মানবসম্পদ
পরিকল্পনাহীন বিশ্ববিদ্যালয় বনাম উচ্চশিক্ষার মান
মো. আশরাফুজ্জামান
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে গত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটেছে দ্রুত। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকে অনেকে শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ ও সুযোগ সম্প্রসারণের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখেন। সত্যিই; তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিস্তার কি পরিকল্পিত ও মানসম্মত? নাকি অবকাঠামো, শিক্ষক ও গবেষণা সক্ষমতা ছাড়াই একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার গুণগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে?
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ওয়েবসাইটে বর্তমানে দেশে ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ১১৬টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, তিনটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় তালিকাভুক্ত। অর্থাৎ মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১৭৭। এর মধ্যে সম্প্রতি আরও একটি নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংখ্যার এই দ্রুত বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে নজরকাড়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ এখনও মৌলিক অবকাঠামো ও মানবসম্পদের সংকটে ভুগছে।
নতুন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠার পাঁচ থেকে সাত বছর পার হলেও স্থায়ী ক্যাম্পাস বা পর্যাপ্ত জমি নেই। ভাড়া করা ভবন বা বাসাবাড়িতে অস্থায়ীভাবে ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞান সৃষ্টি ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে লাইব্রেরি, গবেষণাগার, আবাসন সুবিধা, একাডেমিক পরিবেশ– সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস সংস্কৃতি প্রয়োজন। অথচ অনেক প্রতিষ্ঠানে সেই মৌলিক কাঠামোই অনুপস্থিত।
ল্যাবরেটরি, গবেষণা সুবিধা বা আধুনিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামো না থাকলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা প্রকৌশল শিক্ষার মান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান পেলেও বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এই ঘাটতি কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রতিযোগিতার ক্ষমতাকেও দুর্বল করে।
অবকাঠামোর পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হলো দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব। নতুন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই পর্যাপ্ত সংখ্যক স্থায়ী শিক্ষক নেই। বিশেষ করে অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের শিক্ষক সংকট প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে অল্পসংখ্যক শিক্ষককে একাধিক কোর্স নিতে হয়। ফলে গবেষণা বা একাডেমিক উন্নয়নে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না।
উচ্চশিক্ষার মূল শক্তি হলো শিক্ষক ও গবেষণা। শিক্ষক গবেষণায় সক্রিয় না থাকলে; আন্তর্জাতিক একাডেমিক নেটওয়ার্কে যুক্ত না থাকলে শিক্ষার মানও সীমিত হয়ে যায়। অথচ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কখনও কখনও দ্রুত সম্প্রসারণের চাপে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা দেখা যায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদিত অনেক বিষয়ই গতানুগতিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক। ব্যবসায় প্রশাসন, ইংরেজি, কম্পিউটার সায়েন্স ইত্যাদি বিষয় প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে। কিন্তু নতুন যুগের চাহিদাভিত্তিক বিষয় যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, রোবটিকস, সাইবার সিকিউরিটি, বায়োইনফরমেটিক্স বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি; এসব ক্ষেত্রে উদ্যোগ তুলনামূলক সীমিত।
ফলে শিক্ষার্থীরা চার বছর পড়াশোনা শেষ করার পরও অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সুযোগ পায় না। আধুনিক অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত থাকে। কিন্তু আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এখনও শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিছু উদ্যোগ আশার আলো দেখায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ-এর কথা, যেখানে তুলনামূলক সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর বিষয় চালুর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, প্রতিষ্ঠার প্রায় এক দশক পরও বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি এবং পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা গড়ে ওঠেনি। অর্থাৎ ভালো উদ্যোগ থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষার গুণগত উন্নয়নের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের আগে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ও মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাস, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং পর্যাপ্ত লাইব্রেরি সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এগুলো নিশ্চিত না করে নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদন করলে সমস্যার পরিধি আরও বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা এবং উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, পাঠ্যক্রমকে শিল্প খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রি অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতা, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা প্রকল্প এবং যৌথ ল্যাবরেটরি গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা উন্নয়ন করা জরুরি।
চতুর্থত, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আধুনিক ল্যাব স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে পারবে।
মো. আশরাফুজ্জামান: সহকারী অধ্যাপক, এডুকেশনাল টেকনোলজি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ
- বিষয় :
- মানবসম্পদ
