ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানবসম্পদ

সবার জন্য মানব উন্নয়ন: সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব

সবার জন্য মানব উন্নয়ন: সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব
×

সেলিম জাহান

সেলিম জাহান

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৯ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষ গুরুত্বপূর্ণ এবং সবার জীবন সমান মূল্যবান। এই সর্বজনীনতার ধারণাই মানব উন্নয়ন ধারণার মূল ভিত্তি এবং ২০৩০ সালের বজায়ক্ষম (টেকসই) উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি। এই লক্ষ্যমাত্রায় ঘোষণা করা হয়েছে– মানব উন্নয়নের পথযাত্রায় কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। মানব উন্নয়ন মূলত মানুষের স্বাধীনতার কথা বলে, যে স্বাধীনতার মানে প্রত্যেক মানুষের পূর্ণ সম্ভাবনার বাস্তবায়ন। এই স্বাধীনতা কেবল কিছু মানুষের জন্য নয়, অথবা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের জন্যও নয়। বরং এটি পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের সকল মানুষের জন্য; বর্তমানে এবং ভবিষ্যতেও। 
এই সবার জন্য মানব উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে গত ২৫ বছরে বিশ্বের উন্নয়নের ধারা নিয়ে আমরা পাঁচটি মূল উপসংহার টানতে পারি:

প্রথমত, গত সিকি শতাব্দীতে মানব উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক দেশই এগিয়েছে, কিন্তু সবাই সমানভাবে নয়। দ্বিতীয়ত, মানব উন্নয়নের অগ্রগতি কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে পাশ কাটিয়ে গেছে এবং নানান কাঠামোগত বাধা তাদের বঞ্চনাকে গভীরতর করেছে। কারা, কোথায় এবং কীভাবে এসব বঞ্চনার শিকার, তা জানা জরুরি। তৃতীয়ত, বঞ্চনার একটি মানচিত্র তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ এবং সবার জন্য মানব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মানব উন্নয়ন ধারণার বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোটির পুনর্বিবেচনা ও সম্ভবত পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। চতুর্থত, সবার জন্য মানব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য নীতিমালার নানান বিকল্প রয়েছে। তবে সেগুলোর সঙ্গে বৈশ্বিক কাঠামোরও সংস্কার প্রয়োজন। পঞ্চমত, মানব উন্নয়ন কাঠামো এবং ২০৩০ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা একে অপরকে শক্তিশালী করে এবং পরস্পরকে প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্ব এমন অনেক লক্ষ্য অর্জন করেছে, যা ২৫ বছর আগেও কঠিন মনে হতো। বিশ্বের জনসংখ্যা ১৯৯০ সালের ৫৩০ কোটি থেকে ২০২৫ সালে ৮০০ কোটিতে উন্নীত হলেও এ বিশ্বে গত ২৫ বছরে প্রতিদিন এক লাখ ৩৬ হাজার মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে। ২০০ কোটির বেশি মানুষ উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুবিধা পেয়েছে এবং ২৬০ কোটির বেশি মানুষের কাছে নিরাপদ পানি লভ্য হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পৃথিবীতে শিশুমৃত্যুহার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে।

অন্যদিকে কিছু বঞ্চনা এখনও প্রবহমান (যেমন দারিদ্র্য), কিছু বর্ধমান (যেমন বৈষম্য) এবং কিছু ঘনায়মান (যেমন জলবায়ু পরিবর্তন)। বিশ্বের প্রতি তিনজনের একজন এখনও নিম্ন মানব উন্নয়নের মধ্যে রয়েছে এবং ১০৫ কোটি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে। পৃথিবীতে প্রতি ৯ জনের একজন ক্ষুধার্ত এবং প্রতি তিনজনের একজন অপুষ্টিতে ভোগে। প্রতিদিন ১৮ হাজার মানুষ বায়ুদূষণে মারা যায় এবং প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়।

বৈষম্য আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের আটজন ধনী ব্যক্তির সম্পদ বিশ্বের অর্ধেক মানুষের সম্পদের সমান। বিশ্বের শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষ বিশ্বের মোট আয়ের অর্ধেকের বেশি আয় করে এবং শীর্ষ ১ শতাংশ প্রায় ৪৭ শতাংশ সম্পদের মালিক। বায়ুদূষণ বছরে ৬০ লাখ লোকের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়; তিন কোটি ৮০ লাখ লোক প্রতিবছর অসংক্রামক ব্যাধির কারণে মারা যায়। জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা বিদ্যমান মাত্রায় চললে ২০৩০ সাল নাগাদ আরও ১০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। 

স্বতন্ত্রভাবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও মৌলিক বঞ্চনা ব্যাপক। ৩৭ কোটি আদিবাসী মানুষ বিশ্ব জনসংখ্যার ৫ শতাংশ হলেও তারা বিশ্ব দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১৫ শতাংশ। মোট ছয় কোটি ৫০ লাখ মানুষ, যা ফ্রান্সের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছে– প্রতি মিনিটে ২৪ জন। প্রতিবছর ১৮ বছরের কম বয়সী দেড় কোটি মেয়ের বিয়ে হয়। অর্থাৎ প্রতি দুই সেকেন্ডে একজন শিশুকন্যা বিয়ের পিঁড়িতে বসে। এটি তাদের সক্ষমতা ধ্বংস, সম্ভাবনাকে সীমিত এবং মানবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। 

সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী কাঠামোগত বঞ্চনার শিকার। যেমন– নারী ও কন্যা, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, সংখ্যালঘু, অভিবাসী ও শরণার্থী। এদের কাছে পৌঁছানো অনেক সময় কঠিন– ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে। বিশ্বব্যাপী শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৪৯ শতাংশ, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ ৭৬ শতাংশ। কৃষিকাজে নারীর অবদান বিপুল। অথচ তারা ১০ শতাংশেরও কম জমির মালিক। নারীরা সাধারণত অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি করে থাকে। বিশ্বের ১৮টি দেশে নারীরা স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাজ করতে পারে না এবং ৩২টি দেশে পাসপোর্টের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য ভিন্ন প্রক্রিয়া প্রযোজ্য। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শুধু নারী ও পুরুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে পূর্ব এশিয়ার ১১১ বছর এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর ৩৫৬ বছর লাগবে। 
বিশ্বের নানান গোষ্ঠীগত বিভাজন টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপব্যবহারও করা হয়। এর একটি উদাহরণ হলো ৭৩টি দেশ ও পাঁচটি অঞ্চল, যেখানে তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের অধিকার অস্বীকার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আইন প্রণীত হয়, যাতে সুনির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সেবা বা সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যায়।

এদিকে যখন বৈশ্বিক পদক্ষেপ ও সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি, তখন আত্মপরিচয়কে আমরা ক্রমেই সংকীর্ণ করছি। জাতীয়তাবাদী বা জাতিগত-রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলে মনে হয়। অন্যদের প্রতি অসহিষ্ণুতা– তা আইনি, সামাজিক বা জবরদস্তিমূলক যা-ই হোক না কেন, মানব উন্নয়ন ও সর্বজনীনতার নীতির পরিপন্থি।
উন্নয়নে মানুষের কণ্ঠস্বর ও অংশগ্রহণ মানব উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। আলোচনা করা, জনসমক্ষে বিতর্কে অংশ নেওয়া এবং নিজের জীবন ও পরিবেশ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সর্বজনীন সক্ষমতা বাড়ানো মানব উন্নয়নের মৌলিক দিক। মনে রাখা দরকার, দীর্ঘদিন ধরে মানব উন্নয়ন পদ্ধতির প্রধান গুরুত্ব ছিল কুশলমুখী সক্ষমতার ওপরে। কিন্তু কুশলের ক্ষেত্রে অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠস্বর ও অংশগ্রহণের ওপরেও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

মানুষ তার আত্মপরিচয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা রাখে। এই পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া, মূল্যায়ন ও রক্ষা করাও তার অধিকার। প্রত্যেক ব্যক্তিরই বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে ও ভেতরে পছন্দ করার সুযোগ থাকা উচিত। এই সুযোগের অস্তিত্ব এবং এর প্রতি সম্মান ও স্বীকৃতি বহুজাতিক ও বহু সাংস্কৃতিক সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পূর্বশর্ত।

আত্মপরিচয় সম্পর্কিত তিনটি বিষয় সর্বজনীন মানব উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রান্তিক মানুষের জন্য একাধিক আত্মপরিচয়ের সুযোগ সীমিত থাকে। ফলে তারা পছন্দসই আত্মপরিচয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, সীমিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সম্পদের জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় এবং এতে বঞ্চিত ও প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো পিছিয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, আরও গুরুতরভাবে, আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে একক ও অখণ্ড পরিচয়ের ওপর জোর দিলে এবং সে পরিচয় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তি ও প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করলে আত্মপরিচয় একটি চরমপন্থা ও সহিংসতার দিকে যেতে পারে, যা মানব উন্নয়নের জন্য হুমকি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজের মূল্যবোধ ও বিধিবিধান সবচেয়ে বঞ্চিতদের বিরুদ্ধে যায়। সামাজিক বিধিবিধান প্রায়ই সামাজিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়। তবে সামাজিক মূল্যবোধ ও বিধিবিধান পরিবর্তন করলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।

মানুষের ভোগ করার স্বাধীনতা পরস্পর নির্ভরশীল এবং কখনও কখনও স্বাধীনতার এই পারস্পরিক নির্ভরতা একে অপরকে শক্তিশালী করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মী যদি তাঁর কর্মস্থলে সবুজায়নের স্বাধীনতা ব্যবহার করেন, তবে তা তাঁর সহকর্মীদের বিশুদ্ধ বায়ু পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু একজনের স্বাধীনতা অন্যের স্বাধীনতাকে সীমিতও করতে পারে। যেমন– একজন ধনী ব্যক্তি বহুতল ভবন নির্মাণের স্বাধীনতা ভোগ করে যদি একটি বহুতল আবাসন নির্মাণ করেন, তাতে তাঁর দরিদ্র প্রতিবেশী সূর্যালোক ও খোলামেলা পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

অন্যের স্বাধীনতা সীমিত করা সবসময় কারও নিজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য নাও হতে পারে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তা ইচ্ছাকৃতও হতে পারে। ধনী ও ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী অন্যদের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা করতে পারে। এটি অনেক দেশের নীতিনির্ধারণে ধনসম্পদপ্রীতি, আইনি কাঠামোর গঠন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যপ্রণালিতে প্রতিফলিত। সব সমাজকেই বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের নীতিমালা নির্ধারণ করতে হয়, যাতে উন্নয়নের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একটি অধিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠিত হয়।  

পরিমাপের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু গড় নয়, বরং একটি বিভাজিত কাঠামো দরকার, যাতে সমাজের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, মানব উন্নয়নের পরিমাণগত পরিমাপের পাশাপাশি এর গুণগত মানেরও মূল্যায়ন প্রয়োজন। যেমন– এটি খুব উৎসাহজনক যে বর্তমানে বেশিসংখ্যক শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে ও উপস্থিত থাকছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন– তারা কী শিখছে। তৃতীয়ত, মানব উন্নয়নের জন্য নতুন তথ্যসূত্র, যেমন বিস্তৃত উপাত্ত এবং প্রকৃত সময় উপাত্ত অন্বেষণ করতে হবে।

সবার জন্য মানব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় পর্যায়ে চারটি দিকনির্দেশনামূলক নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, মানব উন্নয়নের পথযাত্রায় পিছিয়ে পড়াদের অন্তর্ভুক্তির জন্য সর্বজনীন নীতি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে নীতি বিষয়ে কার্যকর সর্বজনীনতা অর্জন করা দুরূহ। উদাহরণস্বরূপ, একটি দেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। কিন্তু দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও দূরবর্তী এলাকার কারণে সব স্থানে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন সম্ভব নাও হতে পারে। তাই সর্বজনীন মানব উন্নয়ন নীতিগুলোকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে যারা বঞ্চিত, তাদের কাছেও মানব উন্নয়ন কল্যাণগুলো পৌঁছায়।

দ্বিতীয়ত, যথাযথ সর্বজনীন নীতি থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিশেষায়িত প্রয়োজন থাকে এবং তাদের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। মানব উন্নয়নের নীতিগুলোকে তাদের বৈচিত্র্যময় চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। যেমন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান, চলাচল এবং অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা।

তৃতীয়ত, মানব উন্নয়ন অর্জিত হলেই তা স্থায়ী হবে, এমন নয়। বিভিন্ন ধাক্কা ও ঝুঁকির কারণে মানব উন্নয়নের অগ্রগতি হ্রাস পেতে পারে, এমনকি পিছিয়েও যেতে পারে। এ জাতীয় নেতিবাচক প্রভাব বিশেষ করে পড়ে তাদের ওপর, যারা মৌলিক মানব উন্নয়নের সীমা মাত্রই অতিক্রম করেছে এবং যারা এখনও তা অর্জন করতে পারেনি। তাই মানব উন্নয়নকে টেকসই ও সংনম্য (নমনীয়) করতে হবে।
চতুর্থত, মানব উন্নয়নে পিছিয়ে পড়াদের ক্ষমতায়নও জরুরি, যাতে নীতি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হলে তারা নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে পারে এবং সে ব্যাপারে প্রতিকার পেতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

এ ছাড়াও আমরা যেহেতু একটি বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যে বসবাস করছি, তাই সর্বজনীন মানব উন্নয়নের জন্য জাতীয় নীতিগুলোকে একটি ন্যায়সংগত ও মানব উন্নয়ন-সমৃদ্ধ বৈশ্বিক ব্যবস্থার দ্বারা সম্পূরককৃত ও সমর্থিত হতে হবে। বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণের বিস্তৃত ক্ষেত্র, বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, বৈশ্বিক নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করা ইত্যাদি বিষয় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।  
তিনটি পন্থায় মানব উন্নয়ন কাঠামো এবং বজায়ক্ষম (টেকসই) উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পরস্পরকে জোরালো করে–
 ১. মানব উন্নয়ন কাঠামোর বিশ্লেষণধর্মী অংশগুলো বজায়ক্ষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ধারণাগত ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে পারে। একইভাবে মানব উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি এ লক্ষ্যমাত্রাগুলো পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাগুলোর সেই সব অংশ শনাক্ত করতে পারে, যা এসব লক্ষ্যমাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করতে সক্ষম। প্রকৃতপক্ষে মানব উন্নয়ন পদ্ধতি এবং বজায়ক্ষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে তিনটি বিশ্লেষণধর্মী সংযোগ রয়েছে।

প্রথমত, মানব উন্নয়ন কাঠামো এবং বজায়ক্ষম (টেকসই) উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা উভয়েরই ভিত্তি হচ্ছে সর্বজনীনতার নীতি। মানব উন্নয়ন কাঠামো প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়, আর বজায়ক্ষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা কাউকে পেছনে না ফেলে রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। দ্বিতীয়ত, উভয়েরই মৌলিক লক্ষ্য চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধা নির্মূল, বৈষম্য হ্রাস, নারী-পুরুষের মধ্যকার সমতা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। তৃতীয়ত, উভয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বজায়ক্ষম উন্নয়নের নীতি।

২. বজায়ক্ষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সূচকগুলো মানব উন্নয়নের সূচকগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে এসব লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে পারে। একইভাবে মানব উন্নয়ন মূল্যায়ন কাঠামো বজায়ক্ষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সূচকগুলো পর্যালোচনা করে এমন কিছু সূচক সেই কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, যা বর্তমানে সেখানে নেই।

৩. মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনগুলো বজায়ক্ষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি প্রচারণা মাধ্যম হতে পারে। আবার বজায়ক্ষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার কাঠামোও আগামী বছরগুলোতে মানব উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনকে আরও দৃশ্যমান করার জন্য একটি কার্যকর পন্থা হতে পারে।

মানব উন্নয়নে আরও অগ্রগতি সম্ভব, পৃথিবীতে পরিবর্তন সাধিত হয় এবং বিশ্বে রূপান্তর ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, চলতি শতাব্দীর প্রথম দশকে উপ-সাহারীয় আফ্রিকায় গড় আয়ু ছয় বছর বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। দক্ষিণ এশিয়ায়, যেখানে চরম দারিদ্র্য ব্যাপক, সেখানে মাত্র ১৩ বছরে (২০০০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত) চরম দারিদ্র্যের হার ৪৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আমেরিকা মহাদেশকে হামমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষ এখন জোরালোভাবে তাদের মতামত দিচ্ছে। তাদের উদ্ভাবনী শক্তি ও মেধার বিকাশ ঘটছে। আগে যেসব বিষয়ে কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল, এখন সেগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ধীরে হলেও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়েও ঐকমত্য গড়ে উঠছে। যেমন জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে প্যারিস চুক্তি। 
উপসংহারে বলা যায়, সবার জন্য মানব উন্নয়ন কোনো স্বপ্ন নয়, বরং একটি বাস্তবতা। আমরা যা অর্জন করেছি তার ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যেতে পারি; নতুন সম্ভাবনার অনুসন্ধান করতে পারি। আমাদের আশা এখন নাগালের মধ্যেই। ২০৩০ সাল পর্যন্ত অবশিষ্ট চার বছরে আমরা বঞ্চনা থেকে সমৃদ্ধির দিকে; অন্তরায় থেকে সুযোগের দিকে; হতাশা থেকে আশার দিকে যাত্রা করতে পারি। আমাদের এই যাত্রায় প্রথমেই  তাদের কাছে পৌঁছুতে হবে, যারা সবচেয়ে পিছিয়ে। তা করতে পারলে এ পথযাত্রা শেষে দেখব, আমরা একসঙ্গে সফল হয়েছি; কেউই পিছিয়ে পড়ে থাকিনি।

ড. সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, 
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
 

আরও পড়ুন

×