ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অভিবাসন

মৃত্যুফাঁদে ইউরোপ স্বপ্ন: দালালচক্র ও অসচেতনতা

মৃত্যুফাঁদে ইউরোপ স্বপ্ন: দালালচক্র ও অসচেতনতা
×

সম্প্রতি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনাহারে নৌকার মধ্যে একাধিক তরুণের মৃত্যুর খবর আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছে

আকাশ চৌধুরী 

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭:১৭

দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণদের একটি বড় অংশ আজ স্বপ্ন দেখছে ইউরোপে যাওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ যখন অবৈধ, অনিশ্চিত এবং মৃত্যুফাঁদে ভরা, তখন তা আর স্বপ্ন থাকে না; হয়ে ওঠে নির্মম বাস্তবতার এক ভয়ংকর পরিণতি। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনাহারে নৌকার মধ্যে একাধিক তরুণের মৃত্যুর খবর আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছে। আরও হৃদয়বিদারক হলো, তাদের মৃতদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা। প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুর দায় কাদের?

নিঃসন্দেহে দালালচক্র এ ক্ষেত্রে প্রধান অপরাধী। তারা তরুণদের চোখে ইউরোপের রঙিন স্বপ্ন আঁকে- উন্নত জীবন, উচ্চ আয়, সুন্দর ভবিষ্যৎ। অথচ বাস্তবতা হলো, এই পথ কেবল প্রতারণা, শোষণ ও জীবনের ঝুঁকিতে ভরা। দালালরা জানে, অবৈধ পথে ইউরোপে পৌঁছানো কতটা কঠিন, তবুও তারা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ যেন মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে ব্যবসা করার এক নিষ্ঠুর খেলা।

তবে একথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শুধুমাত্র দালালদের দোষারোপ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের তরুণ সমাজ এবং তাদের অভিভাবকদেরও এখানে বড় ধরনের দায়িত্ব রয়েছে। কেন তারা বারবার একই ফাঁদে পা দেন? কেন তারা বৈধ পথ থাকা সত্ত্বেও অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ান? ইউরোপে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে বৈধভাবে আবেদন করার সুযোগ তো রয়েছে। তাহলে কেন এই শর্টকাট, যা শেষ পর্যন্ত জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?

এই প্রবণতার পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং হতাশা। দ্বিতীয়ত, বিদেশে দ্রুত সফল হওয়ার অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা। তৃতীয়ত, সামাজিক চাপ। বিদেশে গেলে ‘সফল’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মানসিকতা। এই তিনটির সমন্বয়ে অনেকেই যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলেন এবং দালালদের ফাঁদে পা দেন।

অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় অনেকেই ভিটেমাটি বিক্রি করে দেন, ঋণগ্রস্ত হন। কিন্তু তারা একবারও ভাবেন না, এই অর্থ দিয়ে যদি দেশে কোনো ব্যবসা বা কৃষিকাজে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে হয়তো নিরাপদ ও টেকসই আয়ের পথ তৈরি হতে পারত। কৃষি, খামার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উদ্যোগ; এসব ক্ষেত্র আজও সম্ভাবনাময়। অথচ আমরা সেই সম্ভাবনাকে অবহেলা করে অনিশ্চিত বিদেশযাত্রার পেছনে ছুটছি।

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সময় দালালদের গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর শাস্তির নজির খুবই কম। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা আবারও বেরিয়ে আসে এবং আগের মতোই প্রতারণা চালিয়ে যায়। ফলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। দালালদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে এই অপরাধ বন্ধ করা কঠিন।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে—বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, যেখানে এই প্রতারণার শিকার বেশি মানুষ হন। দ্বিতীয়ত, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। তৃতীয়ত, দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এবং সর্বোপরি, তরুণদের দেশের ভেতরেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবন কোনো পরীক্ষার বস্তু নয় যে, ঝুঁকি নিয়ে দেখা যাবে কী হয়। অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার এই প্রবণতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। তাই এখনই সময় বাস্তবতা বোঝার, সচেতন হওয়ার এবং এই মৃত্যুফাঁদ থেকে নিজেদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার।

আকাশ চৌধুরী: সাংবাদিক
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×