ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ইসলাম ও সমাজ

ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ইসলামের তাগিদ

ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ইসলামের তাগিদ
×

মো. শাহজাহান কবীর

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্র ও সর্বস্তরে ইনসাফ বা ন্যায় প্রতিষ্ঠা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ কর্তৃক পৃথিবীতে নবী-রাসুল প্রেরণের বিশেষ উদ্দেশ্যও এটি।

পবিত্র কোরআনের সুরা আল-হাদিদের ২৫ আয়াতে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘আমি স্পষ্ট নির্দেশনাবলি দিয়ে আমার রাসুলদের পাঠিয়েছি এবং আমি তাদের সঙ্গে কিতাব ও মিজান তথা ন্যায়ের মানদণ্ড অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকে।’ 

তিনটি জিনিস দিয়ে নবী-রাসুলদের পৃথিবীতে পাঠানোর কথা এ আয়াতে বলা হয়েছে। সুস্পষ্ট নির্দেশনাবলি, যা দেখে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত– তিনি বাস্তবিকই আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর আনীত বাণী শতভাগ সত্য। দুই. আসমানি গ্রন্থ তথা পবিত্র অহি, যা মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য নবীদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। এবং তিন হলো মিজান। অর্থাৎ সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের মাপকাঠি, যা দাঁড়িপাল্লার মতো মেপে ভুল-শুদ্ধ নির্ণয় করে দেবে। ফলে সব ধরনের প্রান্তিকতা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। সমাজ ন্যায়নিষ্ঠা আর ইনসাফের রোল মডেলে পরিণত হবে।

যেহেতু সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ইনসাফ কায়েমের গুরুভার প্রধানত রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর এবং এ ক্ষেত্রে তাদের পক্ষ থেকেই ব্যত্যয় ঘটার আশঙ্কা থাকে বেশি। তাই ইসলাম শাসকদের প্রতি ইনসাফ কায়েমের বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছে, যাতে তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দিকে বিশেষ নজর রাখেন। অন্যথায় তাদের অবহেলায় একটি সমাজে ইনসাফ এবং ন্যায়বিচারের মৃত্যু ঘটতে পারে।
পবিত্র কোরআনে সুরা আন-নিসার ৫৮ আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন– তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোনো বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায়ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদের সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।’ 

ফয়সালা করার ক্ষেত্রে ইনসাফের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হজরত দাউদ (আ.)-কে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, ‘হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি। অতএব তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে রাজত্ব কর এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ কর না। তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে’ সুরা সোয়াদ, আয়াত-২৬। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে উদ্দেশ করে সুরা আন-নিসার ৪২ আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘যদি ফয়সালা করেন তবে ন্যায়ভাবে ফয়সালা করুন, নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ 

একজন শাসক কেবল প্রশাসনিক প্রধান নন; তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্বের একজন আমানতদার। তাই ন্যায় প্রতিষ্ঠা তাঁর জন্য ইবাদতের অংশ হিসেবেও বিবেচিত।
শাসকের প্রধান দায়িত্ব হলো সকল নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ইসলামে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণির জন্য আলাদা কোনো আইন নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তারা সম্মানিত ব্যক্তিদের অপরাধ ক্ষমা করে দিত, আর দুর্বলদের শাস্তি দিত’ (সহিহ বুখারি)।
এ হাদিসের শিক্ষা হলো, বিচারে পক্ষপাতিত্ব করলে আল্লাহর হুকুমে ধ্বংস অনিবার্য। শাসকের ন্যায়পরায়ণতা মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। হাদিসে বর্ণিত, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটবর্তী হবে ন্যায়পরায়ণ শাসক’ (সহিহ মুসলিম)। 

প্রত্যেক শাসকের দায়িত্ব হলো দুর্নীতি ও জুলুম প্রতিরোধ করা। আল্লাহতায়ালা সুরা বাকারার ১৮৮ আয়াতে এরশাদ করেন, ‘আর তোমরা মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ 
একজন শাসক যদি দুর্নীতি দমন না করেন, তবে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়। তাই শাসকের কর্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে সৎ ও যোগ্য লোকদের দায়িত্ব প্রদান এবং দুর্নীতিবাজদের কঠোরভাবে দমন করা। প্রত্যেক শাসকের দায়িত্ব হলো বিচার ব্যবস্থাকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাখা। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, খলিফারা বিচারকদের স্বাধীনতা দিতেন, যাতে তারা নির্ভয়ে ন্যায়বিচার করতে পারেন। যেমন হজরত ওমর (রা.) নিজের বিরুদ্ধে মামলা হলে সাধারণ নাগরিকের মতো আদালতে হাজির হতেন। এটি শাসকের ন্যায়পরায়ণতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শাসক সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও আল্লাহভীরু হলে শাসন ব্যবস্থাও ন্যায়ভিত্তিক হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়পরায়ণ নেতা। তিনি কখনও নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেননি, বরং সব সময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নন। জনগণের কাছে, সর্বোপরি আল্লাহর কাছে তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে। এই জবাবদিহির ভয় শাসককে অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করে।

ড. মো. শাহজাহান কবীর: চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি 

আরও পড়ুন

×