ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী

ভোটাধিকার চর্চায় সূক্ষ্ম এক সংকট

ভোটাধিকার চর্চায় সূক্ষ্ম এক সংকট
×

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০২ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাপারটি নির্বাচন-সংক্রান্ত, তবে এখন যে নির্বাচন চলছে, ঠিক সে-সংক্রান্ত নয়। ২০ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল; ২০০৬ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে। আমি সে সম্পর্কে বলছি।

২০০৪ সালে আমি কলকাতার রাজভবনে কাজ করতে চলে আসি। এই নামেই ভবনটি পরিচিত ছিল। তার কিছুদিন পরই আমি নিজের ভোটার নিবন্ধন দিল্লি থেকে কলকাতায় সরিয়ে নিই। কিন্তু ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা এক জিনিস; বাস্তবে ভোট দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। প্রথমটি হলো পছন্দের সুযোগ থাকা; দ্বিতীয়টি হলো সেই সুযোগটি গ্রহণ করা।

২০০৬ সালের এপ্রিল-মে মাসের নির্বাচনে আমি দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম– একজন নাগরিক হিসেবে অধিকার চর্চায় আমার ভোট দেওয়া উচিত কিনা। এটা সত্যি, একজন গভর্নরের মতো উচ্চপদে নিযুক্ত হলেই নিজের নাগরিকত্ব হারান না। কিন্তু গভর্নর হিসেবে তিনি কি বলতে পারেন, ভোটকেন্দ্রে প্রবেশকালে তাঁর গভর্নরের দায়িত্ব স্থগিত হয় এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি আবার গভর্নরের দায়িত্বে ফিরে আসেন?

কোনো গভর্নরকে কেউ ঈর্ষা করবেন না! একজন গভর্নর সর্বদা অনিশ্চিত যাত্রায় থাকেন– কঠোপনিষদে (১.৩.১৪) যেমন বলা হয়েছে, তিনি ক্ষুরের ধারালো প্রান্তে থাকেন।
ভোট দেওয়া নাগরিকের অধিকার; চিন্তা করাও মানবাধিকার। আমি আমার শ্রোতা হিসেবে রাজভবনের একজন শ্রদ্ধেয় কর্মকর্তার সঙ্গে চিন্তাগুলো বিনিময় এবং তা মানবাধিকার হিসেবে প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেদিনের আলাপটি তুলে ধরছি। 

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: কাল ভোট হবে…

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: ভোট দেব কিনা ভাবছি…

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: আমার কি ভোট দেওয়া উচিত?

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: নাকি…।

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণন ১৯৯৮ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন…

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: সেটা অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছিল…

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: এমনকি তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি বার্তা পাঠান এবং প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপ একটি গণতান্ত্রিক মাইলফলক হিসেবে প্রশংসা করে প্রকাশ্য বিবৃতি দেন। আর তাঁকে যথার্থই একজন নাগরিক রাষ্ট্রপতি বলা হয়েছিল।

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: অবশ্য কিছু সমালোচনাও ছিল। আমি তখন রাষ্ট্রপতির সচিব ছিলাম। আর রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তটি সঠিক, নাকি ভুল ছিল– সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। এ ব্যাপারে তিনি আমাকে কিংবা অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করেননি। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি সার্বভৌম। শ্রীমতী ঊষা নারায়ণনের সঙ্গে তিনি নির্ধারিত বুথে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছিলেন।

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: তিনি কাকে ভোট দিয়েছিলেন, তা কেউ জানেনি। যারা তাঁর অতীত সম্পর্কে জানত, তারা তাঁর পছন্দ সম্পর্কে অনুমান করতে পারত। কিন্তু সেটা কেবলই অনুমান। সময় ও পরিস্থিতি সবকিছু বদলে দিতে পারে।

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: অটলজি (অটল বিহারি বাজপেয়ি) এবং তাঁর বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট অল্প ব্যবধানে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি নারায়ণন তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং কঠোর সাংবিধানিক নিয়ম মেনে দ্রুত তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি।

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: আমার ধারণা, আমি যদি আগামীকাল ভোট দিই, তা সবার নজরে আসবে এবং তা নিয়ে আলোচনা হবে।

কর্মকর্তা: স্যার।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: পক্ষে, না বিপক্ষে?

কর্মকর্তা: স্যার, দুটোই।

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: ধন্যবাদ, এটুকুই।

চমৎকার উপদেশ একাক্ষরেও আসতে পারে। আমি ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আমার ২০০৬ সালের মে মাসের ডায়েরি থেকে কিছু অংশ নিচে দেওয়া হলো, যা তখনকার দারুণ নির্বাচনী অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। ২০০৬ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের ডায়েরি থেকেও দিলাম, যা দুটি ছোট পরিসরে নির্বাচন-পরবর্তী জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার চিত্র তুলে ধরে। 

১১ মে: বামফ্রন্ট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছে। বুদ্ধবাবু দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের দীর্ঘতম সময় ধরে চলা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকারের নেতৃত্ব দিতে চলেছেন।

১৮ মে: জ্যোতিবাবুর উপস্থিতিতে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ সম্পন্ন হলো। প্রথা অনুযায়ী রাজভবনের ভেতরে সিংহাসন কক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি। বরং লনে প্যান্ডেল তৈরি করে করা হয়। অনুষ্ঠান নিচে করার অনুরোধে আমি কিছুটা অস্বস্তি বোধ করি। প্যান্ডেলটির জন্য ১১ লাখ টাকা খরচ অনেক বেশি মনে হলেও যেহেতু এটি বুদ্ধবাবুর দিন, তাই আমি কিছু না বলার সিদ্ধান্ত নিই। শুধু এইটুকুই বলি যে, অনুষ্ঠানের পরপরই যেন প্যান্ডেলটি ভেঙে ফেলা না হয়, বরং সেই সন্ধ্যায় ওস্তাদ রশিদ খানের একটি উন্মুক্ত সংগীতানুষ্ঠানের জন্য এটি যেন রাখা হয়। আমার অনুরোধে সেই মহান শিল্পী একটি তিলক কামোদ গেয়ে আমাদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।

২৩ জুলাই: অমিতাভ ঘোষ ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সারাদিন নবদ্বীপে কাটিয়েছি। চৈতন্য মহাপ্রভুর মূর্তির চারপাশে কিছু মনোরম কিন্তু জরাজীর্ণ বাড়ি ও মন্দির। গতিপথ পরিবর্তনকারী ভাগীরথীর জলে শহরটি প্লাবিত বা ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২৫ আগস্ট: … নৈহাটিতে গেলাম, যেখানে বঙ্কিমের জন্মস্থান দেখা হলো। তাঁর বহু স্তম্ভবিশিষ্ট পুরোনো দোতলা বাড়িটির সংস্কার কাজ চলছে। তারপর গেলাম শ্যামনগরে, এটি কলকাতার পর পশ্চিমবঙ্গের ফুটবল রাজধানী, যেখানে স্থানীয় স্পোর্টস ক্লাব ক্রীড়াজগতের দিকপালদের সম্মাননা জানাচ্ছে। সৌরভ গাঙ্গুলী সেখানে আছেন, সুঠাম ও গম্ভীর, যা তাঁর হাসিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

২০০৯ সালে যখন লোকসভা নির্বাচন হয়েছিল, আমি কলকাতায় আমার নির্ধারিত বুথ থেকেই ভোট দিয়েছিলাম। কিন্তু যেহেতু তখন নির্বাচন-পরবর্তী কোনো ভূমিকা আমার ছিল না, তাই আমার জন্য কোনো বিশেষ ঝুঁকিও ছিল না।

তবে আমি বিশ্বাস করি, ২০০৬ সালে যদি  ভোট দিতাম তাহলে রাষ্ট্রপতি নারায়ণনের স্থাপিত নজির আমার সিদ্ধান্তকে ভুল বোঝাবুঝি থেকে রক্ষা করত। আর নির্বাচনী পছন্দ হতো আমার ও ভোটকেন্দ্রের মধ্যে, এবং সে বছরের ভোটারদের জোরালো রায়ের ফলে আমার নির্বাচন-পরবর্তী ভূমিকাও সহজ হয়ে যেত। 
ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক! 

ভারত দীর্ঘজীবী হোক!

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী: পশ্চিমবঙ্গের সাবেক গভর্নর; দ্য টেলিগ্রাফ থেকে ভাষান্তর 
ইফতেখারুল ইসলাম 
 

আরও পড়ুন

×