ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন কাগুজে না হোক

হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন কাগুজে না হোক
×

তৌহিদুল আলম

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬ পাস হয়েছে। কিন্তু এই আইন কি হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো বিশ্বের বিরল প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, কৃষি খাতের বিষ আর ক্ষতিকর কাঠামো থেকে বাঁচাতে পারবে? আইনের অক্ষর আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে যে দূরত্ব, তা কত দ্রুত ঘুচবে– সেটাই আসল প্রশ্ন।

গত ৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয়, যা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া অধ্যাদেশের সংসদীয় রূপ। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই একটি অধিদপ্তর হিসেবে কার্যক্রম শুরু করলেও এর আইনি দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট ছিল না। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ছিল অলস এবং হাওরগুলো জৌলুস হারাচ্ছিল। এই আইনের মাধ্যমে হাওর অধিদপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাজের আইনগত ভিত্তি লাভ করল। কিন্তু আইন পাস আর কার্যকর হওয়া যে এক জিনিস নয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেটা বোঝা কঠিন নয়।

দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল
এই আইনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আইনি সংগ্রামের ইতিহাস। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০১৪ সালে হাইকোর্টে রিট পিটিশন (১৬৮৩/২০১৪) করে। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর হাইকোর্ট হাওর ও জলাধার সংরক্ষণে কার্যকর আইনি কাঠামো প্রণয়নসহ সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন। সেই বিচারিক নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতেই মূলত এই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া গতি পায়।
আইনটি সংবিধানের ১৮-ক অনুচ্ছেদের আলোকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতারই আইনি রূপ– বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য জলাভূমি, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

আইনে যা আছে
আইনটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান রেখেছে। হাওর ও জলাভূমির আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রণয়ন ও প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে জেলা প্রশাসকদের সরবরাহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে। হাওর অধিদপ্তরকে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে হাওরনির্ভর জনগোষ্ঠী ও অংশীজনের মতামত নেওয়া এবং বিধি-নির্ধারিত পদ্ধতিতে গণশুনানি বাধ্যতামূলক। আইনে হাওর বা জলাভূমিসংশ্লিষ্ট যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প– সরকারি, বেসরকারি বা ব্যক্তিগত; গ্রহণের আগে অধিদপ্তরের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

এ ছাড়া বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন, ২০২৬-এর অধীনে হাওর ও জলাভূমি অধিদপ্তরকে গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্ব, ব্যাপক ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। অধিদপ্তর হাওর ও জলাভূমির পরিবেশ সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে হাওরের তালিকা প্রণয়ন, সীমানা চিহ্নিতকরণ, সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, অতিথি পাখিসহ বিপন্ন প্রাণীর আবাসস্থল নিরাপদ রাখা। এ ছাড়া কৃষিজমিতে রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পলি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি এবং পর্যটন নিয়ন্ত্রণেও অধিদপ্তর কাজ করবে। প্রয়োজনে যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ ও আদেশ প্রদানের ক্ষমতাও অধিদপ্তরের রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, বন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ এক ডজনেরও বেশি সরকারি সংস্থার সঙ্গে বাধ্যতামূলক সমন্বয়ের বিধান রাখা হয়েছে।

নিষিদ্ধ কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে– পানিধারক স্তরের নিরাপদ সীমা ক্ষুণ্ন করে পানি উত্তোলন, জলাভূমির অবৈধ দখল বা ভরাট, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্তকারী অবকাঠামো নির্মাণ, অনুমোদন ছাড়া বালু-পাথর উত্তোলন, বিদ্যুৎ শক বা বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা সরাসরি নিষিদ্ধ। এসব লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এখন করণীয়
আইনটি নিঃসন্দেহে জলাশয় রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। কিন্তু শুধু আইন পাস হওয়াই যথেষ্ট নয়। এটির কার্যকর বাস্তবায়নে কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, দ্রুততার সঙ্গে সরকারি গেজেটে হাওর ও জলাভূমির আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করতে হবে। তালিকা ছাড়া আইনের অধিকাংশ বিধান কার্যকর করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে হাওরপারের কৃষক, জেলে ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত কাগজ-কলমে নয়, সত্যিকার অর্থে নিতে হবে। গণশুনানির প্রক্রিয়া যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না হয়।
তৃতীয়ত, উন্নয়ন প্রকল্পে মতামত গ্রহণের বিধানটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অতীতে হাওরে বেশ কিছু ক্ষতিকর প্রকল্প রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পেয়েছে। যেমন– মিঠামইন হাওর, সেখানে এখন রাস্তা পেয়ে অনেকেই খুশি। কিন্তু হাওরের চিরস্থায়ী সর্বনাশ হয়ে গেছে। এই হাওরে রাস্তা নির্মাণের সময় বিশেষজ্ঞ বা হাওরনির্ভর জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া হয়নি। নতুন আইনের মতামত-প্রক্রিয়া যেন একইভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিষ্ক্রিয় হয়ে না যায়।

চতুর্থত, আইনে নির্ধারিত শাস্তি সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বড় আকারের দখলদারিত্ব বা শিল্প দূষণের বিপরীতে অপ্রতুল মনে হতে পারে। এই বিষয়ে হাওর অধিদপ্তর যদি পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে, তবে ক্ষতিপূরণ আদায় করে এই অপ্রতুলতা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। 
পঞ্চমত, আইনে একাধিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে এই সমন্বয় কীভাবে ও কে নিশ্চিত করবে– আরও সুনির্দিষ্টভাবে বিধিমালায় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সরকার নতুন আইনের অধীনে সুরক্ষা আদেশ বাস্তবায়ন করে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আইনটি বাস্তবায়নের ধারা শুরু করতে পারে।

হাওরের মানুষ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে। তারা বন্যা দেখেছে, ফসল হারিয়েছে, জলাশয় সংকুচিত হতে দেখেছে চোখের সামনে। এই আইন কাগজে যতটা শক্তিশালী, বাস্তবে ততটাই কার্যকর হবে কিনা– নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের ওপর। এবার তাদের প্রতীক্ষার প্রতিদান দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। 

তৌহিদুল আলম: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও আইনজীবী, বেলা
 

আরও পড়ুন

×