ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানব পাচার

অভিবাসনের অধিকার বনাম পাচারের ফাঁদ 

অভিবাসনের অধিকার বনাম পাচারের ফাঁদ 
×

শশাঙ্ক সাদী

শশাঙ্ক সাদী

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টায় ১৮ জন বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বিপজ্জনক এ অভিবাসন প্রক্রিয়া আবারও আলোচনায়। অপার সৌন্দর্যের ভূমধ্যসাগর যেন আজ বাংলাদেশিদের স্বপ্নের সমাধিতে পরিণত। ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এ পথে ইউরোপে আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে অভিবাসন নেওয়ার চেষ্টায় বহু শিশুসহ ২৮ সহস্রাধিক মানুষ মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা সঠিকভাবে না জানা গেলেও একেবারে কম নয়। 

অভিবাসন বনাম পাচার, ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার: 
মানব পাচার ও এর পরিণাম নিয়ে যে কোনো আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার, অভিবাসন একটি মানবিক অধিকার। অন্যদিকে মানব পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। অভিবাসন প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে মানুষের সচেতন পছন্দের ওপর। আর মানব পাচার গড়ে ওঠে শঠতা, প্রলোভন, প্রতারণা ও জবরদস্তির ওপর। কিন্তু যখন উন্নত দেশগুলোতে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী অভিবাসনের পথ রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতায় সীমিত হয়ে পড়ে, তখন অভিবাসন ও পাচারের সীমারেখা অস্পষ্ট হতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ অনানুষ্ঠানিক ও বিপজ্জনক পাচারের পথের দিকে ধাবিত হয়, যেখানে শোষণ ও প্রতারণা প্রায় অনিবার্য পরিণতি। 
আবার যারা অভিযানে সর্বস্ব হারিয়ে কোনো রকমে গন্তব্য দেশের কূলে ওঠে, তাদের আমরা কীভাবে কোন চোখে দেখি, তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। প্রায়ই রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাস্তবে তারা সেসব মানুষ, যারা পাচারকারীদের তৈরি চরম অমানবিক, নিষ্ঠুর এবং বর্বর এক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও অসম্ভব জীবনীশক্তির কারণে টিকে গেছে।

বাংলাদেশিদের বিপন্নতার স্বরূপ
আমরা যদি একটু গভীরে যাই তাহলে দেখতে পাই, বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের মূলে রয়েছে জলবায়ুগত বাস্তুচ্যুতি ও স্থানান্তরের চাপ এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চাপের এক কঠোর সংমিশ্রণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভোলা, শরীয়তপুর, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রামে যমুনা-মেঘনা-পদ্মা-ধরলা নদীতীরে সৃষ্ট নীরব ভাঙন রাতারাতি ঘরবাড়ি-কৃষিজমি গ্রাস করে নেয়। মানুষ নতুন করে গড়ে তোলার জন্য কোনো অবলম্বন পায় না। নিঃস্ব হয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক আশ্রয় খোঁজে ছোট থেকে বড় শহরে। এই রকম পরিস্থিতিতে অভিবাসন কেবল একটি আকাঙ্ক্ষা নয়; বেঁচে থাকার অন্যতম কৌশল হয়ে ওঠে।
তারা জীবনকে সুন্দর করতে শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি পথ খোঁজে। কিন্তু তাদের কাছে পাচারের দালালরা প্রায়ই বিক্রি করে একটি বিভ্রম– দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশে উচ্চ বেতনের চাকরি বা ইউরোপে যাওয়ার একটি মসৃণ পথের প্রতিশ্রুতি। দালালরা মিষ্টি কথার আড়ালে তাদের কাছ থেকে শুরুতেই বিপুল টাকা হাতিয়ে নেয়। ফলে বেশির ভাগ অভিবাসনপ্রত্যাশী ও তাদের পরিবার যাত্রা শুরু করার আগেই এক জটিল ফাঁদ আর ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। তাদের আর পিছু হটার পথ থাকে না। 

নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন
মানব পাচার রোধে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ ২০২৫’ এমনই একটি মাইলফলক। এই অধ্যাদেশ পাচার-ভুক্তভোগীদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা উচিত নয় বলে সুস্পষ্ট স্বীকৃতি দিয়েছে। 
কিন্তু শুধু একটি শক্ত আইনই যথেষ্ট নয়। আজও হাজার হাজার পাচারের মামলা আদালতে আটকে আছে এবং সেখানে দণ্ডপ্রাপ্তির হার খুবই কম। এটি পরিষ্কার ইঙ্গিত করে– আইনি ব্যবস্থাটি কাজ করছে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি অগ্রাধিকারের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার:
১. প্রতিরোধ ব্যবস্থা: জলবায়ু সহনশীলতা এবং সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগের মাধ্যমে জলবায়ু বিপন্ন অঞ্চলগুলোতে টেকসই অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি করা, যাতে উন্নত জীবনের আশায় মানুষকে বেপরোয়া হয়ে উঠতে না হয়। 
২. সুরক্ষা দেওয়া: ভুক্তভোগীদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা, যাতে তারা নিজেদের অপরাধী মনে না করে।
৩. বিচার নিশ্চিত করা: শুধু স্থানীয় দালাল নয়; পাচারের পেছনের নেটওয়ার্ক এবং অর্থায়নকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পেতে পারে।
৪. অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা: পাচারের পথগুলো বন্ধের জন্য আন্তঃসীমান্ত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তৈরি ও কার্যকর করা জরুরি। আন্তর্জাতিক ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা ছাড়া মানব পাচার প্রতিরোধ করা অসম্ভব। কারণ পাচারকারী চক্র অত্যন্ত সক্রিয়, বিস্তৃত এবং বেপরোয়া। 
সর্বোপরি প্রয়োজন অভিবাসন ও বিদেশে কর্মজীবী নারী ও পুরুষ শ্রমিক নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জবাবদিহি। শহরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংস্থা থেকে শুরু করে গ্রামের অনানুষ্ঠানিক দালাল পর্যন্ত পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়ার ওপর শক্তিশালী ও ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় নজরদারি প্রয়োজন। এগুলো না করলে নীতি এবং বাস্তবতার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানের সুযোগ নেওয়া অব্যাহত থাকবে।

সুদূর দিগন্তের ওপারে
আর্থসামাজিক হতাশার বিরুদ্ধে শুধু সচেতনতা তৈরির কাজ দিয়ে পাচারবিরোধী লড়াই চলে না। যখন মানুষ দারিদ্র্য বা বাস্তুচ্যুতির বিপরীতে একটি বিপজ্জনক যাত্রাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিকল্প হিসেবে পায়, তখন তারা ঝুঁকি নেওয়াকেই একমাত্র ন্যায়সংগত উপায় বলে মনে করতে শুরু করে।
শক্তিশালী বাংলাদেশ মানে হলো এমন এক দেশ, যেখানে অভিবাসন হবে একটি পছন্দ; শেষ অবলম্বন নয়। এমন এক পরিবেশে মানুষ হতাশা থেকে নয়, বরং আশা থেকে সুযোগ খুঁজবে, নিজেদের প্রত্যাশা ও সামর্থ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে এবং নিরাপদ অভিবাসনের মাধ্যমে নিজেদের এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। 

শশাঙ্ক সাদী: উন্নয়ন বিশ্লেষক 
ও আইজেনহাওয়ার ফেলো 
 

আরও পড়ুন

×