ইসলাম ও সমাজ
জিলকদ মাসে হজের ফ্লাইট শুরু
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম পবিত্র হজ, যা সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জীবনে একবার পালন করা ফরজ। হজের প্রস্তুতি মূলত শুরু হয় হিজরি সনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাস জিলকদ থেকে। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে হজযাত্রা এখন বিমানযোগে সম্পন্ন হয়। তাই এ মাস থেকেই হজের ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এর পেছনে শুধু আধুনিক ব্যবস্থাপনা নয়, বরং কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক গভীর তাৎপর্যও নিহিত।
প্রথমত, কোরআন মাজিদে মহান আল্লাহ সুরা আল-বাকারার ১৯৭ আয়াতে এরশাদ করেন– ‘হজের মাসগুলো নির্দিষ্ট।’
এ আয়াতে হজের জন্য নির্ধারিত মাসগুলোর কথা বলা হয়েছে, যা হলো শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ। অর্থাৎ জিলকদ মাস হজের প্রস্তুতির অন্যতম প্রধান সময়। এ মাস থেকেই হাজিরা ইহরাম, নিয়ত ও সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। জিলকদ মাস ইসলামে একটি সম্মানিত মাস (আশহুরুল হুরুম) হিসেবে পরিচিত। এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল এবং মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করত। হজের ফ্লাইট শুরু হওয়ার মাধ্যমে আজও সেই শান্তিপূর্ণ যাত্রার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। মানুষ দুনিয়ার ব্যস্ততা ছেড়ে আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের উদ্দেশে রওনা হয়।
হাদিস শরিফে বর্ণিত, রাসুলে কারিম (সা.) এরশাদ করেন– ‘যে ব্যক্তি হজের নিয়ত করে, সে যেন দ্রুত তা সম্পন্ন করে।’ (আবু দাউদ) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, যে কেউ হজের নিয়ত করলে দেরি না করে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। বর্তমান সময়ে হজের ফ্লাইট আগে থেকেই শুরু হওয়া এ নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ।
জিলকদ মাসে ফ্লাইট শুরু হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, হজের প্রতিটি রুকন যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করা। কারণ হজ একটি নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ইবাদত, যার মূল কার্যক্রম জিলহজ মাসে সম্পন্ন হয়। তাই আগেই মক্কায় পৌঁছে ইবাদতের মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
রাসুলে কারিম (সা.) নিজেও হজের সময় যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। বিদায় হজের সময় তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই সফর শুরু করেন, যাতে প্রতিটি আমল সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা যায়। এই দৃষ্টান্ত থেকে আমরা শিখি– হজ শুধু একটি সফর নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা, যার জন্য মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক প্রস্তুতি অপরিহার্য।
বর্তমান সময়ে বিমানযোগে হজযাত্রা সহজ হলেও এর মূল উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত। ফ্লাইট শুরু হওয়া মানে শুধু যাত্রা নয়, বরং আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া। মহান আল্লাহ সুরা আল-হাজ্জের ২৭ আয়াতে এরশাদ করেন– ‘মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে ও দূরদূরান্ত থেকে।’
আজকের দিনে এই ‘দূরদূরান্ত’ বিমানযোগে অতিক্রম করা হলেও এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য একই। এ ছাড়া জিলকদ মাসে হজের ফ্লাইট শুরু মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ একই উদ্দেশ্যে সমবেত হন। এতে জাতি, ভাষা ও বর্ণভেদ দূর হয়ে যায় এবং সবাই এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে একত্রিত হন।
সবশেষে বলা যায়, জিলকদ মাসে হজের ফ্লাইট শুরু হওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক বা আধুনিক ব্যবস্থাপনা নয়; বরং এটি কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য হজের প্রস্তুতির সূচনা; আত্মশুদ্ধির সুযোগ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ।
আমাদের উচিত এই মাসকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া, হজের জন্য আন্তরিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া এবং যারা হজে যেতে সক্ষম, তারা যেন দেরি না করে এই মহান ইবাদত পালন করেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র হজ পালন করার তাওফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার
