বাংলাদেশ-ভারত
নতুন-পুরনো সম্পর্ক কোন পথে?
ছবি-সংগৃহীত
আহমেদ সুমন
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:৩৮
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামী ৭ এপ্রিল ভারত সফরে যাচ্ছেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বর্তমান সরকার গঠিত হওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটি প্রথম দ্বি-পাক্ষিক সফর। প্রতিবেশি ভারতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বিদেশ মন্ত্রী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ভ্রাতৃপ্রতীম বা বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিজ দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখাই মুখ্যত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ।
বাংলাদেশের নির্বাচন উত্তর এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় জ্বালানি নিয়ে বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীল অবস্থা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় খলিলুর রহমানের ভারত সফর তাৎপর্যপূর্ণ। মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠেয় ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে খলিল ঢাকা ছাড়ছেন। ওই কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আগে তিনি দিল্লি যাচ্ছেন। তিনি ৭ ও ৮ এপ্রিল দিল্লিতে অবস্থান করবেন। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফরের প্রথম দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর ৮ এপ্রিল তিনি ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূস গোয়ালের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
এ সফরে কী কী বিষয় আলোচনায় প্রাধান্য পাবে, পাঠক মাত্রই সেসব বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ রয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২০২৬-২০২৭ এর সভাপতি পদের জন্য বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ভারতের সমর্থন চাইবেন বলে আগাম তথ্য প্রকাশ করেছে। দুই দিনের এ সফর শুধুমাত্র তাঁর প্রার্থী পদে সমর্থনই নয়, বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক অন্যান্য বিষয়াদি নিয়েও যে আলোচনা হবে তা অনুময়ে। এছাড়াও বাংলাদেশে বিগত জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে পতিত শেখ হাসিনা সরকারের পর ড. ইউনূস সরকারের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি হওয়ার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত হওয়ার পর সেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতির ব্যাপারও গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা যায়।
এসবের বাইরে বর্তমানে বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত-বাংলাদেশকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, সেসব বিষয় মুখ্য হয়ে উঠবে। আনুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয়াদি প্রচার মাধ্যমে বা বাইরে প্রকাশ হয়। অনানুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয়ের গুরুত্ব বেশি থাকলেও তা আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সীমিত থাকে। সফর পরবর্তী উভয় দেশের নেতৃত্বের নীতি-কৌশল বা আচার-আচরণের মধ্যে তা প্রতিভাত হয়। এই সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয় হিসেবে জ্বালানি সহায়তা নিয়ে ড. খলিলুর রহমান ভারতের জ্বালানিমন্ত্রী হরদ্বীপ পুরির সঙ্গে বৈঠক করবেন। এই বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় বাংলাদেশে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত জ্বালানি হিসেবে বিশেষত ডিজেল সরবরাহের জন্য ঢাকার অনুরোধ তুলে ধরবেন। বিভিন্ন সূত্রগুলো অবশ্য জানিয়েছে, ভারতের নিজস্ব জ্বালানির চাহিদা, জ্বালানি মজুতের প্রাপ্যতা এবং পরিশোধনক্ষমতা মাথায় রেখে এই অনুরোধগুলো পূরণের আশ্বাস দেওয়া হতে পারে।
অনেকের জানা যে, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানি করে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কারণে এতে বাধাঁ-বিপত্তি সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানি নিয়ে দেশের টালমাটাল অবস্থা মোকাবেলায় বাংলাদেশ ভারতের সহযোগিতা কামনা করেছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছে। এই ইচ্ছাটি ভারতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুমতি চাওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। জনমনে প্রতিক্রিয়া যাই হোক, ড. খলিল সম্ভবত এই জ্বালানি বিষয়ে অধিক গুরুত্বারোপ করবেন।
অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এ ধরনের বিষয়গুলো ভেতরেই থেকে যায়। আনুষ্ঠানিক আলোচনায় শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে পানি পাওয়ার প্রসঙ্গও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হতে পারে। স্মর্তব্য যে, ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩০ বছর মেয়াদি পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির আওতায় উজান তীরবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে পানি ছাড়ার জন্য বাধ্য ভারত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা অনুযায়ী পানি পাচ্ছে না। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় বর্তমান সরকারকে এ চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
এ কথা সকলের জানা যে, ড. খলিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁর নিয়োগদানের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সমালোচনা করা হয়। ড. খলিল দীর্ঘ দিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধাচারীরা তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন। সে কারণে তিনি বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধ্যান্য দেন বলে অভিযোগ করা হয়। তবে নির্বাচন উত্তর বিএনপি সরকারের টেকনোক্রেট কোটায় তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রেখে দেওয়ার ঘটনা অনেকের কাছে বিস্ময় সৃষ্টি করে।
ভারত বাংলাদেশের শক্তিশালী প্রতিবেশি। ভারত বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী। বাংলাদেশ সরকারকে দেশের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা এবং স্থিতিশীলতার স্বার্থে ভারত সরকারের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক বিবেচনায় রেখে অগ্রসর হতে হয়। চীনও বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী। এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশীজন হিসেবে কাজ করে। সব পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে দেশের স্বার্থে নীতি-কৌশল গহণ করতে হয়। দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম রাষ্ট্রগুলোকে নিজ বলয়ের মধ্যে রাখার লক্ষ্যে ভারত এবং চীনের স্নায়ুযুদ্ধ চলমান। বাংলাদেশ এই দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে একটা ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার কৌশল অবলম্বন করছে।
শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ভারত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করলেও ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দূরত্ব অনেক বেড়েছিল। ঢাকা-দিল্লির পারস্পরিক অভিযোগ ও জনবিক্ষোভের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক তলবের ঘটনাও ঘটেছে। ভারত এই অবস্থা উত্তরণে সেই সময় থেকে বাংলাদেশে অর্ন্তরভুক্তিমূলক নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার অপেক্ষা করেছিল।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন বার্তা তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে। এর মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদী বিগত ১৮ মাসের তিক্ততার অবসান ঘটনানো ঘটিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
ওপরে বর্ণিত বিষয়াবলির কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের ভারত সফর যতোটা না আনুষ্ঠানিকতার ওপর ফোকাস থাকবে, তারচেয়ে বেশি ফোকাস থাকবে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায়। প্রকৃতপক্ষে ড. খলিল এবং ড. এস জয়শঙ্করের বৈঠকে দুই দেশের নতুন-পুরনো সম্পর্ক কোন পথে এগুবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ড. আহমেদ সুমন: গবেষক ও বিশ্লেষক
- বিষয় :
- বাংলাদেশ
- ভারত
- সম্পর্ক
- ভূরাজনীতি
- পররাষ্ট্রমন্ত্রী
