ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরিবেশ সুরক্ষা

সাত বস্তা পাখি হত্যা কেন ‘গণহত্যা’ নয়

সাত বস্তা পাখি হত্যা কেন ‘গণহত্যা’ নয়
×

পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

দৌলতদিয়ায় পদ্মার পানিতে তলিয়ে যাওয়া বাসভর্তি যাত্রীর নির্মম মৃত্যুর আহাজারির ভেতরেই মেঘনার চরে ‘পাখি গণহত্যা’র খবর এলো। এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সদলবলে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় শত শত পাখি বন্দুক দিয়ে খুন করেছেন। 

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে স্থানীয় এক অনলাইন পোর্টাল লিখেছে, স্বাধীনতা দিবসে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাইভেটকারে ছয়জন ব্যক্তি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া আসেন। তারা ট্রলারে গজারিয়ার চরাঞ্চল ও মেঘনা তীরবর্তী এলাকায় গুলি করে সাত বস্তায় প্রায় চার মণ পরিযায়ী পাখি শিকার করেন। শিকার শেষে রাতে ফেরার পথে স্থানীয় জনতা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২’ অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। অপরাধীরা তাদের অপরাধ স্বীকার করেন। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে এক লাখ টাকা এবং বাকি পাঁচজনকে ৩০ হাজার টাকা করে জরিমানা করে প্রশাসন। 

সমসাময়িককালে দেশে এত বড় পাখি হত্যা ঘটেনি। ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এমন অপরাধের বিচার ও শাস্তি কেবল অর্থদণ্ড নয়। এই নৃশংস ঘটনার এমন লঘুদণ্ড কেন? কেন পাখির প্রজাতি এবং মোট সংখ্যা প্রকাশ না করে প্রশাসন ওজনের হিসাবে এত বড় বন্যপ্রাণী হত্যার অপরাধকে ঢাকতে চাইল? পরিযায়ী পাখি এক থেকে দেড় কেজি হয়ে থাকে। যদি চার মণ পাখি হত্যা করা হয়, তাহলে এক কেজি ওজনের হিসাব ধরলেও কমপক্ষে ১৬০টি পাখি হত্যা করা হয়েছে। 

উপজেলা প্রশাসন নাকি অপরাধীদের ‘বয়স’ বিবেচনা করে এই ‘দণ্ড’ দিয়েছে। কিন্তু এই প্রবীণদের এমন ‘ভিমরতি’ তরুণদের কাছে কী বার্তা দেয়? বিশেষত যেখানে পাবনার একজন প্রবীণ মানুষ আকাশকলি দাশ জীবন দিয়ে পাখি সুরক্ষার নজির রেখে গেছেন। অনেকে পাখিবাড়ির মতো অভয়াশ্রম রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। 
পাখি হত্যাকারীদের একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি এর আগেও বহুবার পাখি শিকার করেছেন। ‘শখের বশে’ তারা শিকার করেছেন। এসব নিষ্ঠুর শখ আর ভোগবাদিতাই এই দুনিয়াকে চুরমার করে দিচ্ছে। চোখের সামনে উধাও হচ্ছে নদী; পুড়ছে বন; পাচার হচ্ছে বন্যপ্রাণী। সিলেটের হরিপুরে যে কারণে কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না পাখির লাশের হোটেল। অন্যায় অপরাধ জেনেও মানুষ পাখির লাশের ঝোল প্লেটে নিয়ে ফেসবুকে সিনা টানটান করে পোস্ট দিচ্ছে। অথচ আমাদের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রকৃতি ও সংস্কৃতিতে পাখির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাখি না থাকলে প্রজাতি হিসেবে মানুষও এই গ্রহে বেশি দিন বাঁচতে পারবে না। কিন্তু আমাদের এসব বাহাদুরি শখ রুখবে কে? 

সচরাচর দেখা যায়, গরিব বনজীবী ও আদিবাসীদের নামেই মিথ্যা বন মামলা হয় কিংবা ভিন্নভাবে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ আইনের দাবড়ানি দেওয়া হয়। অবিশ্বাস্য রকম ফোকর গলে বের হয়ে যান প্রকৃতি বিনষ্টকারী ও পরিবেশ-হত্যাকারী ক্ষমতাবান বাহাদুরেরা। 

কার্তিকে সাঁওতাল গ্রামে শুরু হয় বৃহত্তর ধর্মীয় সামাজিক পরব ‘সোহরাই’। সোহরাই পরবের এক বিশেষ কৃত্যরীতি হলো গ্রাম থেকে কয়েকজন বনে যান। বন্যপ্রাণী শিকার করে বাড়িতে জাহেরথানে (পূজাস্থল) আসেন। এমনি এক সোহরাই পরবের রাতে ২০২০ সালের ১৪ নভেম্বর মৌলভীবাজারের বড়লেখা সদর ইউনিয়নের কেছরিগুল গ্রাম থেকে ৯ জন আদিবাসী ও চা শ্রমিক মাধবকুণ্ডে শিকার-কৃত্যে যান। এ সময় স্থানীয় বন বিভাগ তাদের আটক করে। তাদের কাছে একটি সজারু পাওয়া যায়। রাতেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জগ সাঁওতাল ও সুবল ভূমিজ সিংকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। অপর সাতজনকে ১০ হাজার করে মোট ৭০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। 

যদিও বন্যপ্রাণী আইনে বনবাসী ও আদিবাসীদের উৎসব প্রথা পার্বণের জন্য শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। কিংবা একটি সজারু বা সাত বস্তা পাখির বিষয়টিও তুলনীয় নয়। কিন্তু সাঁওতাল গ্রামের ঘটনায় কারাদণ্ড দিয়ে ‘অপরাধীদের’ জেলে পাঠানো সহজ ছিল। আর গজারিয়াতে সাত বস্তা পাখি হত্যাকারীরা ক্ষমতা বলয়ের লোক বলে প্রশাসন ‘প্রবীণ বয়সের অজুহাত’ দিয়ে, কেবল অর্থদণ্ড নিয়েই তাদের ছেড়ে দিল। ঠিক যেভাবে হরিণের চামড়ায় বসে বিয়ের অনুষ্ঠান করার পরও ক্রিকেটার সৌম্য সরকারকে কোনো শাস্তির আওতায় আনা যায়নি। কিংবা হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা হাতিমারা চা বাগান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। তাদের দেওয়া আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল মায়াহরিণ, পাখি, হনুমান ও কাঠবিড়ালির মতো বহু বিরল বুনোপ্রাণ। ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যমে নিহত প্রাণীর বীৎভস লাশের ছবি ছাপা হয়।

দেশে সাত-আটশ প্রজাতির পাখি আছে। আইইউসিএনের একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে দেশে আট লাখ পাখি ছিল। ২০১৮ সালে সে সংখ্যা নেমে আসে এক লাখ ৬৩ হাজারে। ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশ বার্ডস ক্লাবের উদ্যোগে প্রতিবছর শীতকালীন পরিযায়ী ও জলচর পাখিশুমারি হয়। গজারিয়ার সাম্প্রতিক পাখি হত্যার প্রতিবাদে বার্ডস ক্লাব বা কোনো পাখি সংগঠনের দৃশ্যমান তৎপরতা এখনও চোখে পড়েনি। তবে আমাদের আশা হলো মাথাভাঙ্গা এলাকার জনগণ, যারা এই পাখি হত্যার প্রতিবাদ করে হত্যাকারীদের আটক করেছেন। 
নির্বাচনী ইশতেহারে সরকার প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় অঙ্গীকার করেছে। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই পরিবেশমন্ত্রীর সামনে সাত বস্তা পাখির লাশ একটা তীব্র বিশৃঙ্খল দৃশ্য ও যন্ত্রণা। বিশ্বাস রাখি, মন্ত্রী পাখির পাশে দাঁড়াবেন। তবে রাষ্ট্র, সরকার, মন্ত্রণালয় বা কোনো দপ্তরের পক্ষে দেশব্যাপী সারাক্ষণ নজর রাখা অসম্ভব। দরকার সামগ্রিক পরিবেশগত রাজনৈতিক জাগরণ। জনতার তুমুল পাখি ব্রিগেড। 

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক 
[email protected]

আরও পড়ুন

×