ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জনপদের জলঘড়ি থেকে সুলতানের দরবারে বৈশাখ

জনপদের জলঘড়ি থেকে সুলতানের দরবারে বৈশাখ
×

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আশফাকুজ্জামান

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:৩৮ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২২:০৯

জনপদের ভোরে বৈশাখ– সে এক দীর্ঘ বিবর্তনের গল্প। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০-৪০০ বছর আগের কথা। কল্পনা করা যায়, আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের সেই বাংলা কেমন ছিল। এর বৈশাখই বা কেমন ছিল। আকাশে তীক্ষ্ণ রোদ। নিচে ঘাস। জঙ্গল আর নদীর শাখা। বাংলা তখনও একক কোনো রাজার অধীনে নয়। পুণ্ড্র, রাঢ়, বঙ্গ, হরিকেল, সমতটসহ নানা জনপদে বিভক্ত।

কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, তখনও বাংলার মাটিতে বৈশাখ আসত। আর সে বৈশাখে যেমন তীব্র দহন, তেমনি আকাশে মেঘের খেলা। আর কালবৈশাখী যেন এর অনিবার্য সঙ্গী। আমাদের উত্তরপুরুষেরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করত।

তারপর আসে নতুন ফসল তোলার সময়। মনের ভেতর এক উন্মাদনা। মাঠ থেকে ঘরে ওঠে শস্য। তখন শুরু হয় আনন্দ। গোষ্ঠীপ্রধানেরা মিলে হতো ‘সমাজ’ নামের এক অনুষ্ঠান। নাচ, গান, কুস্তি আর উৎসব। এটি ছিল প্রকৃতি ও ফসলের উৎসব। সম্রাট আকবরের বাংলা সন প্রবর্তনের বহু শতাব্দী আগে থেকেই এই জনপদে বৈশাখ ছিল প্রাণের উৎসব। কিন্তু উৎসবের রং ছিল ভিন্ন।

আজকের দিনের মতো সময়ের হিসাব তখন ছিল না। ঘড়ি নেই। সময় মাপার যন্ত্র নেই। আছে শুধু সূর্যের ছায়া। সূর্যের অবস্থান দেখে দিনকে ভাগ করা হতো। সূর্য মাথার ওপর মানে দুপুর। বড় জনপদের রাজদরবারে থাকত ‘জলঘড়ি। জলঘড়ির ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকতে সময় লাগত তিন ঘণ্টা। একে বলা হতো এক ‘প্রহর’। তখন আট প্রহরে এক দিন হতো। রাতের বেলা প্রহরীরা শঙ্খ বাজিয়ে সময় বলত। প্রাচীন জনপদে তারিখকে ‘তিথি’ বলা হতো। আর তিথি ঠিক হতো চাঁদ দেখে। কখনও ১৯ আবার কখনও-বা ২৬ ঘণ্টায় এক তিথি। এ জন্য অনেক সময় একই দিনে দুই তিথি আবার একই তিথি দুই দিনের অংশ হতো।

প্রথমা, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া এভাবে তিথি গণনা হতো। মাসের প্রথম ১৫ দিন ‘শুক্লপক্ষ’। পরের ১৫ দিন ‘কৃষ্ণপক্ষ’। শুক্লপক্ষের ১৫তম দিন পূর্ণিমা। কৃষ্ণপক্ষের ১৫তম দিন অমাবস্যা। মাসের নাম তখনও নক্ষত্রের নামেই ছিল। পূর্ণিমার রাতে চাঁদ যদি বিশাখা নক্ষত্রে থাকে, তবে সেই মাসটির নাম রাখা হতো বৈশাখ।

সময়ের বিবর্তনে জনপদের বিচ্ছিন্ন শাসন ব্যবস্থা একসময় ভেঙে পড়ে। তখন মগধের (বিহার) মৌর্যরা ভারতের বিশাল অংশসহ বাংলা জয় করে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১ থেকে ১৮৫ অব্দ পর্যন্ত ছিল এই মৌর্য যুগ। চন্দ্রগুপ্ত//, বিন্দুসার, অশোকসহ বাংলায় মৌর্য রাজবংশের প্রায় ১৩৭ বছরের শাসন ছিল। আজকের বিহার ও রাজধানী পাটনাকে তখন বলা হতো মগধ ও পাটলিপুত্র। বিশাল প্রাচীর। সুসজ্জিত দরবার। কঠোর নিয়ম।

মৌর্য যুগে বৈশাখ ছিল জাঁকজমকের মাস। বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ ও নির্বাণ– এই তিন ঘটনা একই তিথিতে। তাই সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের পর বৈশাখী পূর্ণিমা রাষ্ট্রীয় উৎসবে পরিণত হলো। তখনকার উৎসবের নাম ছিল ‘সমাজ’। মৌর্যরা ‘সমাজ’ আয়োজন করত। সেখানে রথ দৌড়, কুস্তি, নাচ ও গণভোজ হতো। উৎসব হলো সাত্ত্বিক ও মানবিক। বৈশাখে কৃষক ফসল তোলে। রাজাকে কর দেয়। তাই বৈশাখ হিসাব রাখারও মাস। তবে সময়ের হিসাব আগের চেয়ে বেশি নিখুঁত। 

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উপদেষ্টা কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্রে সময়ের বর্ণনা আছে। প্রাচীন জনপদের জলঘড়ি আরও উন্নত হলো। সময়ের ক্ষুদ্রতম একক থেকে দীর্ঘতম এককের হিসাব রাখা শুরু হয়। চোখের পলককে বলা হতো ‘নিমেষ’। সময়ের নতুন আরেক একক হলো ‘নালিকা’। এখনকার ২৪ মিনিটে এক নালিকা। ২ নালিকায় এক ‘মুহূর্ত’। ৩০ মুহূর্তে এক দিন।

এদিকে দুই মাস করে বছরকে ছয়টি ঋতুতে ভাগ করা হতো। ঋতুগুলো প্রায় এখনকার মতো, শুধু ‘শীত’ ঋতুকে বলা হতো ‘শিশির’। চন্দ্র-সৌর ক্যালেন্ডারে ১২ মাসে এক বছর। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটি অতিরিক্ত মাস যোগ করে ঋতুর সঙ্গে মিল করা হতো। এ থেকে বোঝা যায় তারা কত উন্নত ছিল।

মৌর্য বংশের পতনের পর বাংলায় দীর্ঘকাল রাজনৈতিক অস্থিরতা চলে। এরপর চতুর্থ শতকে শ্রীগুপ্তের হাত ধরে শক্তিশালী গুপ্ত বংশের উত্থান ঘটে। গুপ্ত বংশ প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীগুপ্ত। তাঁর পুত্র চন্দ্রগুপ্ত ৩২০ অব্দে সাম্রাজ্যের ভিত্তি গড়েন। বাংলা তখন হয়ে যায় গুপ্ত সাম্রাজ্যের অংশ।

এটি হলো ভারতীয় সভ্যতার ‘স্বর্ণযুগ’। এ সময় বৈশাখ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে রূপ নেয়। হিন্দু ধর্মের প্রভাবে বৈশাখে সংক্রান্তির পূজা হয়। বৈশাখী পূর্ণিমা বুদ্ধ পূর্ণিমা হিসেবেই পালিত হয়। নাট্যশাস্ত্রের বিকাশ হয়। বৈশাখের মেলায় নাটক, সংগীত ও নৃত্যের আসর বসে। ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খোলে। গুপ্ত শাসকেরা প্রজাদের ভালোবাসতেন। বৈশাখে কৃষকদের কর ছাড় দিতেন। দরিদ্রদের খাবার দিতেন। শিল্পী ও কারিগরেরা রাজকীয় অনুদান পেতেন। তখন সোনার মুদ্রা ছিল।

গুপ্ত যুগে সময়ের হিসাব আরও কাঠামোবদ্ধ। সে সময়ের জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট ও বরাহমিহির জ্যোতির্বিদ্যাকে দারুণ উন্নত করেন। এ ক্ষেত্রে ‘পঞ্চাঙ্গ’ ব্যবহার হতো। ‘পঞ্চাঙ্গ’ হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পঞ্জিকা। এর অর্থ পাঁচ অঙ্গ। এই পাঁচটি অঙ্গ হলো– তিথি, বার, নক্ষত্র, যোগ, করণ।

তিথি: চন্দ্র ও সূর্যের ১২ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্বকে এক তিথি বলে। বার: প্রতিদিনকে একেকটি বার বলে। বারকে গ্রহের নামে– রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্র বলে ডাকা হতো। নক্ষত্র: আকাশের যে পথ দিয়ে চাঁদ চলে জ্যোতির্বিদেরা তাকে ২৭টি ভাগ করেছেন। এর প্রত্যেক ভাগকে একেকটি নক্ষত্র বলে। মাসের নাম ঠিক করা হতো নক্ষত্র থেকে। প্রতি পূর্ণিমায় চাঁদ যে নক্ষত্রে থাকে, সেই নক্ষত্রের নাম অনুসারে মাসের নাম রাখা হয়। যদি কোনো পূর্ণিমায় চাঁদ চিত্রা নক্ষত্রে থাকে, তবে সে মাসের নাম হবে চৈত্র। চৈত্র থেকে ফাল্গুন এই ১২ মাসকে বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত ও শীত এই ছয় ঋতুতে ভাগ করা হয়েছিল।

৩৬৫ দিনে সৌরবছর এবং ৩৫৪ দিনে চান্দ্রবছর হওয়ায় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদেরা তৃতীয় বছরের সঙ্গে এক মাস যোগ করে সমন্বয় করতেন। যোগ: গুপ্ত আমলের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীকে কেন্দ্র ধরে আকাশকে ৩৬০ ডিগ্রির এক বৃত্ত কল্পনা করেছেন। আকাশে ২৭টি নক্ষত্র থাকায় বৃত্তকে সমান ২৭টি ভাগ করেছেন। এর এক ভাগের পরিমাপ ১৩ ডিগ্রি ২০ আর্কমিনিট । চন্দ্র এবং সূর্যের দূরত্ব যোগ করে ১৩ ডিগ্রি ২০ আর্কমিনিট দিয়ে ভাগ করে ‘যোগ’ নির্ণয় করতে হয়।

এক তিথিতে দুই করণ। মাসে ৩০ তিথিতে ৬০ করণ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা করণকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। চারটি স্থির করণ। সাতটি চর বা পরিবর্তনশীল করণ। স্থির করণ একবারই আসে। এই সাতটি চর করণ মাসে আটবার চক্রাকারে ৫৬ বার আসে। এখন যেমন বছরকে সাল বলা হয়, তখন বলা হতো গুপ্তাব্দ।

ষষ্ঠ শতকের পর ভেঙে পড়ে গুপ্ত সাম্রাজ্য। বাংলায় শুরু হয় অরাজকতা বা ‘মাৎস্যন্যায়’-এর যুগ। এই বিশৃঙ্খলা কাটাতে প্রজারা গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেন। সেটা ছিল অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক। পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা গোপাল। বাংলায় শুরু হয় পাল রাজবংশের শাসন। ধর্মপাল, দেবপাল রাজ্যকে আরও বিস্তৃত করেন। 
বাংলার ইতিহাসে পাল শাসন ছিল এক আলোকিত অধ্যায়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রের তীরে গড়ে ওঠে বৌদ্ধ সভ্যতা। জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র হয়ে ওঠে নালন্দা ও বিক্রমশীলা মহাবিহার। এ সময় প্রথম বাংলায় লিখিত ইতিহাসের সন্ধান মেলে।

পাল যুগে বৈশাখ ছিল ভিক্ষু ও কৃষকের মেলবন্ধন। বৈশাখী পূর্ণিমায় বিহারগুলোয় হাজার হাজার ভিক্ষু আসত। তাঁরা বৌদ্ধ পূজা করত। তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে বৈশাখের উৎসবে মিশে যায় মাটির গান ও দেহতত্ত্ব। তবে বৈশাখে ফসলের ওপর কর নিয়ে কৃষকের অসন্তুষ্টি ছিল। পাল আমলের শেষ দিকে বাংলায় ‘কৈবর্ত’ নামে কৃষক বিদ্রোহের দানা বাঁধে।

গুপ্ত যুগে জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট ও বরাহমিহির যে গাণিতিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, পাল যুগে এসে তা আরও জনপ্রিয় ও সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে। পাল যুগে ব্যবহৃত তিথি, বার, নক্ষত্র, যোগ ও করণের সূক্ষ্ম হিসাব মূলত গুপ্ত যুগেরই অবদান। কেবল গুপ্ত যুগের গুপ্তাব্দ পাল যুগে হয় শকাব্দ (বছর)।

সেটা ছিল দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়। তখন পাল রাজারা দুর্বল হয়ে পড়ে। সে সময় দক্ষিণ ভারত থেকে  আসে সেনরা। মৌর্য, গুপ্ত  এবং পাল যুগ পেরিয়ে বাংলায় শুরু সেন যুগ। তখন একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী। বাংলা তখন সেন রাজাদের অধীন। তারা এখানে আধিপত্য বিস্তার করে। সামন্ত সেন, বিজয় সেন, বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন। হিন্দু ধর্মের পুনরুজ্জীবন। মন্দির উঠছে। সংস্কৃত সাহিত্য এসেছে। বৈষ্ণব ভক্তির স্রোত বইছে।

কিন্তু বৈশাখে সেই আগের মতোই গা পোড়ানো উত্তাপ। তবু তার মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তি। নদীর পাড়ে সোনালি ধান। কৃষকের ঘরে ফসল। চারদিকে আনন্দ-হিল্লোল। এক নতুন যুগের সূচনা। কিন্তু বৈশাখ শুধু সময় নয়। বৈশাখ জীবন। বৈশাখে নতুন ফসল তোলে কৃষক। রাজাকে কর দেয়। কিন্তু সেন রাজারা কর ছাড় দেন। দরিদ্রকে অন্ন দেন। শিল্পী-কারিগর পায় রাজকীয় অনুদান। ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খোলে। হালখাতার প্রথা শুরু হয় তখন থেকেই।

বৈশাখী পূর্ণিমায় বুদ্ধের স্মৃতি মিলে যায় বিষ্ণুর ভক্তিতে। মন্দিরে মন্দিরে সংক্রান্তির পূজা। নাচ-গানের আসর। নাট্যশাস্ত্রের ধারা আরও সমৃদ্ধ। বৈশাখের মেলায় রথ দৌড়, কুস্তি, গণভোজ। ‘সমাজ’ উৎসব এখনও আছে।

লক্ষ্মণ সেনের সময় বৈশাখে বৈষ্ণব ভক্তি ফুটে ওঠে। বিষ্ণুর নামে গান। মন্দিরের প্রাঙ্গণে আলপনা। কুলীন ব্রাহ্মণদের আগমন। সংস্কৃতির নতুন ঢেউ। বৈশাখ তখন শুধু ফসলের উৎসব নয়। সভ্যতার উৎসব। সময়ের সঙ্গে মানুষের যোগসূত্র। সময় গণনা আগের মতোই। শুধু লক্ষ্মণ সেনের নামে লক্ষ্মণ সংবৎ বর্ষপঞ্জি চালু হয়।

সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেনের সময় নান অরাজকতা সৃষ্টি হয়। তখন বখতিয়ার খিলজির অতর্কিত বাংলা আক্রমণ করেন। এই আক্রমণের মধ্য দিয়ে সেন শাসনের পতন হয়। এভাবে বাংলায় সূচনা হয় মুসলিম শাসনের। সেটা প্রায় ১২০৪-১৫২৬ সালের কথা।

সে এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণের সময়। রাজদরবারে আরবি-ফারসি। অন্যদিকে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। রাজপরিবার ইসলাম পালন করলেও সাধারণ মানুষের ‘বৈশাখী মেলা’ মোটেও থেমে থাকেনি। সে সময় হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সম্প্রীতি ছিল। বৈশাখী মেলায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা একসঙ্গে নাগরদোলায় চড়ত। একসঙ্গে খেলত, ঘুরত, আনন্দ করত। সেখানে ধর্মের চেয়ে মিলনের আনন্দ ছিল বেশি।

পুতুলনাচ আর যাত্রাপালা ছিল গ্রামীণ বৈশাখের প্রাণ। মরমি কবিদের গানে তখন মেতে থাকত বাংলার জনপদ। বৈশাখী পূর্ণিমার দিন সুলতানরা কবি ও পণ্ডিতদের সম্মান জানাতেন। কবিদের দেওয়া হতো রাজকীয় পোশাক। শেষের দিকে শ্রীচৈতন্যের প্রভাবে বৈশাখী উৎসব আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। বাংলা জনপদে তখন গান আর কীর্তনের সুর।

বদলে গেল সময়ের হিসাব। বাংলায় শুরু হয় হিজরি সন। কিন্তু হিজরি সনে ৩৫৪ দিনে বছর। এই সনের সঙ্গে বাংলার ঋতুচক্র মেলে না। মাঠে যখন ধান পাকে, হিজরি ক্যালেন্ডারে তখন হয়তো হাড়কাঁপানো শীত। এ জন্য শাসকেরা হিজরি সন মানলেও সাধারণ কৃষকেরা নক্ষত্র পঞ্জিকা ছাড়েনি। 
সুলতানি আমল বাংলার সংস্কৃতি মুছে দেয়নি, বরং তাতে নতুন রং চড়িয়েছে। শাসকেরা হিজরি সন মানলেও সাধারণ মানুষের মনে রয়ে গেল সেই প্রাচীন বাংলার ফসল, ‘হালখাতা’ ও ‘মাটির গান’।

জনপদের সেই ছিদ্র জলঘড়ি আজ আর নেই। চলে যায় মুহূর্ত, দিন, মাস, বছর। কিন্তু বারবার ফিরে আসে বৈশাখ। বদলেছে রাজা, জনপদ, সংস্কৃতি। কিন্তু আকাশের চাঁদ, সূর্য আছে আগের মতোই। প্রাচীন বাংলার মানুষ সূর্যের ছায়া দেখে ‘প্রহর’ গুনত। মৌর্যরা ‘নিমেষ’ থেকে করে ‘নালিকা’। গুপ্তদের ‘হালখাতা’, গুপ্তাব্দ। পালের শকাব্দ, ভিক্ষুর গান। সেনেরা দিল সংবৎ। সুলতানদের আজান ও হিজরি সন। কিন্তু মাটির মানুষ তার ফসলের গান গেয়েই গেল। শুধু নাম বদলেছে। এখনও জনপদের জলঘড়ি থেকে ফোঁটা ফোঁটা সময় পড়ে। আর সেই শব্দে লেখা হয় বৈশাখীর গল্প।

আশফাকুজ্জামান: কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক
 

আরও পড়ুন

×