১৭ এপ্রিল
‘মুজিবনগর’ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধপন্থি সরকারের দ্বিধা কেন?
আদনান মনোয়ার হুসাইন
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
মহান মুক্তিযুদ্ধ কি শুধু একটি ঘটনা; একটি-দুটি দিন; একটি ঘোষণায় সীমাবদ্ধ? এর পূর্বাপর নেই; পরম্পরা নেই? এটি কি দুই পৃষ্ঠার ছোট্ট কোনো পুস্তিকা; ফ্রম ২৬ মার্চ টু ১৬ ডিসেম্বর; কালুরঘাট টু রেসকোর্স ময়দান? মুক্তিযুদ্ধ তো বহতা নদীর মতো; প্রবল যে নদীর গতিপথ নির্ধারিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনাবিন্দু ২৬ মার্চ তথা স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরুর ২২ দিন পর এসেছিল ১৭ এপ্রিল। তারিখটি সম্ভবত এখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নোটবুক থেকে হারিয়ে গেছে। এ জন্যই হয়তো এবার দিনটির কপালে রেডিমেড বাণীও জোটেনি! এই দিন ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা বা স্বাধীনতা অর্জন কি আদৌ সম্ভব হতো? ব্যক্তিগত বা পারিবারিক যোগসূত্র ছাড়া কোনো দিনই আসলে গুরুত্ববহ নয়!
ক্ষমতার পালাবদলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে কিছু ঘটনা, কিছু তারিখ স্রেফ ‘নাই’ হয়ে যায়। কিছু আবার বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে অতিমূল্যায়িত হয়। এ লজ্জাজনক মনোবৃত্তির সঙ্গে আমরা এতটাই অভ্যস্ত, খুব বেশি প্রশ্নও নেই এসব নিয়ে। নিজ মাতৃভূমির জন্মের ইতিহাস নিয়ে এমন ছেলেখেলা বিশ্বে সম্ভবত বিরল।
১৭ এপ্রিলকে বাদ দিয়ে কি মুক্তিযুদ্ধের আলোচনা সম্ভব কিংবা মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে কি ১৭ এপ্রিলকে এড়িয়ে যাওয়া যায়? আওয়ামী লীগ দিবসটি রেখেছিল ‘ক’ শ্রেণিতে। এদিন ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, পতাকা উত্তোলন, মেহেরপুরে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে শ্রদ্ধা নিবেদন, গার্ড অব অনার, জনসভা, ঢাকায় আলোচনা সভা থাকত। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাণী দিতেন। মুজিবনগর উপজেলায় থাকত সরকারি ছুটি।
এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট সবকিছুর ওপর আঘাতের মধ্যেও ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার মুজিবনগর দিবস পালন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম মুজিবনগর গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ইতিহাস কখনও মোছা যায় না।’ সে ধারা বজায় রাখলে মুক্তিযুদ্ধকে কোনো এক দলের জিম্মায় রেখে ফায়দা নেওয়া কঠিন হতো। সত্য, ১০ এপ্রিল গঠিত যে সরকার ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা থেকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছিল, সেই সরকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘সামনে রেখে’ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মন্ত্রিসভা, সেক্টর কমান্ডাররা দেশকে যেভাবে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছেন, সেই সাফল্য ও অর্জনের ভাগীদার হতে স্বাধীনতাপন্থি যে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের কোনো বাধা নেই। যে সত্য মোছা যায় না, তার সঙ্গে অহেতুক না লড়ে তাকে আত্তীকরণ করাই তো ভালো। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধকে সবার আপন করে নেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে সারাদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারক ভাঙচুর করা হয়। রেহাই পায়নি মুজিবনগর কমপ্লেক্সও। ওই দিনই সেখানে ছাত্র-জনতার নামে হামলা হয়। মুক্তিযুদ্ধকে ফুটিয়ে তোলা ৬০০টি ভাস্কর্যের মধ্যে ৪০ শতাংশই ভেঙে ফেলা হয়। গত বছর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়, মেরামত করতে ৬০ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু বরাদ্দ না পাওয়ায় সে কাজ আর হয়নি (সমকাল, ১৭ এপ্রিল ২০২৬)। দুই বছর হতে চললেও এগুলো এখনও এভাবেই আছে। একজন সেক্টর কমান্ডার, বীরউত্তমের হাতে গড়া দল এখন ক্ষমতায়। ১৭ এপ্রিল আসার আগেই তারা সংস্কার কাজটুকু অন্তত শুরু করতে পারত।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বিএনপির নেতাদের প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। স্বাধীনতার বিরোধিতায় তাদের দীর্ঘকালের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর কী ভূমিকা ছিল, তারা অকপটে বলেছেন। অনেকেই তখন আশাবাদী হয়ে ভেবেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের ‘একক মালিকানার দাবিদার’ আওয়ামী লীগ না থাকলেও বিএনপি এটিকে ডুবতে দেবে না; ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে। অবশ্য দুর্মুখেরা তখনও বলেছিলেন, পর্দার আড়ালের রাজনীতিতে বেকায়দায় পড়লেই কেবল হঠাৎ হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধের উদয় হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার ৭ মার্চ, ১৭ মার্চ ও ১৫ আগস্টকে জাতীয়ভাবে পালনের তালিকা থেকে বাদ দিলেও ১৭ এপ্রিল এখনও ‘ক’ শ্রেণিভুক্তই আছে। এরপরও মুক্তিযুদ্ধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিবসটি উপেক্ষিত থেকে গেছে। সরকারের সে মনোভাবের ছাপ স্থানীয় প্রশাসনেও। এবার মেহেরপুর বা মুজিবনগর প্রশাসন কোনো আয়োজন করেনি। স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক দলও কোনো কর্মসূচি রাখেনি। মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় জানান, তারা মৌখিকভাবে জানতে পেরেছেন, এবার মুজিবনগর দিবস পালন করা হচ্ছে না (সমকাল, ১৭ এপ্রিল ২০২৬)। তবে এবারও মুজিবনগরকে নিস্তব্ধ যেতে দেননি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। ঢাকা থেকে তাদের একটি দল বিকেলে সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নামক বৃক্ষটি কারও যোগ-বিয়োগের খেলায় নয়, বরং এ দেশের মানুষের ভালোবাসায় টিকে থাকবে অনন্তকাল– বিশিষ্টজনের উদ্যোগটি এরই ছোট্ট একটি স্মারক।
আদনান মনোয়ার হুসাইন: সহকারী
বার্তা সম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- মুজিবনগর সরকার
