনেক সময় লাগবে। তাই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য সংকট রয়ে যাবে।
আমরা মনে করেছিলাম, জ্বালানির যুগ শেষ হয়ে গেছে। এখন এআইর যুগ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, জ্বালানি নিরাপত্তাই দেশকে টিকিয়ে রাখে। আমাদের মতো দেশগুলো আরও শক্তিশালী রিজার্ভ কীভাবে তৈরি করবে? আমরা জ্বালানির ডাইভারসিফায়েড উৎস কোথায় খুঁজে পাব? আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো আরও সহনশীল হবে কবে?
আজকের পৃথিবীতে জ্বালানির ধাক্কা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিপজ্জনক, যেখানে কোনো দেশই সংকট থেকে বাদ যাবে না; আমাদের মতো সবচেয়ে দুর্বলেরা তো নয়ই।

ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক; 
যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত
[email protected]

আরও পড়ুন

×