ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানবসম্পদ

সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের অগ্রাধিকার

সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের অগ্রাধিকার
×

জনমিতিক মুনাফা অর্জনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এখনই সম

রানা ভিক্ষু

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ১৬:০২

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বেকারত্ব বাংলাদেশের নতুন কোনো ইস্যু নয় বরং উন্নয়ন আলোচনায় এটি বহুল প্রচলিত অনুষঙ্গ। তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ হলো এই— জনমিতিক মুনাফা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনের সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে প্রায় অর্জনশূন্য অবস্থায়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল-ইউএনএফপিএর স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ২০২৫ প্রতিবেদন বাংলাদেশের জনমিতিক মুনাফার অনন্য সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন কর্মক্ষম মানুষ (১৫–৬৪ বছর বয়সী) রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থনীতির পরিভাষায় এটিই জনমিতিক মুনাফা, যাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত ও সহজে একটি দেশের প্রবৃদ্ধির সূচক শীর্ষে তোলা যায়।

পূর্ব এশিয়ায়— চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম এই সুযোগকেই জাতীয় উন্নয়নের শক্তিশালী ইঞ্জিনে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রধানত, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ এবং দক্ষতা মোতাবেক উৎপাদনে অংশগ্রহণের নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সেটি সম্ভব হয়েছে। যার সুফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোগ করে চলেছে।

বাংলাদেশও এখন ঠিক সেই যুগসন্ধিক্ষণে, যেখানে অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার উপযোগী। অথচ মুনাফার বিপরীতে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ বেকারত্বের জালে জাতির বোঝায় পরিণত হয়েছে! কাজেই সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ১৯.৪ লাখ যুবক বেকার ছিল, যা যুব শ্রমশক্তির ৭.২ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক বিষয়, বেকার যুবকদের মধ্যে ৩১.৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রিধারী। ২০২৪ সালে স্নাতক পর্যায়ের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৩.৫ শতাংশ, যা অন্যান্য শিক্ষাগত স্তরের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ বাস্তব পরিস্থিতিটা হলো এই─ যে যত উচ্চ শিক্ষিত, তার বেকার থাকার সম্ভাবনা তত বেশি! 

গত তিন দশকে সরকার ও উন্নয়ন অংশীদারদের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে দেখা গেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার মান বৃদ্ধি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ, শ্রমবাজারের চাহিদা উপযোগী প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে অনেক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও জাতিসংঘের সহায়তা এবং বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঋণের বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের দীর্ঘ পথ এখনো বাকি।

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এর জন্য অতিরিক্ত অর্থায়ন বা নতুন কোনো কর্মসূচির প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান দুটি নীতি— জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১১ এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন ২০১৪-এর সমন্বয় এবং সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব।

জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০-এর লক্ষ্য ছিল মানবিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১১ শিল্প-কারখানার চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও ২০২২–২০২৭ কর্মপরিকল্পনায় ৮.৬ মিলিয়ন মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন সুবিধাবঞ্চিত ও ঝরে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথা বলেছে। আইন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সনদ প্রদানের জন্য একটি বোর্ড গঠন করা হলেও গত দশ বছরে কোনো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি।

দক্ষতা উন্নয়নের নামে ঢালাওভাবে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও কোর্স বাড়লেও মান নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে চরম ঘাটতি বিদ্যমান। সরকারি প্রণোদনার প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষণার্থীর ওভারল্যাপিংসহ নানা অনিয়ম হচ্ছে। দক্ষতা কোর্স মূল্যায়নে উত্তীর্ণের জন্য প্রশিক্ষণার্থীরা বাজারের গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করে! কারিগরি প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব, দক্ষতা অর্জনকারীদের কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখতে পারেনি। 

প্রস্তাবিত সম্পূরক উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে ‘কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জাতীয় ডাটাবেজ’ তৈরি করতে হবে, যা জাতীয় পরিচয়পত্র সার্ভার থেকেই সংগ্রহ করা যাবে। এই ডাটাবেজে থেকে কর্মক্ষম বেকারদের তালিকা ও কর্মসংস্থান পরিকল্পনা করা যাবে সহজেই। কারণ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতার মান নির্ধারণে বাংলাদেশে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল এন্ড ভকেশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্ক (এনটিভিকিউএফ) ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে সরকারি ও বেসরকারিভাবে পরিচালিত সব দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জাতীয় ডাটাবেজ’ থেকে বয়সানুক্রমিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন নিশ্চিত করাতে হবে। প্রশিক্ষণে এনটিভিকিউএফ অনুসরণ হতে হবে বাধ্যতামূলক। 

তৃতীয় ধাপে প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারীদের সনদ প্রদান এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসি যে পদ্ধতি অনুসরণ করে, তা এখানে প্রয়োগ করা যেতে পারে। ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ সনদ প্রদানের দায়িত্ব পালন করবে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোকে দায়িত্ব নিতে হবে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে সনদপ্রাপ্তদের চাকরির সুযোগ তৈরি করার। তবে শুধু চাকরি দিয়ে সবার কর্মসংস্থান সম্ভব নয়; তাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে আগ্রহী ও উপযুক্তদের উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগ ঘটানোর দায়িত্ব নিতে হবে এসএমই ফাউন্ডেশনকে। মোটকথা, কর্মক্ষম প্রত্যেকের জন্য কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই কার্যকর দায়িত্ব পালন করবে, যাতে কেউ বেকার থাকার সুযোগ না পায়।

মনে রাখা জরুরি, জনমিতিক মুনাফার চ্যানেল সীমিত (৩৫–৪০ বছর) সময়ের জন্য খোলা থাকে এবং তার প্রায় অর্ধেক ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তাই দ্রুত এই লভ্যাংশ কাজে লাগিয়ে পরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মোকাবিলার পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় জনমিতিক মুনাফার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হিসেবে বিভিন্ন আর্থসামাজিক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন, নাগরিকের দীর্ঘায়ু এখন জাপানের জাতীয় চ্যালেঞ্জ। কার্যকর নীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রম, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান বেড়ে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন জন্মহার নিয়ন্ত্রণের কারণে কর্মক্ষম জনশক্তির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। 

কাজেই, রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং টেকসই পরিকল্পনা— এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে জনমিতিক মুনাফা অর্জনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এখনই সময়। অন্যথায় জাতীয় অর্থনীতির এই সোনালি সম্ভাবনা নীরবে হারিয়ে যাবে। 

রানা ভিক্ষু: লেখক, গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×