ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

দুর্নাম হয়ে গেলে সুনাম রক্ষা হবে কীভাবে

দুর্নাম হয়ে গেলে সুনাম রক্ষা হবে কীভাবে
×

খাজা মাঈন উদ্দিন

খাজা মাঈন উদ্দিন

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৫ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধুচন্দ্রিমাকালে সাধারণত কোনো নির্বাচিত সরকারকে তেমন বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়তে হয় না। বিরোধী পক্ষ আক্রমণাত্মক থাকে না; গণমাধ্যম সদয় ভাব বজায় রাখে এবং জনসমর্থনের পারদ ইতিবাচক পর্যায়ে অবস্থান করে, যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়। এ সময়টা হতে পারে তিন থেকে ছয় মাস।

এবারের বাংলাদেশে নতুন সংসদীয় সরকার আসার পরের পরিস্থিতি অন্যান্য গণতন্ত্র থেকে ভিন্ন। ইরানের ওপর ইসরায়েলি-মার্কিন যুদ্ধের চাপ বাংলাদেশের জ্বালানি খাত, সার্বিক অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রবল। অন্যদিকে শাসক ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ২০২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী ঐকমত্য অনেকটাই ভেঙে গেছে এবং তারা দ্রুতই রাজনৈতিক বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুশাসন অর্জনের পথ অমসৃণ হয় এবং সরকারি দলের ভাবমূর্তিতে দাগ পড়া শুরু করে।

তবে সুনাম রক্ষা ও নিজস্ব কার্যক্রমের পক্ষে বয়ান তৈরি করতে আধুনিক রাজনৈতিক সরকারের এখতিয়ারে নানা রাষ্ট্রীয় যন্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সেগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে। ‘বিপজ্জনক’ তথ্য প্রবাহ থেকে নিস্তার পেতে বৃহৎ জাতীয় বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং করপোরেট নেতৃত্ব অধিক মনোযোগী ও কর্মতৎপর থাকে। কেউ কেউ বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং প্রয়োজনে পিআর (পাবলিক রিলেশন্স বা জনসংযোগ) ফার্ম নিয়োগ দেয়। উদ্দেশ্য মান রক্ষা ও জনপরিসরে নিজেদের সম্পর্কে ভালো আলোচনা চালু রাখা।

কিন্তু এখানে ঐতিহাসিকভাবে বিরোধী দল প্রতিবাদ করতে গিয়ে আক্রমণাত্মক থেকেছে বা থাকতে বাধ্য হয়েছে। আবার সরকারি দল বিরোধীদের ওপর চড়াও হয়ে গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটা অবশিষ্ট রাখেনি, যেমন হয়েছে শেখ হাসিনার আওয়ামী শাসনামলে। তাঁর অতি চালাক সহকর্মী ও সাঙ্গোপাঙ্গ মিলে এমন এক তথ্য প্রবাহের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে ছিল হাসিনা ও পরিবারের স্তুতি ও বন্দনা, বিরোধী পক্ষের আকাশ সমান নিন্দা এবং সমালোচক এমনকি সাধারণ মানুষের মুখ বন্ধ করার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।

সঠিক প্রচারের অভাব ও জনমত গঠনের ব্যর্থতায়ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ এবং গণতান্ত্রিক সরকার মার খায়। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী আওয়ামী লীগ ১৭৫ দিনের মতো হরতাল পালন করায় দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৪ সালেও বিএনপি সরকারের আমলে ষড়যন্ত্রমূলক ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সভায় (গ্রেনেড) হামলা চালানো হলে নানা মহলে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়। উভয় ক্ষেত্রেই সরকারের প্রচারযন্ত্র, গোয়েন্দা নেতৃত্ব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত রথী-মহারথীরা সঠিক তথ্য তুলে ধরতে এবং রহস্য উন্মোচন করতে না পারায় বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়; সেই সঙ্গে দেশও।

তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্রে নতুন নির্বাচিত সরকারগুলো একটি সাধারণ ভুল করে বারবার। শাসক দল ধরেই নেয়, তাদের মধুচন্দ্রিমাকাল শিগগিরই শেষ হচ্ছে না এবং গণমাধ্যম ও জনপরিসরে সরব বন্ধুরা ভোল পাল্টাবে না। মেয়াদের অর্ধেকটা চলে গেলে রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান গণমাধ্যমের আয়নায় দেখতে পান তাদের কাজে জনগণ অসন্তুষ্ট, এমনকি ক্ষুব্ধ; বিরোধী দলের মিছিল ও জনসভায় অনেক বেশি মানুষের অংশগ্রহণ।

প্রশ্ন উঠতে পারে, নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের ইতিবাচক ইমেজ ধরে রাখা এবং সম্ভাব্য জনসংযোগ সংকট মোকাবিলায় স্মার্ট প্রচার কৌশল কি সুনাম হারানোর ঝুঁকি থেকে মুক্তি দিতে পারবে?

যদি সরকারের প্রতিশ্রুত কর্মসূচির উদ্যোগ, জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা, কোনো সাফল্য বা মানবিক কাজের গল্প, ন্যায়নিষ্ঠার দৃষ্টান্ত, সরকারি কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন, সমালোচনার গঠনমূলক ব্যাখ্যা ও জবাব এবং প্রধানমন্ত্রীর নীতি-বিবৃতির মতো বিষয় যথাযথ তুলে ধরা হয়, তাহলে হয়তো কিছুটা অবকাশ মিলতে পারে। জনপরিসরে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তারকামূল্য এবং দৃষ্টান্তমূলক কর্মকাণ্ডের কাঙ্ক্ষিত প্রতিফলন ঘটলেও তা মিলতে পারে। অবশ্য এই প্রক্রিয়া অনেকটা নির্ভর করছে সরকারের জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা নানা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা কীভাবে কাজ করেন, প্রতিক্রিয়া দেখান এবং ‘গেম প্ল্যান’ করেন, তার ওপর।

তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মূলধারার গণমাধ্যম বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মেই ছাগলকে হাতি কিংবা রাতকে দিন হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষমতা রাখেন না। আর রাজনৈতিক সরকারের ক্ষেত্রে এর দুর্নীতি বা অন্যায় পদক্ষেপকে জনপ্রিয় করা তো বহু দূরের কথা, ভদ্রোচিত আড্ডায়ও নিজেদের অনুকূলে আলোচনা করা কঠিন।

সামাজিক মাধ্যমের যুগে অন্যের বক্তব্য খণ্ডন করতে গিয়ে ‘কেয়ারলেস’ যুক্তি দেওয়াও আত্মঘাতী। সম্প্রতি সরকারপক্ষের একজন সংসদ সদস্য সংবিধান ছুড়ে ফেলার অভিযোগ নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনা করেন। এরপর আমরা ভিডিও দেখলাম যেখানে তাঁকে ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলার’ পক্ষে কথা বলতে শোনা যাচ্ছে। 
আসলে রাজনৈতিক বক্তার চাতুর্য নয় বা কোনো মিডিয়ার পেশিশক্তি নয়, ঘটনার সত্যতা এবং পাত্র-পাত্রীর গ্রহণযোগ্যতাই পাবলিক পারসেপশন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পৃথিবীতে ইহুদি লবির যত সংখ্যক প্রভাবশালী মিডিয়া আছে, তাতে তাদের বয়ানই শেষ কথা হওয়ার কথা এবং তাই যদি হতো তাহলে গাজায় গণহত্যা এবং ইরানে অবৈধ যুদ্ধের জন্য ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল ও এর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মোটেও নিন্দিত হতেন না।

২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে যখন রিপাবলিক্যান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাবলিক ইমেজ অতিশয় খারাপ তখন ডেমোক্রেটিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বিতর্কে প্রতিপক্ষ মাইক পেন্সকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি ট্রাম্পের সাফাই গাওয়ার মতো অবস্থায় আছেন কিনা। পেন্স সে চেষ্টাই করেননি। নির্বাচনে ট্রাম্পের চেয়ে ৩০ লাখ বেশি ভোট পেয়েও হিলারি ক্লিনটন ইলেক্টোরাল কলেজে হেরে যান। অধিকাংশ মার্কিন মিডিয়া শিল্পসমৃদ্ধ রাজ্যগুলোয় ভোটারদের ক্ষোভ আমলেই নেয়নি এবং হিলারির টিম সেই ভোটারদের দ্বারে দ্বারে কড়া নাড়েনি। তার পরাজয় ছিল যোগাযোগ ব্যর্থতার চরম দৃষ্টান্ত।

ভালো প্রচারের জন্য সরকারের ভালো কর্মের কোনো বিকল্প নেই– সে পরামর্শ সরকারের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের থেকেও আসা উচিত।
বিএনপি সরকারের সুবিধা হচ্ছে, চলমান ও আগামী রাজনৈতিক ও জনসংযোগ চ্যালেঞ্জ অনুমান করে অগ্রিম পদক্ষেপ তৈরি রাখার সুযোগ আছে এখনও। একই সঙ্গে ক্ষমতার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য চোখে পর্দা পড়া, ঔদ্ধত্য দেখানো, দুর্নীতিপ্রবণ হওয়া এবং জনগণকে বোকা ভাবার মানসিকতা বিএনপি সরকারকে গ্রাস না করলে এর যোগাযোগ টিম স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবে এবং তাতে সরকারের সঙ্গে জনগণের সংযোগ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হবে না।

গণতন্ত্রে কোনো রকমে জনগণকে পটিয়ে এক দিনের নির্বাচনী ম্যান্ডেট নিতে পারলেই জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা হয় না। পাবলিক ম্যান্ডেট প্রতিনিয়ত নবায়ন করতে হয় মানুষের কাছে কৈফিয়ত দিয়ে এবং নানা মাধ্যমে তাদের মতামত ও সম্মতি নিয়ে। আব্রাহাম লিংকনের উদ্ধৃতি দিয়েই বলা হয়– আপনি কিছু মানুষকে সবসময় বোকা বানাতে পারবেন এবং সব মানুষকে বোকা বানাতে পারবেন কিছু সময়ের জন্য; কিন্তু আপনি সব মানুষকে সবসময় বোকা বানাতে পারবেন না।

খাজা মাঈন উদ্দিন: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×